মেট্রোরেলঃ প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন আজ, চড়া যাবে কাল থেকে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বুধবার উদ্বোধন করবেন বহু প্রতীক্ষিত মেট্রোরেলের এমআরটি-৬ লাইনের দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও অংশ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথে যাত্রী নিয়ে চলবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক ট্রেন। তবে প্রথমদিকে চলবে সীমিত পরিসরে। আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিন থেকে চলবে পুরোদমে।

গতকাল মঙ্গলবার মেট্রোরেলের আগারগাঁও স্টেশনের কনকোর্স লেভেলে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক।
এ সময় ওবায়দুল কাদের জানান, বিএনপি নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান ও ড. আব্দুল মঈন খানকে আমন্ত্রণপত্র দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, উত্তরা থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত ২২ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল লাইন দেশের যোগাযোগ ইতিহাসে নতুন সংযোজন। আপাতত উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত খুলে দেওয়া হচ্ছে। আগামী বছর মতিঝিল পর্যন্ত এবং ২০২৫ সালে কমলাপুর পর্যন্ত চলবে মেট্রোরেল।
ওবায়দুল কাদের জানান, পদ্মা সেতুর আদলে সুধী সমাবেশের মাধ্যমে মেট্রোরেলের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় উদ্বোধন অনুষ্ঠান শুরু হবে। উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরের মাঠে উদ্বোধন ফলক উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী। নিরাপত্তার কারণে আতশবাজির পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়েছে। এরিয়াল ভিউ ও থিম সং পরিবেশন করা হবে। সুধী সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী দিয়াবাড়ী (উত্তরা নর্থ) স্টেশন প্ল্যাটফর্ম থেকে টিকিট কেটে সবুজ পতাকা নেড়ে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেলের উদ্বোধন করবেন। প্রধানমন্ত্রী হবেন মেট্রোরেলের প্রথম যাত্রী।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী স্মারক ডাকটিকিট এবং মেট্রোরেলের প্রথম দিনের কাভার উন্মোচন করবেন। সেই সঙ্গে উন্মোচন করবেন ৫০ টাকার স্মারক নোট। প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে জনসভার উল্লেখ না থাকলেও আওয়ামী লীগ দিয়াবাড়ীতে উদ্বোধন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ব্যাপক জনসমাগমের প্রস্তুতি নিয়েছে।

মেট্রোরেল উদ্বোধন উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপ্রধান বলেছেন, মেট্রোরেল উদ্বোধন জনবান্ধব সরকারের আরেকটি সাফল্য। এমআরটি-৬ লাইনের দিয়াবাড়ী-আগারগাঁও অংশের উদ্বোধন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে অনন্য মাইলফলক। মেট্রোরেল ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় ভিন্ন মাত্রা ও গতি যোগ করবে এবং এতে নগরবাসীর কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে।
মেট্রোরেলকে দেশের গর্ব ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক আখ্যা দিয়ে সরকারপ্রধান বলেছেন, মেট্রোরেল মহানগরবাসীর বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্ন। উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশের উদ্বোধনে সে স্বপ্ন পূরণ হলো। দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আওয়ামী লীগ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উচ্চ পর্যায়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।

ওবায়দুল কাদের জানান, আপাতত উত্তরা নর্থ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত বিরতিহীন চলবে ট্রেন। ধাপে ধাপে পথের সাতটি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে যাত্রী ওঠানামার জন্য। তখন ১৭ মিনিট সময় লাগবে। এর মধ্যে যাত্রা বিরতির ১০ মিনিট।
ধাপে ধাপে কেন চালু করা হচ্ছে মেট্রোরেল- এ প্রশ্নে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিদ্দিক বলেন, উন্নত দেশেও এভাবে চালু করা হয়। সম্প্রতি ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় একইভাবে চালু করা হয়েছে।
ঢাকার মেট্রোর সব ক’টি স্টেশন প্রস্তুত। যাত্রীর অভ্যস্ততার জন্য ধাপে ধাপে চালু করা হচ্ছে। প্রথমদিকে ১০ মিনিট পরপর ট্রেন চলবে। দিয়াবাড়ী-আগারগাঁও অংশে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলবে ট্রেন। পুরোদমে চলাচল শুরু হলে চলবে ভোর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত।

যাত্রীদের ওঠানামায় অভ্যস্ত করতে ১০ মিনিট যাত্রাবিরতি করবে। ট্রেনের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ২ হাজার ৩০৮ জন হলেও আপাতত ২০০ যাত্রী নিয়ে চলবে। আগামী ২৬ মার্চ থেকে পুরো সক্ষমতায় চলবে ট্রেন। তখন সব স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে।
মেট্রোরেলে কিলোমিটারে ভাড়া ৫ টাকা। সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা; সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। কলকাতায় সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ রুপি; সর্বোচ্চ ২৫ রুপি বা ৩০ টাকা। ঢাকায় কেন ভাড়া বেশি- এ প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রতিটি আনন্দে যন্ত্রণাও থাকে। ভাড়া এমন একটি বিষয়, যা কখনও জেনারেলি অ্যাক্সেপ্টেবল হবে না।

এমআরটি-৬-এর নির্মাণ ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। তা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় কয়েক গুণ কেন- প্রশ্নে ডিএমটিসিএলের ছিদ্দিক বলেছেন, সেসব দেশে আরও আগে নির্মিত হওয়ায় নির্মাণ ব্যয় ছিল কম। বাংলাদেশের নির্মাণ ব্যয়ের হিসাবে ভাড়া নির্ধারণ করা উচিত ছিল; তার চেয়ে কমই রাখা হচ্ছে। তিনি জানান, ৩ ফুট বা ৯০ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার শিশুদের ভাড়া লাগবে না। বিনা ভাড়ায় ভ্রমণ করতে পারবেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা। প্রতিবন্ধীরা ১৫ শতাংশ ছাড় পাবেন।
মেট্রোরেলের পরিচালন ব্যয় ও আয় কেমন হবে- প্রশ্নে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, ট্রেন পুরোপুরি অপারেশনে যাওয়ার পর তা বলা যাবে। ভাড়া থেকে যে আয় হবে, তার পরও ৩৫ শতাংশ ঘাটতি থাকবে। তা পূরণে স্টেশন এলাকায় পিওডিসহ বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যাচ্ছে ডিএমটিসিএল। মেট্রোরেলে স্মার্টকার্ড ও পাস ব্যবহারে ভাড়ায় ১০ শতাংশ ছাড় থাকবে।

পারফরম্যান্স টেস্ট, ট্রায়াল রান ও ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট শেষ হওয়া ১০টি ট্রেন চলবে দিয়াবাড়ী-আগারগাঁও অংশে। আর দুটি রিজার্ভ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শুরুতে পাঁচটি ট্রেন চলবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সাড়ে তিন মিনিট অন্তর ট্রেন চলবে। স্টেশনে মিলবে মেট্রো পাস ও টিকিট। পাস বা টিকিট পাঞ্চ করলে স্টেশনের কনকোর্স লেভেলের দরজা খুলবে। বিনা ভাড়ায় বা অতিরিক্ত ভ্রমণ করলে ১০ গুণ জরিমানা গুনতে হবে। এ ছাড়া ট্রেন ও স্টেশনে ধূমপান, পান খাওয়া নিষেধ। পোষা প্রাণী নিয়ে চড়া যাবে না মেট্রোতে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে নানা সুবিধা। নারী ও শিশুদের জন্য থাকছে বিশেষ সুবিধা। মেট্রোরেল চলবে বিদ্যুতে। জাতীয় গ্রিড থেকে পাঁচটি বিকল্প সংযোগ রয়েছে। তাই লোডশেডিংয়ের শঙ্কা নেই।