দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেট্রোরেল বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ

মেট্রোরেল চালুর ফলে একদিকে যেমন রাজধানী আরও আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন হবে, অন্যদিকে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস

দেশের বহুল প্রত্যাশিত চার মেগা প্রকল্পের কাজ অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে শুরু করেছিল বর্তমান সরকার। দুটির কাজ শেষ। বাকি দুটির কাজ প্রায় শেষের দিকে। ২৫ জুন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে পদ্মা সেতু। এরপর আজ ২৮ ডিসেম্বর উন্মুক্ত হচ্ছে স্বপ্নের মেট্রোরেল। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও কর্ণফুলী টানেলের কাজ অচিরেই শেষ হবে। পদ্মা সেতু একটি স্বপ্ন, এটি অপার সম্ভাবনার নাম। একটি দেশের মর্যাদার ও অহঙ্কারের প্রতীক, অর্থনীতির নতুন সোপান। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এই পদ্মা সেতু। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা বহুমুখী সেতুর উদ্বোধন করেন। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘নিজস্ব অর্থায়নে বহু প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত বিশ্বের দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। জাতির আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিয়েছে।’ আমরাও তাই মনে করি। উলেস্নখ্য, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ জানে, ফেরি পাড়ি দিয়ে পদ্মা পার হওয়া ভয়ংকর এক অস্বস্তিকর ও দীর্ঘ ভোগান্তির কাজ। এর মধ্যে যথেষ্ট বিড়ম্বনা ও ঝুঁকিও রয়েছে। এর ফলে ৭-৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা লেগে যায়। এর আগে প্রতিদিনই এই ধরনের অমানবিক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ। আর এটা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ যেভাবে যাতায়াত সুবিধা ভোগ করতে পারছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ সেভাবে পারেনি। এবার তাদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতু। যা অত্যাধুনিক স্টিল দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতুর কাজ শেষ করেছে। সরকারের এই উদ্যোগ আজ সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতুই নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের স্বাবলম্বিতার প্রতীক। এটি আমাদের ঐক্য ও অটল মনোবলের স্মারক। আমরাও নিজের প্রচেষ্টায় বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ করে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিতে পারি, এটা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। রাজধানীতে যত সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে যানজট সমস্যা অন্যতম। এর ফলে নগরবাসীর কেবল কর্মঘণ্টাই নষ্ট হয় না, তাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় কাটিয়ে দিতে হয় নগরবাসীকে। যানজট সমস্যা নিরসনের জন্য সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। রাজধানীতে নির্মাণ করা হয়েছে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল। এ ছাড়া সরকার পাতাল রেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দীর্ঘদিনের নাগরিক দুর্ভোগ কমাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। মেট্রোরেল পুরোপুরি বিদু্যৎচালিত রেল। বাংলাদেশে এই প্রথম বিদু্যৎচালিত কোনো রেল চালু হলো। বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি মেট্রোরেল। এটি চালুর কারণে ঢাকার প্রবল যানজট সমস্যার অনেকাংশে সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল বাস্তবায়নে খরচ হচ্ছে ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এ প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন কাওলা থেকে তেজগাঁও রেলগেট পর্যন্ত দৈর্ঘ্য সাড়ে ১১ কিলোমিটার। প্রথম অবস্থায় ১১ কিলোমিটার চালু হবে। মেট্রোরেল চালুর ফলে একদিকে যেমন রাজধানী আরও আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন হবে, অন্যদিকে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। \হএটা সত্য মেট্রোরেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এ দেশের মানুষের ছিল না। যারা কলকাতায় গিয়েছেন, তারা পাতাল রেল ভ্রমণ করে আনন্দ পেয়েছেন। এখানে উলেস্নখ করা দরকার, চীনের সাংহাই শহরের আদলে চট্টগ্রাম শহরকে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’রূপে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার কর্ণফুলি টানেলের মতো চ্যালেঞ্জিং প্রকল্পটি গ্রহণ করে। সরকারের গৃহীত ১০টি মেগা প্রকল্পের মধ্যে এটি একটি। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং। কেননা, নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে এ টানেল। আশা-নিরাশার দোলাচল থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দূরদর্শিতা ও সাহসিকতায় শুধু দেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম নির্মিত হতে যাচ্ছে এ টানেল, যার নামকরণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। দেশের জন্য এটি প্রথমত গর্বের। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি একটি মাইলফলক। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্ণফুলি নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর আগে এ টানেল প্রকল্পের সমীক্ষা হয় ২০১৩ সালে। চলতি বছরই একসঙ্গে ১০০ সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে। উদ্বোধন করা হয়েছে একসঙ্গে ১০০ সড়কও। বর্তমানে দেশে ২২ হাজার ৪৭৬ কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্ক আছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৮০০টি কালভার্ট এবং সাড়ে চার হাজার সেতু আছে। এই সড়ক নেটওয়ার্কে তিন হাজার ৯৯১ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, চার হাজার ৮৯৭ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়ক এবং ১৩ হাজার ৫৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক আছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হলো আরও দুই হাজার কিলোমিটার সড়ক এবং ১০০ সেতু। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এই পুরো পথকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে বিমানবন্দর এলাকার কাওলা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশ এই মাসে চালু করার কথা ছিল। সরকারের আরও একটি প্রকল্প হচ্ছে বাসর্ যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। এটি বাস চলাচলের জন্য একটি বিশেষায়িত পথ। ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে দ্রম্নতগতির গণপরিবহণ ব্যবস্থা চালু করার উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। এরই মধ্যে ঢাকা-গাজীপুরের মধ্যে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রকল্পের একটি উড়ালসেতু আংশিক খুলে দেওয়া হয়। যোগাযোগ খাতে অনেক প্রকল্প হচ্ছে। প্রকল্পগুলো নিঃসন্দেহে অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থান ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টিও বেড়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে পর্যটনশিল্প যেমন বাড়বে তেমনি মানুষের যাতায়াতও আরামদায়ক হবে। চার মেগা প্রকল্প দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনের মাইলফলক। দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী সুফল বয়ে আনবে বলে আমাদের বিশ্বাস। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব যে সত্যি সত্যিই বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছে, পদ্মা সেতু, সহ অন্য তিন বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক তার আপন মহিমা নিয়ে। সালাম সালেহ উদদীন : কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক ও সাংবাদিক
সালাম সালেহ উদদীন
২৮ ডিসেম্বর ২০২২