নিশ্চিত আয়ের পথ দেখাচ্ছে চুক্তিভিত্তিক পোলট্রি খামার

যশোর সদর উপজেলার ভাতুড়িয়া গ্রামের খামারি মো. ফিরোজ হোসেন ১৯৯৮ সাল থেকে পোলট্রি মুরগি উৎপাদনে জড়িত। প্রথম দিকে তিনি নিজ উদ্যোগে মুরগি উৎপাদন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ডিলারের ওপর নির্ভরশীল হন তিনি। অর্থসংকটে বাকিতে মুরগির বাচ্চা ও ফিড কিনে মুরগি পালন করেন। এভাবে খামার করে মাঝেমধ্যে লোকসান করতে হয়েছে তাঁকে। এর মধ্যে করোনার দুই বছরে খামার বন্ধ ছিল। কাজী ফার্মস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে গেছেন তিনি। প্রথম চালানে ছয় হাজার মুরগি পালনের মাধ্যমে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা পেয়েছেন তিনি। প্রতিটি মুরগি থেকে প্রায় ২৩ টাকা আয় করেছেন ফিরোজ হোসেন।

এভাবেই নিশ্চিত আয়ের পথ দেখাচ্ছে চুক্তিভিত্তিক খামার। কাজী ফার্মসের অধীন দেশের প্রায় ১৬ জেলায় আড়াই হাজারের বেশি চুক্তিভিত্তিক খামার রয়েছে। এর মধ্যে ভালো আছেন যশোরের শতাধিক খামারি। সব খামারে উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণনের সব পর্যায়ে কম্পানির মাধ্যমে খামারিদের সুবিধা প্রদান করা হয়। কোনো ধরনের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা ছাড়াই তাঁরা পোলট্রি মুরগি উৎপাদন করতে পারেন। পাশাপাশি চুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি খামারির অর্থ তাঁদের ব্যাংক হিসাবে দেওয়া হয়।

উৎপাদন ও বিপণন থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ তথ্য কম্পানির কাছে লিপিবদ্ধ থাকে বলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কোনো ঘাটতি নেই। মুরগির মালিক কাজী ফার্মস। খামারিকে ওজন অনুযায়ী ফি দেওয়া হয়। মুরগি যদি মারা যায়, তাহলে লোকসান কাজী ফার্মস বহন করবে, তবে খামারির ফি কিছুটা কমে যাবে। কোনো ধরনের ক্ষতি ছাড়াই মুনাফা করতে পারেন খামারি। বীমা সুবিধার মতোই চুক্তিভিত্তিক খামারিরা এসব সুবিধা পাচ্ছেন। এই ব্যবস্থাপনায় কম্পানি খামারিকে শর্ত সাপেক্ষে খামারের জন্য সব ধরনের উপকরণ দিয়ে যাচ্ছে। কাজী ফার্মস তাদের চুক্তিভিত্তিক খামারিদের কাছে কোনো উপকরণ বিক্রি করে না। শর্ত সাপেক্ষে এসব উপকরণ দেওয়া হয়।

মো. ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘গত বছর কাজী ফার্মসের স্থানীয় কর্মকর্তারা এসে আমাকে বললেন চুক্তিভিত্তিক খামার করতে। তাঁদের শর্ত আমার পছন্দ হয়েছে। আমি শুধু খামার, বিদ্যুৎ এবং কাঠের তুষ আর শ্রম দেব। বাকি সব কিছুই শর্তের মাধ্যমে কম্পানি দেবে। খামার ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা এবং উৎপাদিত মুরগি বিক্রিও করে দিচ্ছে তারা। আমি চালান শেষে টাকা পেয়ে যাচ্ছি। একটি চালানে মুরগি উৎপাদন করতে সর্বোচ্চ ৪০ দিন সময় লাগে। বছরে সাত-আটটি চালানে মুরগি উৎপাদন করছি। ’

যশোরের অভয়নগরের বিভাগদী গ্রামের খামারি আয়েশা সিদ্দিকা নাদিরা। তিনি ২০১৭ সালে তৈরি করেন মুরগির খামার। ডিলারের মাধ্যমে পরিচালিত করে প্রথম চালানে মাত্র ৯ হাজার টাকা মুনাফা করেন। কিন্তু কাজী ফার্মসের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক খামার করে মুনাফা বেড়েছে তাঁর। সর্বশেষ চালানে দুই হাজার ৫০০ মুরগি উৎপাদন করে তিনি ৭৪ হাজার টাকা পেয়েছেন।

আয়েশা সিদ্দিকা নাদিরা বলেন, ‘গত বছরে আমার মেয়েকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি। তার জন্য এখন প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা পাঠাতে হয়। এই নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলাম। চুক্তিভিত্তিক খামার করে আমি সম্পূর্ণ দুশ্চিন্তামুক্ত। মেয়েকে টাকা পাঠাতে পারছি। প্রতিদিন কম্পানির মানুষ এসে খামার পরিচর্যা করে যাচ্ছেন। ’

খামারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক খামারের কারণে কম খাদ্য দিয়ে বেশি পরিমাণে মুরগি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। সর্বোপরি খামারিদের প্রতিটি মুরগি থেকে ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত মুনাফা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে অনান্য পরিবেশক নিয়ন্ত্রিত স্বাধীন খামারিরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকা। পরিবেশক নিয়ন্ত্রিত স্বাধীন খামারিদের অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে নানা দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তা থাকলেও কাজী ফার্মসের চুক্তিভিত্তিক খামারে সেই ভয় নেই। ’

যশোর সদরের গাইদগাছি গ্রামের নাসিম আহমেদ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন। করোনার সময় চাকরি চলে গেলে বাড়িতে চলে আসতে বাধ্য হন তিনি। বাড়িতে তিনি কাজী ফার্মসের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক পোলট্রি খামার করেছেন। প্রথম চালানে দুই হাজার ১০০ মুরগি পালন করে ৬০ হাজার টাকা পেয়েছেন তিনি।

মো. নাসিম আহমেদ বলেন, ‘খামার করে এখন বেতনের চেয়ে বেশি আয় করছি। আমাদের এই ব্যবস্থাপনা স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসে কম্পানির বিষয়ে তথ্য নিয়ে গেছেন। তাঁরা যাচাই-বাছাই করে বলেছেন, এই কম্পানি বেশ ভালো সুবিধা দিচ্ছে। খামারিদের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা করছে না। ফলে আমরা কম্পানির প্রতি আস্থা রাখছি। ’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে নিবন্ধিত ও অনিবিন্ধত খামার ছিল প্রায় ৯০ হাজার। গত ছয় মাসের ব্যবধানে পোলট্রি খামার কমে গেছে প্রায় ১০ হাজার। বর্তমানে ৭৮ থেকে ৮০ হাজার খামার সচল থাকলেও বেশির ভাগই লোকসান করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী পোলট্রি খামারের বাণিজ্যিকীকরণ করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন চুক্তিভিত্তিক খামারিরা। বিশ্বের উন্নত দেশে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ খামারি চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন করেন। সেখানে বাংলাদেশে এই হার মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ। কয়েকটি স্থানীয় পর্যায়ে কম্পানির অসাধুতার কারণে প্রতিষ্ঠিত কম্পানিগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। এ জন্য দেশে চুক্তিভিত্তিক খামার সম্প্রসারণে সরকারের নীতি সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।