তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ থেকে আজকের বাংলাদেশ

বাংলাদেশ একটা ইতিহাসের নাম। রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। যে দেশ রক্ত দিয়ে ভাষা এনেছে, এনেছে স্বাধীনতা। ১৯৪৭-এ দেশভাগের সময় থেকে শুরু হয়েছে বিবাদ, পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তান দ্বন্দ্ব। তখন থেকে শুরু হয়েছে বাঙালিদের বঞ্চনার দিন। সমস্ত দিক থেকে কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছিল এই জাতিকে। এরপর সময় পরিক্রমায় আসে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬-এর ৬ দফা দাবি, ৬৯-এর গণঅভু্যত্থান, ৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙালি তথা পূর্ব পাকিস্তান জয়ী হলেও কখনই তাদের অধিকার ফলাতে কিংবা সঠিক পাওনা দেওয়া হতো না। যার ফলে এই অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। যার কিছু দিন পর ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে পশ্চিম পাকিস্তানিরা অতর্কিতে হামলা করে নিরীহ বাঙালির ওপর। ২৬ মার্চ থেকে বাঙালিরাও কিছুটা পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে। প্রায় নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাঙালি জাতি স্বাধীনতা লাভ করে। তবে যাওয়ার আগে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলাদেশকে করে যায় অসার, রিক্ত। যুদ্ধশেষে বাংলা হয়ে যায় একটি ধ্বংসস্তূপ। নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকের মধ্যদিয়ে সূচিত হয়েছিল। একটি রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের মধ্যদিয়ে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পূর্ব পাকিস্তান একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের ধন-সম্পদ ও জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। সদ্য-স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠন ছিল সরকারের জন্য প্রাগাধিকারমূলক কর্তব্য। এ ছাড়া একটি প্রাদেশিক সরকারকে কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নীত করার কাজ অবধার্য হয়ে পড়েছিল। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভের পরে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক ছিল। ১৯৭০-এর বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা (যাতে প্রায় আড়াই লাখ বাঙালির মৃতু্য হয়) কাটিয়ে না উঠতেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। দেশের অবকাঠামোসমূহের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে দেশটির কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও পরিবহণ খাতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নতুন এই দেশের জনঘনত্ব ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উচ্চ ছিল এবং এর সিংহভাগ নাগরিকই ছিল নিরক্ষর, অপ্রশিক্ষিত ও বেকারত্বের শিকার। যুদ্ধের কারণে দেশের আবশ্যকীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের ভান্ডার প্রায় ফুরিয়ে গিয়েছিল। নবপ্রতিষ্ঠিত দেশে কাজে লাগানোর মতো প্রাকৃতিক সম্পদও ছিল অপ্রতুল। ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনকারী প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনও ছিল এক বিরাট সমস্যা। এরকম একটি দেশের পুনর্গঠন ছিল একটি চ্যালেঞ্জ। তখনকার ওই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। বিজয়ের ৫১ বছরে এসে সেই তলাবিহীন ঝুড়ি আজ উন্নয়নশীল দেশ হতে চলেছে। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ একটি আলোকিত নাম। ভয়াবহ করোনা মহামারিতে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি যেখানে নাজুক, সেখানে বাংলাদেশ করোনার ধাক্কা উপেক্ষা করে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্সে অতীতের রেকর্ড ভাঙছে। অর্থনীতির সব মানদন্ডে উন্নীত হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। বিজয়ের ৫১ বছরে এসে এ যেন এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ৫১ বছরের পথচলা সামান্য নয়। সুবর্ণজয়ন্তীর এই মাইলফলকে পৌঁছে অর্থনৈতিক প্রাপ্তি, প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জের মূল্যায়ন জরুরি। অনেকেরই ধারণা ছিল, বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে অর্থনৈতিক দিক থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ পেয়েছি। আমাদের মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধি, কৃষি সম্প্রসারণ, শিল্পের উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বৃদ্ধি ও পোশাকশিল্পের ব্যাপক অগ্রগতিসহ রপ্তানি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশক আমাদের অর্থনীতি মূলত ছিল কৃষিনির্ভর। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে অর্থনীতির কাঠামো ছিল নাজুক অবস্থায়। ১৯৭২-৭৩ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ১২৯ ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২.৭৫ ভাগ (১৯৭২-৭৩)। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.০৮ শতাংশ। ১৯৮৫ সালে সার্বিক বিনিয়োগের ৩৭ শতাংশের মধ্যে ব্যক্তি খাতের অবদান ছিল ৮০ শতাংশ। তবে আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় আমাদের প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখী বলা যায়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত আমাদের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.০৮ শতাংশ। ২০০৮ থেকে ২০১০ সালে তা বেড়ে হয় ৫.০৯ শতাংশ। ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সময়কালে বেড়ে হয়েছে ৬.০২ শতাংশ। ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭.০৪ শতাংশে।

এশিয়ার ১২টি দেশের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যায়, আমাদের গড় প্রবৃদ্ধির হার ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ আমাদের প্রবৃদ্ধির হার মোটামুটি সন্তোষজনক। স্বাধীনতার ৫০ বছর অর্জনের মধ্যে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভ বর্তমানে অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। ১৯৭৪ সাল থেকে যেখানে আমাদের রিজার্ভ ছিল মাত্র ৪২.৫ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২১ সালের রিজার্ভের পরিমাণ ৪৭ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। তাছাড়া আরও বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। কৃষি, মৎস্য, ফল ইত্যাদি সেক্টরে আশানুরূপ সাফল্য দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী যে জনসংখ্যা ছিল ৫০ বছরে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। তখন আমাদের কৃষি ও খাদ্যশস্য উৎপাদন সন্তোষজনক ছিল না। বর্তমানে ব্যাপক জনসংখ্যার মধ্যেও আমাদের খাদ্যশস্য উৎপাদনে অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। চলমান করোনা মহামারির সময় অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে অন্যতম অবদান রেখে চলেছে আমাদের কৃষিজ উৎপাদন। ১৯৭২ সালে ধান উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয় ৪ কোটি ৫৫ লাখ টন। এর মধ্যে বোরো চাল-ই উৎপাদিত হয়েছে ২ কোটি টনের বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সবমিলিয়ে এই বছর মোট চাল উৎপাদিত হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন।

এফএও’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাগলের গোশত ও দুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ ক্রমাগত ভালো করছে। বিশেষ করে ছাগলের দুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। ছাগলের সংখ্যা ও গোশত উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ ছাড়া আম ও পেয়ারা উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে আছে। বছরে আম উৎপাদন হয় ২৪ লাখ টন। পেয়ারা উৎপাদন হয় ১০ লাখ ৪৭ হাজার টন। আম ও পেয়ারা উৎপাদনে প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রথম অবস্থানে আছে। ৫১ বছরের ব্যবধানে মুদ্রাস্ফীতি ৫.৫ ভাগ। তবে আগামী ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে এটা বাড়িয়ে ৫.৬ শতাংশ করার আশা রাখা হচ্ছে। ৮৬ টাকা ডলার প্রতি মূল্য এবং রপ্তানি আয় যেমন বেড়েছে, তেমনই আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৭৬০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে। বিজয়ের ৫১ বছরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অনুমোদন পেয়েছে। আর এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে পরবর্তী ধাপে উত্তরণের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গণ্য হবে। এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’খ্যাত স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এই উন্নয়ন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ একদিন বিশ্বমঞ্চে সুদৃঢ় জায়গা করে নেবে।

লেখক: রামিছা বিলকিছ জেরিন
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়