মেট্রোরেলে শুধু নারী যাত্রীদের জন্য থাকবে একটি বগি

বহুল প্রত্যাশিত মেট্রোরেলের যুগে আজ প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেট্রোরেল এখন বাস্তব। আজ উদ্বোধনের পর কাল থেকে সাধারণ মানুষ এতে চড়ে যাবেন গন্তব্যে। শিহরণ জাগা এ অনুভূতি আরও পূর্ণতা পায় স্বপ্নের এই মেট্রোরেলের একটি বগি শুধু রাখা হবে নারী যাত্রীদের জন্য- এই খবর শুনে। শুধু তাই নয়, মেট্রোর স্টেশনগুলোতে মহিলা যাত্রীদের জন্য রাখা হয়েছে পৃথক শৌচাগার।

এমনকি, রয়েছে শিশুদের ডায়াপার পরিবর্তনেরও বিশেষ সুবিধা। গর্ভবতী মহিলা ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য মেট্রোট্রেনের বগির অভ্যন্তরে থাকবে সংরক্ষিত আসন। রাজধানীর গণপরিবহনে যাতায়াত করা নারীরা যখন যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের হয়রানি শিকার হন, তখন এ রকম খবর নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। এমন খবরে উচ্ছ্বসিত এই রুটের নিয়মিত নারী যাত্রীরা। তবে একটি বগির বদলে অন্তত যদি দুইটি বগি রাখা হতো, তাহলে আরও স্বস্তি পাওয়া যেত বলে দাবি তাদের। শুধু নারী যাত্রীদের জন্যই নয়, মেট্রোরেলে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্যও রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। এতে কর্মস্থলসহ যে কোনো গন্তব্যে যাতায়াত আরামদায়ক এবং নিরাপদ হবে, এই আশায় উচ্ছ্বসিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, এমআরটি লাইন-৬ এর আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল পথের উদ্বোধন হবে আজ। এটি বাংলাদেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন, যা ঘণ্টায় ৬০ হাজার এবং একদিনে পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে।

ছয়টি বগিসংবলিত প্রতিটি একমুখী মেট্রোরেল প্রতিবারে ৩৮ মিনিটে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ১৬টি স্টেশন থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৩০৮ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। তবে মতিঝিল পর্যন্ত এখনই চালু হচ্ছে না। সে জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। মেট্রোরেলে নারী যাত্রীদের চলাচল নির্বিঘœ করার জন্য প্রতিটি ট্রেনের একটি করে বগি শুধুমাত্র নারী যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

এমআরটি লাইন-৬ এর উপ-প্রকল্প পরিচালক নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের ছয়টি বগির মধ্যে নারীদের জন্য একটি সংরক্ষিত। তবে নারী যাত্রীরা অন্য বগিতেও যেতে পারবেন। নারী যাত্রীরা অনেকেই মনে করেন, একটি সংরক্ষিত বগি থাকলে তারা অনেকেই স্বস্তি খুঁজে পান। তিনি আরও বলেন, যেহেতু এখানে আলাদা আসন করা হয়নি, তাই বসার ক্ষেত্রে কখনো কম-বেশি হতে পারে।

তবে মতিঝিল পর্যন্ত চালু হলে প্রতিটি একমুখী ট্রেনে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৩০৮ জন যাত্রী পরিবহন করা যাবে, সে আশাবাদ ব্যক্ত তিনি। কোচের ভেতরে দুই সারিতে সবুজ রঙের লম্বা আসন রয়েছে। এর বাইরেও দাঁড়িয়ে যাতায়াত করার ব্যবস্থা আছে। মাঝখানের প্রশস্ত জায়গায় যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে পারবেন। দাঁড়ানো যাত্রীদের ধরার জন্য ওপরে হাতল এবং স্থানে স্থানে খুঁটি আছে। একটি ট্রেনে বসে এবং দাঁড়িয়ে দুইভাবেই যাত্রীরা যাতায়াত করতে পারবেন।

ট্রেনের বগিগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে স্টেশনে থামার পর এর মেঝে একেবারে প্ল্যাটফর্মের সমতলে থাকে। এতে সহজেই যাত্রীরা হেঁটে ট্রেনে উঠতে পারবেন। বগির দুই পাশে চারটি করে দরজা। ভাড়া পরিশোধের জন্য থাকবে স্মার্ট কার্ড টিকিটিং ব্যবস্থা।

চালু হতে যাওয়া মেট্রোরেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের যাতায়াতের জন্য থাকছে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা। রয়েছে অন্ধ যাত্রীদের জন্যও চলাচলের উপায়।

ডিএমটিসিএল ও এমআরটি লাইন-৬ এর কর্মকর্তারা জানান, মেট্রোরেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের যাতায়াতের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী ও খর্বকায় ব্যক্তিরা যাতে টিকিট অফিস মেশিনের (টিওএম) মাধ্যমে সহজে টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন, সে জন্য অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতায় টিকিট বুথ রাখা হয়েছে। একইভাবে যারা হুইল চেয়ার ব্যবহার করেন, তারা টিকিট ভেন্ডিং মেশিন (টিভিএম) ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

যারা হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী, তাদের জন্য কী সুবিধা- এসব বিষয়ে জানা যায়, হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী যাত্রীদের পেইড জোনে সহজে প্রবেশ এবং বাইরের জন্য হুইল চেয়ারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় ভাড়া পরিশোধের প্রশস্ত গেট রয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য লিফটে ওঠা-নামার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার লিফটের ভেতরে ধরার জন্য হাতল, নিন্ম উচ্চতায় কন্ট্রোল প্যানেল ও নিজের অবস্থান বোঝার জন্য আয়না রয়েছে। লিফটের কন্ট্রোল প্যানেলে ব্রেইল পদ্ধতির নির্দেশনা থাকবে।

তাদের স্বাচ্ছন্দ্যে স্টেশনে ওঠা-নামার জন্য লিফটের সামনের পথ ঢালু রাখা হয়েছে। মূক ও বধির যাত্রীরা ডিজিটাল নির্দেশিকা অনুসরণ করে স্বাচ্ছন্দ্যে মেট্রোরেল স্টেশনে ও মেট্রোট্রেনে যাতায়াত করতে পারবেন। অন্ধ যাত্রীদের মেট্রোস্টেশনে চলাচলের জন্য ব্লাইন্ড স্টিম ব্যবহারের সুবিধার জন্য হলুদ রঙের ট্যাকটাইল পথের ব্যবস্থা থাকবে বলে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

আরও জানা গেছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীরা শোনা ও দেখার মাধ্যমে সহজে মেট্রোরেলে যাতায়াত করতে পারবেন। ট্রেনের বগির বহির্ভাগ ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সর্বত্র এমনভাবে ফাঁকা রাখা হবে, যাতে যাত্রীরা নিরাপদ ও সহজে মেট্রোরেলে ওঠা-নামা করতে পারেন।

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনএএম ছিদ্দিক জানিয়েছেন, নিরাপত্তা ও নানা আনুষ্ঠানিকতার কারণে উদ্বোধনের দিন জনসাধারণের মেট্রোরেলে চড়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ পরদিন মেট্রোরেলে উঠতে পারবেন।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সূত্রমতে, প্রাথমি কভাবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার মেট্রোর জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এই পথে থাকবে ৯টি স্টেশন। মেট্রোর প্রথম স্টেশন উত্তরা উত্তর। এর পরের স্টেশন উত্তরা সেন্টার, তারপর উত্তরা দক্ষিণ, এরপর পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া এবং সবশেষ স্টেশন আগারগাঁও। প্রতি দশ মিনিট পর পর ট্রেন আসবে।

নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা বগি রাখায় এই রুটের নিয়মিত যাত্রী আফসানা রহমান বলেন, আমার বাসা ধানমন্ডি ১৫তে। কিন্তু অফিস উত্তরা ৯ নাম্বারে। প্রতিদিন এই পথ গণপরিবহনগুলোতে যাতায়াত করতে গিয়ে কত যে দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়, তা কাউকে বলার মতো না। এতদিন ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম, কবে মেট্রোরেলের উদ্বোধন হবে। মেট্রোরেল তো শুধু উদ্বোধনই হচ্ছে না, পাশাপাশি শুধু নারী যাত্রীদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা একটি বগি। যাত্রাপথে এখন আর অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ, সিট না পেয়ে ঝুলে ঝুলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার আতঙ্ক আর থাকবে না বলেই আশা করছি।