টিকার চতুর্থ ডোজ কেন নেবেন

বিশ্বের কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশেও আগামী ২০ ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে করোনা টিকার চতুর্থ ডোজ শুরু হতে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বয়স্ক জনগোষ্ঠী, ফ্রন্টলাইনার ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদেরকে টিকার চতুর্থ ডোজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, এক ডোজ টিকার ফলে তৈরি অ্যান্টিবডি অন্তত ছয় মাস পর কমতে শুরু করে। চতুর্থ ডোজ টিকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে গত মাসে গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। তবে তারপরও জনমনে প্রশ্ন আছে— টিকার চতুর্থ ডোজের প্রয়োজনীয়তা কী?

চলতি বছরের আগস্ট মাসে বিএসএমএমইউ এক গবেষণায় জানায়, বুস্টার ডোজ নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই কমতে শুরু করে অ্যান্টিবডি। কোভিড-১৯ টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের এক মাস পরে পরিচালিত গবেষণায় ২২৩ জনের মধ্যে ৯৮ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। যারা আগেই কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের শরীরে তুলনামূলক বেশি অ্যান্টিবডি পাওয়া গিয়েছিল। টিকা গ্রহণের ৬ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরে দেখা গিয়েছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবডির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। করোনা টিকার চতুর্থ ডোজের প্রয়োজন আছে কিনা তা জানতে ওই গবেষণা করা হয় বলে জানান বিএসএমএমইউ ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো ইমিউনোকমপ্রোমাইজড ব্যক্তিদের জন্য চতুর্থ ডোজের সুপারিশ করেছে। জানুয়ারি মাসে ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে চতুর্থ ডোজটি আরও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করে— যখন এটি ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের পাশাপাশি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য চতুর্থ ডোজ অনুমোদন দেয়। এক্ষেত্রে শর্ত ছিল তাদের তৃতীয় ডোজের পরে চার মাসেরও বেশি সময় অতিবাহিত হতে হবে।

তাদের কাছে এখন ১০ লাখেরও বেশি মানুষের কাছ থেকে তথ্য রয়েছে যে, চতুর্থ ডোজটি জনসংখ্যার বিভিন্ন অংশে সংক্রমণ এবং গুরুতর রোগ প্রতিরোধে কতটা কার্যকর হয়েছে। দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে তারা ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১২ লাখ মানুষের ওপর গবেষণা করে। তারা দেখেছেন, চতুর্থ ডোজের এক মাস পর মারাত্মক কোভিড-১৯-এর হার ৩ ডোজের গ্রুপের চেয়ে সাড়ে ৩ গুণ কম।

ওমিক্রন সংক্রমণ এবং ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বিশ্লেষণের পর হাসপাতালে ভর্তির বিষয়ে ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস পর্যন্ত দুই ডোজের পর ৭২ শতাংশ সুরক্ষা পাওয়া গেছে, যা বুস্টার ডোজের দুই সপ্তাহের মধ্যে ৮৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

ইমিউনোলজিস্ট এবং ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিনের অধ্যাপক পিটার ওপেনশ বলেন, ‘কিছু অতিরিক্ত বুস্টারের প্রয়োজন হবে। মনে রাখবেন, হুপিং কাঁশি বা পোলিও থেকে পুরোপুরি রক্ষা পেতে আমাদের ভ্যাকসিনের চারটি ডোজ প্রয়োজন। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য হতে পারে, কিন্তু আমাদের অপেক্ষা করতে হবে এবং দেখতে হবে।’

বাংলাদেশে টিকার চতুর্থ ডোজ দেওয়ার সুপারিশ করেছে ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নাইট্যাগ)। নাইট্যাগের সদস্য ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘চতুর্থ ডোজ নিয়ে সাড়া দুনিয়াজুড়েই চিন্তা ভাবনা আছে। পক্ষে-বিপক্ষে মতও আছে। করোনার টিকার বিষয়ে দেখা গেছে, কোনোটাই দীর্ঘমেয়াদি শতভাগ সুরক্ষা দিচ্ছে না। অ্যান্টিবডি যেটা তৈরি হয়, সেটি আবার নিচে নেমে যায়। সেক্ষেত্রে বুস্টার ডোজ সেটি তৃতীয় হোক কিংবা চতুর্থ ডোজ হোক দিলে অ্যান্টিবডি একটু বুস্টআপ করবে। সেক্ষেত্রে যদি চতুর্থ ডোজ দেওয়া যায়, কিছু কিছু মানুষ এই কারণে সুরক্ষা পাবে। না নিলে তারা সুরক্ষা পেতো না। সেই হিসেবে চতুর্থ ডোজ দেওয়া যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে আমাদের একটা সমস্যা হলো প্রথম ডোজ অনেকেই পায়নি। ওই মানুষগুলো কিন্তু পুরোপুরি অরক্ষিত। কিছু লোক দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি, আবার বুস্টার ডোজ অনেকেই নেয়নি। এর মধ্যে আমরা চতুর্থ ডোজ দিতে যাচ্ছি।’

আগামী ২০ ডিসেম্বর রাজধানীর সাতটি হাসপাতালে পরীক্ষামূলকভাবে করোনা টিকার চতুর্থ ডোজ দেওয়া হবে। অন্তঃসত্ত্বা নারী, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং ফ্রন্ট লাইনারদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রতি কেন্দ্রে ন্যূনতম একশ’ জনকে টিকা দেওয়া হবে। এর পর দুই সপ্তাহ তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এসএমএসের মাধ্যমে আগের দিন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে দেওয়া হবে।

এ কার্যক্রম চলবে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত। এরপর ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকা ষাটোর্ধ্ব নাগরিকদের চতুর্থ ডোজের টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর।

চতুর্থ ডোজ যেসব কেন্দ্রে দেওয়া হবে সেগুলো হচ্ছে— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ ও জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।