সাগরগর্ভে দৃশ্যমান সুদীর্ঘ রানওয়ে

দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ রানওয়ে হতে যাচ্ছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। নয় হাজার ফুটের রানওয়েকে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০ ফুট থাকছে সমুদ্রবক্ষে। সমুদ্রের বুক ছুঁয়েই এখানে ওঠানামা করবে বিমান। এরই মধ্যে সাগরগর্ভে দৃশ্যমান হচ্ছে সুদীর্ঘ সেই রানওয়ে। কাজের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৪৫ শতাংশ। আগামী অক্টোবরের মধ্যে এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এর নির্মাণকাজ শেষ হলে দেশের সর্ববৃহৎ রানওয়ে পরিণত হবে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও আকাশ পথে দ্রুতগতিতে যোগাযোগ স্থাপনের পাশাপাশি পর্যটন শিল্প বিকাশে আসবে আমূল পরিবর্তন।

বিমানবন্দরটির সম্প্রসারিত রানওয়েতে ২০১৭ সালের ৬ মে বিমানের বোয়িং ৭৩৭ থেকে ৮০০ উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণ উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখনই বিমানবন্দরের রানওয়েকে ১২ হাজারে উন্নীতকরণের নির্দেশ দেন তিনি। সে অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ‘কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ২৯০ হেক্টর ভূমি বন্দোবস্ত এবং ৮ দশমিক ৩৭ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ৭৭৫ ফুট-৯ হাজার ফুটে এবং চওড়া ১০০-২০০ ফুট উন্নীত করা হয়।

এছাড়া সুপরিসর বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের লক্ষ্যে বিদ্যমান রানওয়ে পিসিএন ১৭ থেকে ৯০-এ উন্নীতকরণসহ আইএলএস ডিভিওআর, ক্যাট-১ এজিএল লাইট স্থাপন, নিরাপত্তা সীমানাপ্রাচীর ও ড্রেনেজ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে কাজের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬০৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার টাকা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রগর্ভে আরো ১ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে বর্ধিতকরণের লক্ষ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দরে রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ উদ্বোধন করেন। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে বিমানবন্দরের রানওয়ে পূর্ণলোডে সুপরিসর বিমান তথা বি-৭৭৭-৩০০ ইজার, বি-৭৪৭-৪০০ জাতীয় বিমানের উড্ডয়ন-অবতরণ নিশ্চিত হবে।

কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প পরিচালক মো. ইউনুস ভুঁইয়া বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। কাজের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৪৫ শতাংশ। ২০২৩ সালের অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আর এটি পুরোপুরি হয়ে গেলে দেশের সর্ববৃহৎ রানওয়ে হিসেবে কক্সবাজারকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করে তুলবে। এ প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রগর্ভে আরো প্রায় ২ হাজার ২০০ ফুট দৈর্ঘ্যের প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইট স্থাপনসহ বিদ্যমান রানওয়েতে ক্যাট-২ এজিএল সিস্টেম স্থাপন করা হবে। ফলে সুষ্ঠু ও নিরাপদ বিমান উড্ডয়ন-অবতরণ নিশ্চিত হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব থেকে রানওয়েকে সুরক্ষা করতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের করা ডিজাইন অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে সমুদ্র তীর রক্ষাকারী বাঁধ। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্বার্থে অপারেশনাল এলাকার চারপাশে নিরাপত্তা টহল রাস্তাও নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে সর্বমোট ব্যয় হবে ১৫ হাজার ৬৮৮ কোটি ৮৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।’

কক্সবাজার বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক গোলাম মোর্তজা হোসেন বলেন, ‘আমরা বিমানের শিডিউল বৃদ্ধি করেছি। বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী বিমান ও ছয়-আটটি কার্গো বিমান ওঠানামা করছে। রাতে বিমান ওঠানামার জন্যও বিমানবন্দর প্রায় প্রস্তুত রয়েছে। সমুদ্রগর্ভে আরো লাইটিং সিস্টেম স্থাপনের কাজ চলছে।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন এমরান বলেন, ‘আমরা খুবই উজ্জীবিত। রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজটা ২০২৩ সালের অক্টোবরে শেষ হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ২০২৩ সালের জুন মাসে চালু হবে। এ লক্ষ্যে কাজ চলছে। বিমানবন্দর এবং রেলপথের কাজ যেভাবে এগোচ্ছে, সেভাবে যদি আমরা এগোতে পারি, তাহলে কক্সবাজার সত্যিকার অর্থে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন স্থান হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।’

বাংলাদেশ বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্যমতে, কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার লক্ষ্যে এ বিমানবন্দরে ২৭৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আন্তর্জাতিক যাত্রী প্রাপ্তিক ভবন নির্মাণকাজ চলমান। আগামী বছরের জুনের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত আন্তর্জাতিক যাত্রী প্রান্তিক ভবন, একটি বোর্ডিং ব্রিজ স্থাপন, সুপরিসর বিমান পার্কিং অ্যাপ্রোচ ও ১৯০টি অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক যাত্রী এবং ৩৫টি ভিআইপি ভেহিক্যাল পার্কিং বিশিষ্ট কারপার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা সম্ভব হবে।

পর্যটন শিল্প বিকাশে কক্সবাজারকে ঢেলে সাজাতে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলছে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন প্রকল্পসহ কক্সবাজারে বহু মেগা প্রকল্প চালু রয়েছে। এরই মধ্যে এসব কাজের গতি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার কাজগুলো নির্ধারিত মেয়াদে শেষ করা গেলে সত্যিকার অর্থে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যটন এলাকা হিসেবে আরো পরিচিতি লাভ করবে।