৫০ পর্যটনকেন্দ্রে বড় বিনিয়োগ হবে

দেশের পর্যটন খাতের সুপরিকল্পিত উন্নয়নে ৩০ বছর মেয়াদি পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে। তিন বছর পর নানা সংকট পেরিয়ে এটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। চলতি ডিসেম্বরে মহাপরিকল্পনার খসড়া প্রণয়ন শেষ হবে। মার্চে তা চূড়ান্ত করা হবে। এতে দেশের এক হাজার ৫১টি গন্তব্যকে পর্যটন পণ্য হিসেবে উন্নয়নের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে ৩০ বছর মেয়াদি এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে বিদেশি পরামর্শক সংস্থা আইপিই গ্লোবাল। সংস্থাটির সঙ্গে ২০১৯ সালে চুক্তি করে বিটিবি। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি মহাপরিকল্পনাটির প্রণয়নকাজ শুরু হয়, যা একই বছর ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় এটির সময় চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

এতে ব্যয় হচ্ছে ২৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। মহাপরিকল্পনায় পুরো দেশের পর্যটন আকর্ষণকে কোস্টাল, পাহাড়, বরেন্দ্র, গারো, সমুদ্র—এমন ১১টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এসব এলাকার কোথায় কোন ধরনের অবকাঠামো হবে, তা নির্ধারিত থাকবে।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন, নদী-হাওরসহ প্রাচীন পুরাকীর্তিসহ নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বে পর্যটনশিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনো বাংলাদেশ পিছিয়ে।

মুন্ডি ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটনশিল্পে বিশ্বের ১৮৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪১তম। এশিয়ার ৪৬টি দেশের মধ্যে ৪২তম।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গত বছরের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৩.০২ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে পর্যটন খাতের কোনো মহাপরিকল্পনা না থাকায় অপরিকল্পিতভাবে বিকশিত হয়েছে পর্যটন খাত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে কক্সবাজারের মতো বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকতে গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো। আবার পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে হুমকিতে একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। সুন্দরবন, কুয়াকাটাসহ অন্যান্য গন্তব্যগুলোয় নেই পর্যটক আকর্ষণের উপযোগী পরিবেশ। পর্যটন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের পর্যটন খাতের সুষম বিকাশ সম্ভব বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠান জার্নি প্লাসের নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও পাটা বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক তৌফিক রহমান বলেন, ‘একটি পূর্ণাঙ্গ মহাপরিকল্পনা ছাড়া বিশ্বের কোনো দেশই পর্যটন খাতে পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে পারেনি। আমাদের মাস্টারপ্ল্যান না থাকার কারণে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। যেটুকু হয়েছে, তা অপরিকল্পিতভাবে। তাই মাস্টারপ্ল্যান আরো ২০ বছর আগে হওয়া উচিত ছিল। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আমাদের সব কিছু বুঝতে সময় লেগে যায়। বাস্তবায়নে লাগে আরো বেশি সময়। ’

বিটিবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তাহির মো. জাবের বলেন, ‘চলতি মাসের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান আইপিআই গ্লোবালের কাছ থেকে মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া পেয়ে যাব। গতকাল একটি অংশ পেয়েছি, বাকিটা এই মাসের মধ্যে পেয়ে যাব। এরপর এটা নিয়ে আমরা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বেশ কিছু কনসালটেশন মিটিং করে সবার মতামত নিয়ে এটি মার্চের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে। এরপর এর বাস্তবায়নের জন্য এটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় পর্যটন পরিষদে তোলা হবে। প্রধানমন্ত্রী এর সভাপতি। এখান থেকে অনুমোদিত হলে এর বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। এটি যাতে কাগুজে দলিল হিসেবে পড়ে না থাকে, এ জন্য আমরা এখন থেকেই অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি শুরু করে দিয়েছি, যাতে এটি অনুমোদন হওয়ার পরপরই আমরা এটি বাস্তবায়ন শুরু করে দিতে পারি। ’

বিটিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা এক হাজার ৫১টি পর্যটন গন্তব্য চিহ্নিত করেছি। এর মধ্যে আমরা সবচেয়ে আকর্ষণীয় ৫০টিকে ধরে বড় ধরনের দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আনা হবে। প্রথমে ৫০টি পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নে আর্কিটেকচারাল প্ল্যান, স্ট্র্যাকচারাল প্ল্যান, ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান এবং ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান করা হবে। যেখানে সরকারি বিনিয়োগের দরকার হবে, তা সরকারিভাবে করা হবে; আর বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য এখানে প্রচুর বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।

বিটিবি সূত্র জানায়, খসড়া মহাপরিকল্পনায় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি এই মহাপরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে দেশের পর্যটনশিল্পের বর্তমান অবস্থা, এর শক্তি কতটুকু, দুর্বলতা কোথায়, সম্ভাবনা কেমন, কোন ধরনের সংকট রয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়েছে বাংলাদেশের পর্যটনের ভিশন, মিশন, স্ট্র্যাটেজিক অবজেক্টিভস, প্রায়োরিটিস এবং লিংকেজ। তৃতীয় পর্যায়ে জোন বা এরিয়া নির্দিষ্ট করে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যান ঘোষণা করা হবে। মাস্টারপ্ল্যানের মধ্য দিয়ে সমন্বিত উদ্যোগে পর্যটনের সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বদলে যাবে দেশের পর্যটন খাত। বাংলাদেশ পর্যটনশিল্পের নতুন যুগে প্রবেশ করবে।

পর্যটনের উন্নয়নে ১৯টি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিন্তু এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ খাত সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের।

বিটিবির গভর্নিং বডির সাবেক সদস্য ও পর্যটন বিশ্লেষক জামিউল আহমেদ বলেন, ‘সারা বিশ্বে পর্যটন চলে পর্যটনের নিয়মে, আর আমাদের পর্যটন চলে আমলাদের ইচ্ছায়। ফলে এতে না আছে ব্যবস্থাপনা, না আছে কোনো শৃঙ্খলা। মহাপরিকল্পনার আশায় থেকে স্বল্প মেয়াদের পরিকল্পনাও যথাযথ বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ’

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির জন্য পর্যটন একটি সম্ভাবনাময় খাত। তবে এই শিল্পের বিকাশ ও মানোন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত অংশগ্রহণের বিকল্প নেই। এসব বিষয়ে আমাদের আরো মনোযোগী হতে হবে। ’