মেট্রোরেলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার

সর্বাধুনিক প্রযুক্তিযুক্ত করা হয়েছে মেট্রোরেলে। প্রবেশ ও বাইরের মুখে চিপযুক্ত কার্ড থাকবে। কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে এই ট্রেন। এটি নিয়ন্ত্রণের সফটওয়্যারটি তৈরি করেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিপ্পন। স্টেশনে যাত্রীদের তাৎক্ষণিক টিকিট কাটার ব্যবস্থার পাশাপাশি সাপ্তাহিক ও মাসিক টিকিট কাটার ব্যবস্থাও থাকবে। যাকে বলা হচ্ছে র‌্যাপিড পাস। এই পাস প্রবেশের মুখে স্পর্শ করালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খুলে যাবে। এই প্রযুক্তিটা তৈরি করছে সনি কোম্পানি।

এছাড়া বিদ্যুৎচালিত এই ট্রেনের সঙ্গে থাকছে ব্যাটারির ব্যাকআপ। যেটাকে বলা হচ্ছে এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম। যদি কোনো কারণে বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ হয়ে যায়, তখন ট্রেনকে পরবর্তী স্টেশন পর্যন্ত টেনে নেবে এই প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। এছাড়াও এই ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা জাপানেও নেই। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে ট্রেনে। যা শুধু বগির ভেতর নয়, প্ল্যাটফর্ম ও স্টেশনের ওপরও নজর রাখবে। প্রযুক্তির বাইরে পরিবেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে মেট্রোরেল। এটি চালু হলে বছরে ১.৮ লাখ টন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমবে বলে জানা গেছে।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জাপান ১৯২৭ সালে প্রথম পাতাল রেল ব্যবস্থা তৈরি করে। ভারত ১৯৭২ সালে কলকাতায় মেট্রো সিস্টেম নির্মাণ শুরু করে এবং পরে ভারতের আরও কয়েকটা শহরে মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৫৬টি দেশের ১৭৮টি শহরে ১৮০টি পাতাল রেল ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সে বছর ডিসেম্বর মাসে, ‘ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ বা ‘মেট্রোরেল’ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুন ২০১৬ সালে মেট্রোরেল নির্মাণ কাজের সূচনা করেন। প্রাথমিকভাবে এমআরটি লাইন-৬ দিয়ে মেট্রোরেল চলবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন ৬-এর দৈর্ঘ্য ছিল ২০.১ কিলোমিটার, পরে তা কমলাপুর পর্যন্ত বাড়ানো হয়, ফলে রুটটির দৈর্ঘ্য আরও ১.১৬ কিলোমিটার বেড়ে এর মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ২১.২৬ কিমি। এই রুটে মোট ১৭টি স্টেশন থাকবে ও ২৪টি ট্রেন সেট চলবে। যাত্রীদের জন্য স্টেশনেই মিলবে মেট্রো পাস। এই পাস দিয়ে কিংবা স্টেশন থেকে টিকিট কেটেও ভ্রমণ করা যাবে মেট্রোরেলে। পাস পেতে করতে হবে নিবন্ধন।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, র‌্যাপিড পাসেও চড়া যাবে মেট্রোরেলে। বিনামূল্যে দেওয়া হবে পাস। তবে জামানত বাবদ দিতে হবে ২০০ টাকা। পাস ফেরত দিয়ে জামানতের টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। স্টেশনের নির্দিষ্ট স্থান থেকে পাস ইস্যুর সময় ২০০ টাকা রিচার্জ করতে হবে। পাস বা টিকিট পাঞ্চ করলে স্টেশনের তৃতীয় তলার দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলবে। মেট্রোরেল চলবে বিদ্যুতে। জাতীয় গ্রিড থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ থাকবে মেট্রোরেলের দিয়াবাড়ী ও মতিঝিল সাব-স্টেশনে। থাকবে বিকল্প সংযোগও।

বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেও চলবে জেনারেটর। ট্রেনের প্রথম ও শেষের বগিতে থাকবে ট্রেন পরিচালনার মডিউল। ফলে ট্রেন না ঘুরিয়েই চালানো হবে। ট্রেন নিয়ন্ত্রণে চালকদের কাজ সামান্যই। ট্রেন চলবে সফটওয়্যারে। অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টারের (ওসিসি) মাধ্যমে পুরো সিস্টেমটা পরিচালিত হবে। এতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, মুভিং ব্লক কমিউনেকশন বেজড টেলিকন্ট্রোল সিস্টেম এবং অটোমেটিক ট্রেন অপারেশন বা এটিও থাকবে। ট্রেনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সেন্ট্রাল কন্ট্রোল থেকেই নিয়ন্ত্রিত হবে।

ট্রেন অটোমেটিক স্টপ কন্ট্রোলের মাধ্যমে কোথায়, কখন থামাতে হবে সেটি নির্ধারিত হবে এবং এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণে চালকের বেশি কিছু করার থাকবে না। প্রোগ্রাম রুট কন্ট্রোলার সিস্টেমের মাধ্যমে ট্রেনের রুটগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এসব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করার ফলে মেট্রোরেল পরিচালনায় তেমন কোনো সমস্যা হবে না। শুধু এমআরটি লাইন-৬ চালু হলে ঢাকায় কার্বন নিঃসরণ কমে যাবে ২ লাখ ২ হাজার ৭২৬ টন।

জাইকার চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ ইচিগুচি টমোহুদি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিদ্যুৎচালিত এই ট্রেনের সঙ্গে থাকছে ব্যাটারির ব্যাকআপ। যেটাকে বলা হচ্ছে এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম। তিনি জানান, যদি কোনো কারণে বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ হয়ে যায়, তখন ট্রেনকে পরবর্তী স্টেশন পর্যন্ত টেনে নেবে এই প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। এছাড়াও এই ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা জাপানেও নেই। জাইকার এই কর্মকর্তা জানান, মেট্রোরেলে ইএসএস সিস্টেম বা এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আছে।

যা ট্রেন চলাচলের সময়ই শক্তি সঞ্চয় করে রাখবে। এই শক্তি জমা থাকবে দুটি বগির নিচে থাকা ব্যাটারিতে। কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে জমা রাখা সেই শক্তি ব্যবহার করে রেলটি পরের স্টেশন পর্যন্ত যেতে পারবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে ট্রেনে। যা শুধু বগির ভেতর নয়, প্ল্যাটফর্ম ও স্টেশনের ওপরও নজর রাখবে। তিনি জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য এরইমধ্যে ৩০ জন বাংলাদেশ প্রকৌশলীকে জাপানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য যে যন্ত্র যুক্ত করা হয়েছে সেটি এখনও জাপানেই ব্যবহার হয়নি। প্রতিটি রেলে ছয়টি বগি থাকছে। তবে প্রয়োজনে বাড়তি আরও দুটি বগি যুক্ত করারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও জানান জাইকার এই কর্মকর্তা। জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকিও সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি হয় এই ট্রেন। এর ব্যবস্থাপনা ব্যয় কম। এই রেল চলাচলের সময় এক সেকেন্ডও এদিক সেদিক হবে না।

রেল চালু হলে ঢাকা শহরের পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। প্রতিটি স্টেশনে থাকবে সুপরিসর প্ল্যার্টফর্ম, যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা। পুরো স্টেশন থাকবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। স্টেশনের দ্বিতীয় তলা নগরবাসীর রাস্তা পারাপারে জন্য ব্যবহৃত হবে।