শঙ্কা কাটিয়ে আমনের বাম্পার ফলন

শঙ্কা কাটিয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট ও দেশে টানা দুই বছর ধরে চালের উচ্চ মূল্যের মাঝে এই বাম্পার ফলনের খবরে স্বস্তি এসেছে। বন্যার পর যে অনাবৃষ্টি শঙ্কা তৈরি করেছিল, হঠাৎ করে সেই বিরূপ আবহাওয়াই অনুকূলে চলে আসায় আমন ধানের বাম্পার ফলন পেল দেশ। তবে সার ও জ্বালানি তেলসহ সব কৃষি উপকরণের বাড়তি দামের কারণে আমন উৎপাদনে কৃষকের বেশি খরচ হয়েছে। তবে খরচ বেশি হলেও খুশির বিষয় হলো, গত বছরের চেয়ে এ বছর হেক্টরপ্রতি আমনের ফলন ৭ শতাংশের বেশি হয়েছে। এতে এবছর আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমনের এই ভালো ফলনে কৃষকের মুখেও হাসি ফুটেছে। সারাদেশেই আমনের বাম্পার ফলনের সঙ্গে দামও ভালো পাচ্ছে কৃষক।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ বছর প্রথম ভাগে অকাল বন্যা এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিতে বোরো ও আউশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর আমন আবাদ করতে গিয়ে কৃষক বৃষ্টিহীনতার মুখোমুখি হয়। সেইসঙ্গে বাজারে চালের দাম আরও বেড়ে সর্বকালের রেকর্ড পর্যায়ে উঠে যায়। ফলে দেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে এক অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি হয়। এই অবস্থায় কৃষি মন্ত্রণালয় আমন আবাদ বৃদ্ধির জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। কারণ উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য পরিস্থিতিতে স্বস্তি আনার জন্য যে কোনো উপায়ে আমন আবাদ সফল করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।

কৃষি মন্ত্রণালয় এবছর ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এর মধ্যে রোপা আমন ৫৬ লাখ ২০ হাজার হেক্টর এবং বোনা আমন ২ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর। এই জমি চাষের আওতায় এনে চাল আকারে আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এক কোটি ৬৩ লাখ টন। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সব উপকরণ যথা: বীজ, সার, কীটনাশক ও সম্পূরক সেচ প্রদান, সঠিক সময়ে সঠিক বয়সের চারা রোপণ ও যথাসময়ে কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের কার্যকরি উদ্দ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

কিন্তু আমন মৌসুমের শুরুতেই অপ্রতুল ও অসম বৃষ্টিপাতের কারণে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় একটি ধাক্কা আসে। জুন-জুলাই-আগস্ট একটানা তিন মাস স্বাভাবিকের চেয়ে অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে বৃষ্টি। ফলে সময়মত বীজ বপন ও চারা রোপণ ব্যাহত হয়। ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পিছিয়ে যায় আমন আবাদ। ফলে কৃষক ও জনমনে শঙ্কা সৃষ্টি হয় আমন আবাদ নিয়ে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুততম সময়ে সেচ পাম্প ও সেচ প্রকল্প চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে কৃষি বিভাগ। কৃষিমন্ত্রী কেবিনেট সভায় সেচের জন্য ১৫ দিন নিরবছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা চান। প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেন। প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে নিরবছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশনা প্রদান করেন। পরবর্তীতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সকল সেচ পাম্প ও সেচ প্রকল্পগুলো চালুকরণের মাধ্যমে সম্পূরক সেচ নিশ্চিত করা হয়। দ্রুত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে মওসুমের শুরুতে বৃষ্টিপাত কম হলেও সেচ পাম্প দিয়ে প্রয়োজন মাফিক সেচ দিয়ে যথাসময়ে আমন চাষ শুরু হয়। পরবর্তীতে দেশের আবহাওায়ও হঠাৎ করেই অনুকূলে চলে আসে। শুরু হয় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক হওয়ায় আমন চাষাবাদে আর কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি কৃষকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এ বছর দেশে ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও উৎপাদন হয়েছে ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে। কৃষি মন্ত্রণায়ের আপ্রাণ চেষ্টার কারণে শেষ পর্যন্ত আমন আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়।

ইতোমধ্যে আমন ধান কাটা শেষ পর্যায়ে। দেশব্যাপী চলছে ধান কাটা উৎসব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৯ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমির ফসল কাটা হয়েছে, যা মোট জমির প্রায় ৮৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এসব জমিতে চাল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৪৩ হাজার টন। হেক্টরপ্রতি ফলনের হার ২ দশমিক ৯৭ টন।

অবশ্য বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বলছে, চলতে মৌসুমে আমনের ফলন হয়েছে হেক্টরপ্রতি ২.৭৬ টন যা, গত বছরের চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। হেক্টরপ্রতি আমনের এই ফলন ছিল ২০১৭ সালে ২.৪৫ টন, ২০১৮ সালে ২.৪৬, ২০১৯ সালে ২.৫০, ২০২০ সালে ২.৫৫ এবং ২০২১ সালে ২.৫৭ টন। ব্রির হিসাবে, এ বছর (২০২২ সালে) আমনে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে।

এ বছর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ে ৩১ জেলার ৮০ হাজার ৭৭৭ হেক্টর আমন মৌসুমের ধান আবাদি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। তারমধ্যেও এবার আমনের আশাতীত ফলনের কারণ হচ্ছে অনুকূল আবহাওয়া। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমনের ভালো ফলনের জন্য পরিস্কার সূর্যালোক, অধিক সৌর বিকিরণ, অধিক গড় তাপমাত্রা, কম আপেক্ষিক আদ্র্রতা এবং মেঘমুক্ত আকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ধানের অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়, প্রজনন পর্যায় এবং সমগ্র জীবনকালে যথাক্রমে মোট ৬০৯, ৪০১ এবং ১০১০ ঘণ্টা সূর্যালোক প্রয়োজন। চলতি আমন মওসুমে অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে ৬১০ ঘণ্টা, প্রজনন পর্যায়ে ৪২৫ ঘন্টা এবং সমগ্র জীবনকালে ১০১২ ঘণ্টা সূর্যালোক ছিল।

এছাড়া, আবহাওয়ার রেকর্ড থেকে দেখা যায়, আমন ২০২২ মৌসুমে মোট সূর্যালোক ছাড়াও সৌর বিকিরণ ও গড় তাপমাত্রা বেশি, আপেক্ষিক আর্দ্রতা কম এবং মেঘমুক্ত আকাশ থাকায় ফলন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এছাড়াও কুশি গঠনের জন্য সর্বোত্তম গড় তাপমাত্রা হলো ২৫-৩১ ডিগ্রী সেলসিয়াস। চলতি আমন মৌসুমে অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯.৬৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাই অসম বৃষ্টিপাতের দরুন ধানের বপন ও রোপন ১০-১৫ দিন বিলম্ব হলেও অঙ্গজ বৃদ্ধি পর্যায়ে (জুলাই-আগস্ট) তাপমাত্রাসহ অন্যান্য উপাদানসমূহ অনুকূল থাকায় গাছের সার ব্যবহার দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। যা গাছের সালোক-সংশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে গাছের অঙ্গজ বৃদ্ধি ত্বরান্বিত এবং কুশির সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

অন্যদিকে প্রজনন পর্যায়ে সর্বোত্তম গড় তাপমাত্রা ২৫-২৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। চলতি আমন মৌসুমে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৬.৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা প্রজনন পর্যায়ে ফুল ফোটার জন্য সর্বোত্তম। প্রজনন পর্যায়ে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, মোট সূর্যালোক ও সৗর বিকিরণ ফলন বৃদ্ধির অত্যান্ত সহায়ক হওয়ায় ফুলফোটা, পরাগায়ন ও গর্ভাধানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা চিটার পরিমাণ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

ধানের পরিপক্ক পর্যায়ে (অক্টোবর-নভেম্বর) দানা গঠন প্রক্রিয়ার সময় অধিক সৌর-বিকিরণ ও সূর্যকিরণকাল, তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা আস্তে আস্তে কমে আসায় (২৮-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ধানের শীষে বিদ্যমান দানায় সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন কার্বোহাইড্রেট সরাসরি সরবরাহ করে, যা ধানের প্রতিটি শীষে পুষ্ট দানার সংখ্যা বৃদ্ধি করে ফলনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এ বছর পরিপক্ক পর্যায়ে তাপমাত্রা ২৭-২৪ ডিগ্রী সেলসিয়া থাকায় অধিক ফলনে ভূমিকা রেখেছে।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও এ বছর আমনের ভালো ফলনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আর ভালো ফলন পেয়ে কৃষকরাও ভীষণ খুশি। ভয়াবহ বন্যার পর খরায় বছরজুড়ে সিলেট অঞ্চলের ধানচাষিদের কপালে ছিল দুশ্চিন্তার ভাঁজ। তবে চলতি মৌসুমে আমন ধানের বাম্পার ফলনে হাসি ফুটেছে তাদের মুখে। বিভাগজুড়ে ধান কাটা নিয়ে কৃষকদের এখন কর্মযজ্ঞ চলছে। শিশিরে ভেজা আমন ধান কাটতে ভোর থেকেই ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। একইসঙ্গে চলছে ধান মাড়াই করে শুকিয়ে গোলায় তোলার কাজও।

বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, সিলেট বিভাগের চার জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে এ বছর রোপা আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ তিন হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে। তবে আবাদ হয়েছে চার লাখ ১৫ হাজার ৫৪৬ হেক্টর জমিতে। চলতি বছর হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাতের ধান মিলে বিভাগে ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে বাম্পার ফলনের কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে চাল উৎপাদন।

সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের কৃষক হামিদ মিয়া জানান, ‘এ বছর কয়েক বার বন্যার পরও জমিতে স্থানীয়, উফশী ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করেছি। ধান কাটা শুরু হয়েছে। আমাদের এলাকার সবার জমিতে ফলন ভালো হয়েছে। তবে প্রতিবছরের মতো এবার ধান কাটার শ্রমিক সংকট, তাই জমির ধান উঠাতেও দেরি হচ্ছে। তবে মেশিন দিয়েও চলছে ধান কাটা।’

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার আঙ্গুরাকান্দি গ্রামের কৃষক ইসমাইল বলেন, ‘ভয়াবহ বন্যার পরও ধানের যা ফলন হয়েছে তাতে আমি অনেক খুশি। কিন্তু এবার শুধু বন্যা নয় খরাও ছিল। তাই অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে আমাদের।’

হাওর অঞ্চলের সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ জেলা হলো সুনামগঞ্জ। অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও উজানের ঢলে এই জেলার পুরোটাই প্রায় পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই জেলায় এ বছর উফশী, হাইব্রিড ও স্থানীয় মিলিয়ে প্রায় ৮২ হাজার ২১৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। গত মৌসুমের তুলনায় এবার এক হাজার ১০২ হেক্টর জমিতে বেশি আমন ধান আবাদ হয়েছে।

ভাল ফসল পাওয়ায় এ জেলার কৃষকরা ভীষণ খুশি। কৃষকরা জানান, গত জুন মাসে সিলেট বিভাগে শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় ভাড়ারের ধান, বীজধান ও খোরাকির ধান পানির মধ্যে থেকে নষ্ট হয়ে যায়। তখন মাঠঘাট ও সড়ক ডুবে থাকায় কৃষকেরা ভেজা ধান শুকাতে না পারায় কালচে হয়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেই ধান। যার ফলে কৃষকের ধানের ভাড়ার ছিল প্রায় শূন্য।

কৃষকদের দুর্দশার কথা চিন্তা করে সরকার ১৬ হাজার আমন চাষীকে বীজ ও সার দেয়। ১০ হাজার ১২০ জন চাষিকে দেওয়া হয় সবজি বীজ। বিশেষ প্রণোদনা এবং বন্যার পলিতে জমি উর্বর হওয়ায় আমন চাষের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। সেই আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। হেক্টরপ্রতি এবার চার টন ধান (চাল ২.৬৭ মেট্রিক টন) উৎপাদন হয়েছে। ফল আমন ধান দিয়ে আবার শূন্য ভাড়ার পূর্ণ করছেন কৃষক। বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ ধানে চিটার কারণে কিছু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

সদর উপজেলার বুড়িস্থল গ্রামের আলম হোসেন মুন্না বলেন, ‘বন্যায় এবার আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। এখন আমন ধানে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। খোরাকির সঙ্গে কিছু বিক্রিও করতে পারব। প্রতি বছর এভাবে আমন মৌসুম পেলে কৃষকরা লাভবান হবেন।’

সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের বাদে সাদেকপুর গ্রামের কৃষক উকিল মিয়া বলেন, ‘বন্যার পর পর আমরা পলি পেয়ে আমন চাষ করেছিলাম। ভালো ফলন পেয়েছি।’ মোহনপুর ইউনিয়নের বর্মাউত্তর গ্রামের নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘এবার আমাদের এলাকায় আমনের ফলন ভালো হয়েছে। বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ১৬ মণ ধান হয়েছে।’

তবে ট্রাক্টরে হাল দেওয়া, সেচ, মেশিনে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে ডিজেল ব্যবহার করায় খরচ বেশি হয়েছে বলে জানান এই কৃষক। তিনি বলেন, ‘ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যয় অন্য বছরের চেয়ে বেশি হয়েছে। তবে বাম্পার আমন ফলন পেয়ে কৃষকরা অনেক খুশি।’

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘এবারের বন্যায় আমাদের কৃষকসহ সবশ্রেণির মানুষের বহুমুখী ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এখন বাড়ি এসে দেখি, গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে পাকা আমন ধানের বিস্তার। ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ করছেন কৃষকরা। আমনের বাম্পার ফলনে বাজারে চালের দাম কমছে। শাকসবজিতেও মাঠ ভরে আছে। আশা করছি, আগামী বছর আমাদের ভালো যাবে। তাছাড়া আসছে বোরো মৌসুমে অনাবাদী সব জমি যাতে চাষাবাদের আওতায় আনা হয় সেজন্য সরকার নির্দেশনা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বলেন. ধান রোপণের পর অনুকূল আবহাওয়া ও আলো বেশি থাকায় এবার হেক্টরপ্রতি চালের গড় ফলন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হয়েছে। মাঠ থেকে ধান কাটার পর আমনের যে ফলন পাওয়া যাচ্ছে তাতে হেক্টরপ্রতি ২.৭৬ টন পাওয়া যাচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। সে হিসেবে এ বছর আমনে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লক্ষ টন চাল উৎপাদন প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনুকূল আবহাওয়া ছাড়াও বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় অনেক নীচু জমি আমন চাষের আওতায় এসেছে এবং স্বাভবিকের তুলনায় বেশি ফলন হয়েছে। অন্যান্য বছর এসব জমিতে ধান রোপণ করা সম্ভব হয় না। অনেক সময় রোপন করা গেলেও উপর্যুপরি বন্যায় ফসল নষ্ট হয় এবং কিছু টিকে থাকলেও পোকা-মাকড়ের আক্রমণে ফলন অনেক কমে যায়।

ড. শাহজাহান কবীর আমন কাটার পর দেশের খাদ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, আমার হিসাবে আগামী জুন পর্যন্ত বোরো (২ কোট ৪ লাখ টন), আউস (৩০ লাখ টন) এবং আমন (১ কোটি ৬৩ লাখ টন) ধরে মোট উৎপাদন হবে ৩ কোটি ৯৭ লাখ টন। প্রতিদিন জনপ্রতি ৪০৫ গ্রাম করে চাল খাওয়ার হিসাব করলে ১৭ কোটি মানুষের জন্য চালের প্রয়োজন হবে ২ কোটি ৫১ লাখ টন। অন্যান্য ব্যবহার হিসাবে ২৬.১২ শতাংশ হিসেব করে চালের প্রয়োজন ১ কোটি৩ লাখ টন। সে হিসেবে উদ্বৃত্ত থাকবে ৪২ লক্ষ টন। এ হিসেবে যত ত্রুটিই আমরা বিবেচনায় নেই না কেন আগামী জুন পর্যন্ত দেশে চালের কোন সংকট হবে না। শুধু প্রয়োজন নিরবছিন্ন সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করা। সাপ্লাই চেইন যাতে কোন অবস্থাতেই বিঘ্নিত না হয় সে দিকে তীক্ষè রাখতে হবে। তা হলেই দেশের খাদ্য পরিস্থিতিতে বিশেষ করে চালে একটি স্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করবে।