বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারাপাত, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির খতিয়ান

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের জনপদ পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে মুক্ত হয়। স্বাধীনতার জন্য, রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের জন্য এই জনপদকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। বারুদের গন্ধ, রক্তপাত, ৩০ লাখ শহিদ আর ২ লক্ষ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জনের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় এক নবীন রাষ্ট্রের—যার নাম বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৩ই জুন, অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লন্ডনের ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকায় এই নির্বিচার গণহত্যার ব্যাপকতার বর্ণনা দেন। কেবল দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক মহলের হিসাবেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ‘৩ মিলিয়ন’ বা ‘৩০ লাখ’ মানুষ গণহত্যার শিকার হয় বলে উল্লিখিত রয়েছে।

দুঃখের বিষয় এই যে, এই মর্মান্তিক জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আমাদেরকে এখনো লড়াই করে যেতে হচ্ছে। এই গণহত্যা সম্পর্কে অন্যতম প্রধান পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলি তার ডায়রিতে লিখেছেন, ‘paint the green of East Pakistan red’ অর্থাৎ ‘বাংলার সবুজ মাঠকে রক্তবর্ণ করে দাও’। এই জেনোসাইড, রক্তপাত আর নির্মমতার পথ ধরেই বদলে যায় দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র। এই জেনোসাইডের ধাক্কা ও স্মৃতি কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তনের পর অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বচ্ছ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য একদণ্ড সময় অপচয় করেননি। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই রাষ্ট্রটি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সংবিধানের চারটি স্তম্ভ: গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রণয়ন করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের প্রায় সব সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করার পর প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ধর্মনিরপেক্ষতা সমন্বিত ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ সংবিধান থেকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হয়। অথচ বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। এই উপলব্ধির মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করেছিলেন। এভাবেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথ পালটে দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বাইরে গিয়ে ভিন্ন এক পথে চলতে শুরু করে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু মানুষের কল্যাণে আর্থসামাজিক মুক্তি এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করতে আমৃত্যু অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য বিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ার নিমিত্তে সামাজিক-রাজনৈতিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। মহাকালের নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের শাসনামলের সমাপ্তি ঘটে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করেন দ্বিতীয় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পরবর্তীকালে সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের মিলিত শক্তির আন্দোলনের ফলে গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৯০ সালের শেষের দিকে অবৈধ এরশাদ সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দুই মেয়াদে (১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬) দেশ শাসন করে। ১৯৭৫ সালের প্রায় দুই দশক পরে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনার ভার নেন এবং তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চার মেয়াদে (১৯৯৬, ২০০৯, ২০১৪, ২০১৮ থেকে বর্তমান) দৃঢ় হাতে দেশ পরিচালনা করে যাচ্ছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে জনমত গঠনে সদা তৎপর জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক-এর ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আর্থসামাজিক বিষয় অবতারণার প্রয়োজন বোধ করছি। বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো সুশাসন। বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন। এই অসাংবিধানিক কমিশনগুলোর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে মানবাধিকার, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও দুর্নীতি হ্রাসকরণ। যার ধারাবাহিকতায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (২৬-৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদ) উল্লিখিত মৌলিক অধিকারসমূহের বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই একটি বহুমাত্রিক গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কারণে কেবল তথ্য কমিশনের কথাই উল্লেখ করছি। এই কমিশনের কাজ হচ্ছে মূলত তথ্য প্রাপ্তিতে বঞ্চিত আবেদনকারীর অভিযোগ গ্রহণ করা। এমনকি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে কেউ চাইলে নির্বাচন কমিশন দিতে বাধ্য থাকবে। যদিও তথ্য অধিকার আইনের ব্যবহার সুশাসনের লক্ষ্যে নিবেদিত। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) লিখিত পরীক্ষার নম্বর প্রকাশ করলেও তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করেও আবেদনকারীকে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর জানতে দেওয়া হয় না। শিক্ষাসংক্রান্ত কোনো তথ্যের অবমুক্তকরণ দেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করে না। তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে পিএসসি চাকরিতে প্রতিবন্ধী কোটার ব্যবহার সঠিক হচ্ছে কি না, তা অবগত হওয়া সম্ভব হয়েছে। একইভাবে তথ্য অধিকার আইন দুর্নীতিসংক্রান্ত তদন্ত ও অনুসন্ধানে সহায়ক হতে পারে। লক্ষণীয় যে, বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খাদ্য উৎপাদনে আবাদি জমি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু, দৃশ্যমান নেতিবাচক ঘটনাসমূহ, যেমন—বান্দরবানের লামা উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ম্রোদের পরিবারের প্রথাগতভাবে ব্যবহৃত ৪০০ একর জমির প্রাকৃতিক বন উজাড় করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাবার বাগান মালিকের আধিপত্য। গণমাধ্যম ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীবান্ধব নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়ায় মানবাধিকার কমিশন তৎপর হয়ে ম্রো পরিবারদের পাশে দাঁড়িয়েছে। যদিও বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক আইন, ২০১১ প্রণীত হয়েছে কিন্তু এই আইনের কোনো ধারাই সমতল এবং পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের প্রথাগতভাবে ব্যবহৃত ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সুরক্ষা দেয় না। পার্বত্য চুক্তির ফলস্বরূপ পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভূমি অধিকার রক্ষায় ভূমি কমিশন গঠিত হলেও বেশকিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। অন্য দিকে, সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভূমি রক্ষার্থে ভূমি কমিশন গঠনের দাবি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নারী, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের উন্নয়নকল্পে বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্রগতিশীল পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে এবং কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের সদিচ্ছার অভাব দেখা যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছে। প্রথম বার ক্ষমতায় থাকার সময় শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করেন, যার লক্ষ্য ছিল নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য নিরসন, জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা, নারীর মানবাধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নারীকে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। যদিও ধর্মীয় সংরক্ষণবাদীরা সবসময় এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। সব স্তরে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের পেছনে মূল কারিগর ছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় শেখ হাসিনা সরকার কোনো ছাড় দেয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় কন্যাশিশুরা যেন পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য প্রায় ৭.৮১ মিলিয়ন দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া নারীরা যেন সব ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পায় ও নারী হওয়ার কারণে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার আইন পরিবর্তন ও সংশোধন করেছে। তবুও মাঠ পর্যায়ে কিছু সামাজিক অসমতা আমরা লক্ষ করেছি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় নারী ও শিশুকন্যার প্রতি নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। পারিবারিক পর্যায়ে তাদের প্রতি অসম আচরণ, যৌন নির্যাতনসহ ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। জাতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২০ সালের শুধু জুলাই মাসেই ২৩৫ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র এর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। অন্যদিকে এসব ঘটনায় সর্বপ্রথম নারীর দিকেই আঙুল তোলা হয়, যা মূলত আইনের কম উপস্থিতিরই বহিঃপ্রকাশ। যৌতুক, নারী উত্ত্যক্তকরণ, এসিড নিক্ষেপ, প্রতারণা, ধর্ষণ ও হত্যা ইত্যাদি সব অপরাধ দেশে বিরাজ করছিল। এ লক্ষ্যে সরকার পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, ডিএনএ আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২০ প্রণয়ন করেছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন বিচার ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল ব্যবস্থায় নারীদের নিরাপত্তার জন্য সাইবার সিকিউরিটি ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু নারী সুরক্ষা সংক্রান্ত আইনসমূহের ব্যবহার এখনো উল্লেখযোগ্য নয়।

কৃষিজমিতে মালিকানা না থাকার ফলে উত্পাদনপ্রক্রিয়া থেকে নারীরা বিচ্ছিন্ন থাকে। খাসজমি হস্তান্তরে আইনি অসমতা রয়েছে। ‘ভালো বোনে’র মতো বিভিন্ন সামাজিক অসমতার ধারণার মাধ্যমে সম্পত্তিতে নারীদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অধিকন্তু, ধর্মীয় বিধি-বিধানের মাধ্যমেও নারীদেরকে সম্পদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। শুধু মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রেই না, বাংলাদেশে হিন্দু নারীরাও সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও সাম্প্রদায়িক অসমতার শিকার হয়। উত্তরাধিকার আইন/প্রথা তাদের সমান অধিকার দেয় না। দায়ভাগ নিয়ম অনুযায়ী হিন্দু নারীরা সম্পত্তিতে জীবনস্বত্ব অধিকার পেলেও হস্তান্তর বা বিক্রয় করতে সক্ষম নয়। নারীদের এমন অবস্থার উন্নয়নকল্পে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সিডও সনদের অনুমোদন দিয়ে তাতে স্বাক্ষর করে। যদিও বাংলাদেশ সরকার এই সনদের দুটি ধারা (২, ১৬-১ গ) সংরক্ষণ করে রেখেছে। এই দুইটি ধারায় উত্তরাধিকার, নারীর বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও অভিভাবকত্ব আইনে পুরুষ যেসব সুবিধা ভোগ করে, নারীদেরকেও সেসকল সুবিধা প্রদান করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সনদটির ২ নম্বর ধারায় নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতে জাতীয় আইন সংস্কার ও ১৬(১)(গ) ধারায় বিয়ে ও পারিবারিক আইনে সমান অধিকারের দাবি জানানো হয়। বিভিন্ন নারী ও মানবাধিকার সংগঠন এই দুইটি ধারার সংরক্ষণ বাতিলের দাবি জানালেও কোনো সরকারই তা আমলে নেয়নি। ‘সমাজ এখনো প্রস্তুত নয়’ এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই সরকার সিডও সনদের এই দুটি ধারার সংরক্ষণ অব্যাহত রেখেছে। লক্ষণীয় যে, নারীরা সব ধর্মেই, সব আইনেই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে অসমতার শিকার হয়; পুরুষদের সমান সুবিধা পায় না, যদিও সংবিধানের ২৮(১) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না।’ এবং ২৮(৪) নম্বর অনুচ্ছেদে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’ সুতরাং, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ সরকারের উচিত কোনো রকম সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন ছাড়াই সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন করা।

পরিশেষে, বাংলাদেশ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের মতো বহু ইতিবাচক অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। এর পাশাপাশি আর্থসামাজিক সীমাবদ্ধতাসমূহ চিহ্নিত করা ও তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা কখনোই থামিয়ে রাখা যাবে না। শত বাধা সত্ত্বেও আগামী দিনে প্রগতিশীল, বহুত্ববাদী ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ধারা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা থাকবে।