সরিষা ফলনে কৃষকের হাসি

সরিষা একটি তেলজাতীয় ফসল যা সারাদেশে অন্যান্য তৈলবীজ ফসলের ৮০ শতাংশ জমি এবং উৎপাদনের ৬০ শতাংশ কভার করে থাকে। সরিষা রবি মৌসুমের ফসল যা শীতকালে উৎপাদন হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে এক লাখ টন সরিষা প্রতি বছর উৎপাদন হয় এবং প্রায় তিন লাখ টন সরিষা প্রতি বছর আমদানি করা হয়। এই তথ্য থেকে অনুমেয় উৎপাদনের সঙ্গে চাহিদার একটি ফারাক রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে সারাদেশে ৬ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, চাষ হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমিতে এবং আশা করা যাচ্ছে এবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার টন সরিষা উৎপাদন হতে পারে অথচ গত মৌসুমে ৫ লাখ ৯১ হাজার ৭৮৪ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়, উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ টন। সরিষার উচ্চফলনশীল জাতগুলোর মধ্যে বিনা (৩-৬), বিনা (২-১৩), বিনা (১৪,১৫,১৬) ও বারি জাত উল্লেখযোগ্য।

বর্তমান সরকার উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৫ সাল নাগাদ তেলজাতীয় ফসলের (সরিষা, সূর্যমুখী, সয়াবিন, চিনাবাদম ও তিলের) সাড়ে ১৮ লাখ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এর মাধ্যমে সাড়ে ২৬ লাখ টন সরিষার তেল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের কার্যক্রম ২০২০ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে দেশের ২৫০ উপেজলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২২২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। সদ্য সমাপ্ত বছরে সরকার তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়াতে ৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেয়। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রকল্প পাঁচটি তেলজাতীয় ফসলের মধ্যে কেবল সরিষা চাষ করে বিঘাপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় সম্ভব।

এ বছর ১০ লাখ বিঘা জমিতে সরিষা, ৭০ হাজার বিঘা জমিতে সূর্যমুখী, ২৬ হাজার বিঘা জমিতে চিনাবাদাম এবং ২৪ হাজার বিঘা জমিতে সয়াবিন চাষে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী দেশে ৫৬ লাখ হেক্টর জমিতে আমন ও বোরো চাষ হয় এবং দুই ধান চাষের মাঝখানে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে। এ বছর তেলজাতীয় বিভিন্ন ফসলের ১৪ হাজার প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে সরকার। বর্তমানে শতকরা ৯০ ভাগ ভোজ্যতেল আমদানি করতে হচ্ছে। এতে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। স্থানীয়ভাবে মাত্র ১০ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। তিন বছরের মধ্যে দেশেই চাহিদার ৪০ থেকে ৫০ ভাগ ভোজ্যতেল উৎপাদনের লক্ষ্যে রোডম্যাপ নেওয়া হয়েছে।

এ বছর সরিষার বাম্পার ফলন হয়েছে এবং কৃষকের মুখে হাসির আভাস পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন মাঠ পরিদর্শনের খবর থেকে। সাটুরিয়ার কৃষক বললেন, ‘গ্রামজুড়ে বিপ্লব ঘটে গেছে। এক সময় বোরো ও আমন ধান আবাদের মাঝখানের সময়টা জমি পতিতই থাকত।

এখন উচ্চফলনশীল বারি-১৪ ও বারি-১৮ জাতের সরিষা বুনেছি।’ বাড়তি লাভের খুশিতে এক গাল হাসি দিয়ে চাষি আবদুল খালেক জানান, আমন ধানের জাত ব্রি ৪৯ চাষ করতাম। এই ধানের জীবনকাল ১৩৫ দিন হওয়ায় আমন ও বোরোর মাঝখানে অন্য কোনো ফসল চাষ করা যেত না। কৃষি অফিসের পরামর্শে এবার আমনের স্বল্পকালীন জাত ব্রি ধান-৭৫ লাগিয়েছি। সরিষা বিক্রি করে প্রতি বিঘা জমির খরচ বাদ দিয়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বাড়তি আসবে। এখন মানিকগঞ্জসহ সারাদেশে আমনের স্বল্পকালীন জাত ছড়িয়ে দেওয়ায় মাঝের এ সময়ে সরিষা চাষে ঝুঁকছেন কৃষক। এক বছরে মানিকগঞ্জে ২৫ শতাংশের বেশি জমিতে সরিষার আবাদ বেড়েছে। সারাদেশে গত বছরের চেয়ে সরিষার আবাদ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ দেশে উৎপাদনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ নামে পাঁচ বছরের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২০ লাখ বিঘা জমিতে চাষের জন্য সহায়তা হিসেবে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে।

মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেছেন, এ বছর ৪৬ হাজার ৯১২ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের সরিষা আবাদ হয়েছে। গত বছর চাষ হয়েছিল ৩৭ হাজার ৫৪৩ হেক্টর জমিতে। এবার সরিষার সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে ৬৫ হাজার ৬৭৭ টন, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি। মানিকগঞ্জ জেলায় এবার ৩ কোটি লিটার তেল উৎপাদন হবে। এখানে দেড় কোটি লিটার চাহিদা রয়েছে। বাকি তেল অন্য জেলায় সরবরাহ করা যাবে। মানিকগঞ্জে সরকারিভাবে একটি ছোট কারখানা করে, সরিষার তেল বোতলজাতের মাধ্যমে বাজারজাত শুরু হয়েছে। আশা করা যায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সারাদেশের ঘাটতি কমে আসবে।

সরিষার বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে যেমন তেলের খাদ্য চাহিদা পূরণ, সরিষা থেকে খৈল উৎপাদন যা মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত, হয় ও সরিষার ফুল থেকে মৌমাছির মধু আহরণ ইত্যাদি। সরিষার তেল রান্নায় ব্যাপকভাবে গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত হয় যা অন্যান্য তেলের তুলনায় স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকরও বটে। সরিষার ফুলের সৌন্দর্য প্রকৃতিতে নেমে আসে নতুন মহিমা যা কবি-সাহিত্যিকদের কাছে সৃষ্টির উপকরণও বটে। আসুন সরিষার বহুমাত্রিক ব্যবহারকে বিবেচনায় নিয়ে এর চাষে এগিয়ে আসুক কৃষক আর সরকার হবে তার সহযোগী।