নীড় উন্নয়ন ৩০ বছরের মজুত থাকলেও গ্যাস নেই বলে প্রচার

৩০ বছরের মজুত থাকলেও গ্যাস নেই বলে প্রচার

তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে কাজ করে এমন তিনটি বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা বলেছে, বাংলাদেশে অনাবিষ্কৃত গ্যাসের মজুত ৩২ থেকে ৪২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। দেশে প্রতিবছর গ্যাসের চাহিদা ১ টিসিএফ। এ হিসাবে অন্তত ৩০ বছরের গ্যাসের মজুত রয়েছে দেশে। এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা না করেই গত কয়েক বছর ধরে বলা হচ্ছে দেশে আর গ্যাস নেই, বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিই একমাত্র ভরসা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও এই কেনাকাটার স্থানীয় এজেন্টদের কারণে গ্যাস না তুলে দেশ গ্যাসশূন্য বলে প্রচার করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করা দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপের ভিত্তিতে ব্যাপক আকারে কূপ খনন করা হয়নি। অথচ এসব জরিপের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের স্থলভাগেই বিপুল পরিমাণ গ্যাস রয়েছে। দেশের মাত্র ১০ ভাগ এলাকা অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে। ৯০ ভাগ এলাকায় অনুসন্ধান না করেই যারা বলছেন গ্যাস নেই- তারা কীভাবে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয় সেটি জানেন না, এ বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই।

তিনি বলেন, বেঙ্গল বেসিন বা ব-দ্বীপ এলাকার ত্রিমাত্রিক জরিপ বলছে, সমতলে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা ও সাগরভাগে নিশ্চিত গ্যাস আছে। এসব গ্যাস তোলার বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ নেই।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা তারা করে যাচ্ছেন। যেহেতু বিষয়টি ব্যয়বহুল সে কারণে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে এমন সব এলাকায় আগে কূপ খনন করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ভোলায় গ্যাসের মজুত বেড়েছে নতুন কূপ খনন করার কারণে। আগামীতে ভোলায় আরও কূপ খনন করা হবে। শেভরন নতুন এলাকায় কূপ খননের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। সিলেট গ্যাসফিল্ডের পরিত্যক্ত কূপে নতুন গ্যাস মিলেছে। সব মিলিয়ে স্থলভাগে গ্যাসের উৎপাদন বাড়বে বলে তার দাবি।

বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের জরিপ যা বলছে
সারা দুনিয়ার তেল-গ্যাসের মজুতের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ (ইউএসজিএস) তথ্য প্রকাশ করে থাকে। এই তথ্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। ইউএসজিএস ও পেট্রোবাংলার যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৮ সালে দেশের তেল-গ্যাসের মজুতের ওপর একটি সমীক্ষা করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ সম্ভাবনায় অনাবিষ্কৃত গ্যাস মজুত ৩২ দশমিক ৫ টিসিএফ, এর মধ্যে ৮ দশমিক ৫ টিসিএফ পাওয়ার সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ।

সম্প্রতি নরওয়ের সরকারি সংস্থা নরওয়েজিয়ান পেট্রোলিয়াম ডিরেক্টরেট (এনপিডি) ও বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান হাইড্রোকার্বন ইউনিট দেশের তেল-গ্যাসের মজুতের ওপর একটি সমীক্ষা করে। সমীক্ষায় বলা হয়, দেশে অনাবিষ্কৃত গ্যাসের মজুত আছে ৪২ টিসিএফ, এই পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। ৯০ শতাংশ বা প্রমাণিত মজুত আছে ১৮ দশমিক ৫ টিসিএফ।

ডেনমার্কভিত্তিক তেল-গ্যাস পরামর্শক প্রতিষ্ঠান র‍্যাম্বল এক সমীক্ষায় বলেছে, বাংলাদেশে ৩৪ টিসিএফ গ্যাসের মজুত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরেকটি তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান গুস্তাভসন অ্যাসোসিয়েটসকে দিয়ে ২০১৭ সালে সরকার একটি সমীক্ষা করে। সেই সমীক্ষা প্রতিবেদনে ৯২ শতাংশ সম্ভাবনা আছে, এমন মজুতের পরিমাণ ৩৪ টিসিএফ।

ইউএসজিএসের জরিপে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে বলা হচ্ছে বরিশাল জোনকে। এখানে ১৯ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ আর ৬ দশমিক ১ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, ইতিমধ্যে বরিশাল জোনের ভোলার শাহবাজপুর উত্তর ও দক্ষিণে দুটো গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গেছে, যার প্রমাণিত মজুত প্রায় ১ টিসিএফ। সেখানে মাত্র চারটি কূপ খনন করা হয়েছে। আরও বেশি কূপ খনন হলে গ্যাসের মজুতের পরিমাণও বাড়বে। দ্বীপ জেলা ভোলায় গ্যাসের বড় ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় সেখানে বড় আকারে কূপ খনন করা যাচ্ছে না। ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনা গেলে সেখানে আরও কূপ খনন করা যেত।

পুরোনো ক্ষেত্রগুলোতেও বড় সম্ভাবনা
সিলেটের বিবিয়ানাতে ৬ টিসিএফের গ্যাসের মজুত আছে। এর মধ্যে পৌনে এক টিসিএফ ছাড়া বাকি গ্যাস উত্তোলন করেছে শেভরন। শেভরনকে নতুন একটা এলাকা দেয়া হয়েছে গ্যাস উত্তোলনের জন্য। সেখানেও গ্যাসের মজুত মিলবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে সবচেয়ে বড় মুজত মনে করা হয় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে। সেখানে ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করা হয়।

ফরাসি প্রতিষ্ঠান স্লামবার্জার বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর বিষয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। তাতে বলা হয়, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর পুরোনো কূপগুলোয় কিছু সংস্কারকাজ করে সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন বাড়ানো যায়।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, নরওয়েভিত্তিক বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি সাবেক স্টেট অয়েল বর্তমানে ইকুইনরের সঙ্গে বাংলাদেশ মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি দেশের তেল-গ্যাসের মজুতের ওপর একটি গবেষণা করে। এ প্রকল্পের অর্থ প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা তহবিল থেকে দেয়া হয়েছিল। ওই যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, উত্তোলন বন্ধ করে রাখা ৩০টি কূপে এখনো উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত আছে। এই ৩০টি কূপ থেকে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। প্রসঙ্গত, দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনালের দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের ক্ষমতা রয়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্টরা বিশ্বসেরা এসব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা গুরুত্ব দিচ্ছে না। অথচ সরকারের বিদ্যুতের যে মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে সেখানে নিজস্ব গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। এতে দেশের গ্যাসের মজুতের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘ইউএসজিএস-পেট্রোবাংলার সমীক্ষা (২০০১) একটি যথার্থ পদ্ধতিগত ও নিবিড় সমীক্ষা। এটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে একটি উত্তম কাজ। এর ভিত্তিতে দেশের অনাবিষ্কৃত গ্যাসসম্পদ আহরণ শুরু করা যায়।’

গ্যাস মজুতের বাস্তবতা
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে সুরমা বেসিন বা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে গ্যাস আবিষ্কার হয়। সিলেটের ওপারে ভারতের ত্রিপুরায়ও গ্যাস আবিষ্কার হয় ওই সময়। এই অঞ্চলটির উঁচু-নিচু টিলার ফাঁকে গ্যাস পাওয়া গেছে। এ ধরনের ভূ-কাঠামোকে ভূ-তত্ত্ববিদরা ঊর্ধ্বভাঁজ (এন্টিক্লাইন) বলে থাকেন। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত গ্যাসের ৯৮ শতাংশই সুরমা বেসিনের এই ঊর্ধ্বভাঁজ ভূ-কাঠামোতে। এ ধরনের কাঠামোর বিবিয়ানাতে প্রায় ৬ টিসিএফ ও তিতাসক্ষেত্রে সাড়ে ৬ টিসিএফ পাওয়া গেছে। এগুলোকে জায়ান্ট গ্যাসক্ষেত্র বলা হচ্ছে। ৩ টিসিএফের ওপরে কোনো ক্ষেত্র হলে সেটিকে জায়ান্ট বলা হয়। এই কাঠামোর ৭৫ শতাংশ আবিষ্কৃত গ্যাস উত্তোলনও করা হয়ে গেছে।

সুরমা বেসিন বা পুরোনো গ্যাস অঞ্চলগুলোতে গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার কারণেই সরকার ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে আর গ্যাস নেই। এখানেই আপত্তি দেশের ভূ-তত্ত্ববিদদের। তারা বলছেন, ব-দ্বীপ অঞ্চলের সমতলের স্তরজনিত ভূ-স্তর (স্টেটিগ্রাফিক স্ট্রাকচার) এলাকায় এখনো বড় আকারে অনুসন্ধান চালানো হয়নি। এ ধরনের ভূ-কাঠামো বরিশাল অঞ্চল থেকে খুলনা হয়ে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত। এই কাঠামোর অন্তর্গত ভোলায় গ্যাস পাওয়া গেছে। পাবনার মোবারকপুরেও গ্যাস পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো, স্তরজনিত এই ভূ-কাঠামোতে আরও প্রচুর গ্যাস পাওয়া যাবে। ইতিমধ্যে এই অঞ্চলে ত্রিমাত্রিক জরিপও শেষ করেছে বাপেক্স। জরিপের ফল বলছে, ঠিকঠাক মতো লোকেশনে কূপ খনন করতে পারলে এই অঞ্চলগুলোতে বড় বড় গ্যাসের ক্ষেত্র মিলবে, যেগুলো ভূ-তত্ত্বের ভাষায় জায়ান্ট ক্ষেত্র হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

পেট্রোবাংলার প্রকৌশলীরা বলছেন, তিন পার্বত্য জেলায় বড় ধরনের গ্যাসের মজুত মিলবে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির কাচালং এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ইউনাইটেড মেরিডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কূপ খননের জন্য সবকিছু চূড়ান্ত করে। এমনকি কূপ খননের পয়েন্ট বা কোডিনেশনও ঠিক করে। প্রতিষ্ঠানটির এশীয় অঞ্চলে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার কারণে তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়। কাচালংয়ে নিশ্চিত গ্যাস পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার প্রকৌশলীরা। সেখানে যেহেতু কূপ খননের পয়েন্ট ঠিক করা আছে সেই পয়েন্টে শিগগিরই খনন শুরুর কথাও তারা বলেছেন।

সুনেত্র ও মোবারকপুরে খননের উদ্যোগ নেই
২০০৯-১০ সালে ২৫৯ কিলোমিটার এলাকা জরিপ করে জানায়, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা এলাকায় গ্যাস পাওয়া যাবে। সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রটির নাম দেয়া হয় সুনেত্র। এরপর ২০১৩ সালে মাত্র একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করে বাপেক্স, এতে গ্যাস মেলেনি। সেখানে আর কূপ খনন করা হয়নি।

পেট্রোবাংলার এক প্রকৌশলী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, সুনেত্রে নিশ্চিত গ্যাস পাওয়া যাবে। একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করে গ্যাস পায়নি, এই অজুহাতে আর সেখানে কূপ খনন করা হয়নি। অথচ এটা জায়ান্ট গ্যাসক্ষেত্র হওয়ার সব প্রমাণ জরিপে আছে। সুনেত্র ক্ষেত্রটি স্থলভাগের ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকে পড়েছে। এটি ছাতক গ্যাসক্ষেত্র থেকে ৫৯ কিলোমিটার ও বিবিয়ানা ক্ষেত্রটি থেকে ৬৯ কিলোমিটার দূরে। এটি পুরোনো গ্যাস অঞ্চল। এখানে গ্যাস মিলবে।

তিনি বলেন, গ্যাস থাকলেও উত্তোলন করা যায় না। গ্যাস উত্তোলন করতে হলে গ্যাসের ক্ষেত্রে উৎস শিলা, গ্যাসধারণকারী মজুত শিলা, ফাঁদ, আচ্ছাদন শিলা (ট্রাপ) ইত্যাদি থাকতে হয়; এর সবই সুনেত্রে আছে। এর অর্থ ক্ষেত্রটির ভূ-তাত্ত্বিক সফলতা অনেক বেশি। একই স্তরে থাকা বিবিয়ানা ক্ষেত্রের উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ধরা হয়েছিল পৌনে দুই টিসিএফ। সেখানে একাধিক কূপ খনন করায় মজুত বেড়ে সাড়ে ছয় টিসিএফ ছাড়িয়েছে। যত কূপ খনন করা হবে তত মজুত বাড়বে। এসব বিবেচনায় সুনেত্রে ৪ টিসিএফের বেশি গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।

প্রসঙ্গত, ইউএসজিএস জরিপ অনুযায়ী পুরোনো গ্যাস অঞ্চল সুরমা বেসিনে অনাবিষ্কৃত গ্যাসের পরিমাণ ১ দশমিক ৮ থেকে ৮ দশমিক ১৪ টিসিএফ হতে পারে।

পাবনার মোবারকপুরে ১৯৮০-৮১ সালে পেট্রোবাংলা প্রথম দ্বিমাত্রিক জরিপ চালিয়ে গ্যাসের অস্তিত্ব পায়। এরপর ১৯৮৩-৮৪ সালে জার্মানির প্রাকলা সাইসমো নামের একটি প্রতিষ্ঠান জরিপ করে সেখানে গ্যাস থাকার কথা জানায়। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালে বাপেক্স সেখানে ফের জরিপ করে, তারাও গ্যাস থাকার কথা জানায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৭ সালে সেখানে অনুসন্ধান কূপ খনন করে গ্যাস পেলেও বাণিজ্যিকভাবে ওই গ্যাস উত্তোলনযোগ্য নয়- এমন দাবি করে গোটা এলাকা পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বাপেক্স।

এ বিষয়ে বদরুল ইমাম বলেন, পাবনার মোবারকপুর স্টেটিগ্রাফিক স্ট্রাকচারে। এই ভূকাঠামোতে ভোলায় গ্যাস পাওয়া গেছে, আবার ভারতের পশ্চিম বাংলায়ও গ্যাস পাওয়া গেছে, সেটি মোবারকপুর থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে। মোবারকপুরে একটি অনুসন্ধান কূপ কোনোভাবেই যথেষ্ট না। সেখানে আরও অনুসন্ধান কূপ খনন করলে নিশ্চিতভাবেই গ্যাস মিলবে। আর সুনেত্র জায়ান্ট গ্যাসক্ষেত্র হতে পারে। অথচ একটা কূপ খনন করে গ্যাস পাওয়া গেল না বলে আর কূপ খনন করা হলো না। এসব যারা করছেন তারা দেশের ক্ষতি করছেন।

প্রসঙ্গত, ভারতের ওএনজিসি মোবারকপুর ভূ-কাঠামোর ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে একই ধরনের ভূ-কাঠামোয় তেল পেয়েছে। ওই কাঠামোর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ইছাপুর নামক স্থানে খনন করা কূপটির কাছাকাছি ওএনজিসি ইতিমধ্যে দ্বিতীয় একটি কূপও খনন করেছে। আর ইউএসজিএসের জরিপমতে, খুলনা থেকে পাবনা পর্যন্ত এই অঞ্চলটিতে ২ দশমিক ৯ টিসিএফ থেকে ৬ দশমিক ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাগরে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা কতটুকু
দেশের সাগরবক্ষে প্রথম গ্যাস পাওয়া যায় ১৯৭৭ সালে কুতুবদিয়ায়। তবে ক্ষেত্রটির মজুত ছোট হওয়ায় সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হয়নি। ১৯৯৬ সালে কেয়ার্ন এনার্জি সাঙ্গুতে গ্যাস আবিষ্কার করে, সাগরবক্ষ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। এরপর সোনাদিয়া, সাঙ্গু দক্ষিণ, মাগনামায় অনুসন্ধান কূপ খনন করে গ্যাস মেলেনি। তবে এসব অগভীর সমুদ্র, গভীর সমুদ্রে এখন পর্যন্ত কোনো কূপ খনন করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কনোকো ফিলিপসকে গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকটি ইজারা দেয় সরকার। তারা সেখানে ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার কথা জানায়। চুক্তি অনুযায়ী, তাদের কাছ থেকে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ৪ ডলার ২ সেন্টে কেনার কথা ছিল সরকারের। কনোকোর দাবি ছিল সাত ডলার। সরকার দাবি না মেনে নেয়ায় কনোকো চলে যায়। বর্তমানে সরকার দীর্ঘমেয়াদে ১২ ডলারের বেশি দাম দিয়ে প্রতি হাজার ঘনফুট এলএনজি আমদানি করছে। আর স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনলে এই দাম পড়বে ৩৭ ডলার।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান পসকো দাইয়ু করপোরেশন গভীর সমুদ্রের ১২ নম্বর ব্লকটি ইজারা পায়। এই ব্লকের একদম সীমান্তঘেঁষে মিয়ানমারের সমুদ্র ব্লকটি যা থালিন (এডি-৭) নামে পরিচিত, সেখানে ৭ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কার করেছে পসকো দাইয়ু, সেখান থেকে তারা গ্যাসও তুলছে। একই ধরনের ভূ-কাঠামো হওয়ায় ১২ নম্বর ব্লকটিকে অতিসম্ভাবনাময় বলা হয়ে থাকে। পেট্রোবাংলার প্রকৌশলীরা মনে করেন, যেহেতু থালিন থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে পসকো দাইয়ু সে কারণে বাংলাদেশের উচিত হয়নি এর পাশের ব্লকটি পসকোকে দেয়া।

সাগরবক্ষে ২৩টি ব্লক বাংলাদেশের। এর সামান্যই তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দেয়া হয়েছে। আর যাদের দেয়া হয়েছে তারা গ্যাসের দাম যথাযথ পায়নি এমন অজুহাতে দেশ ছেড়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগের জোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার তথ্য-উপাত্ত বলছে, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাগরভাগের উপকূলে স্তরজনিত ভূ-কাঠামোতে প্রচুর গ্যাস পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ত্রিমাত্রিক জরিপেও গ্যাস থাকার প্রমাণ মিলেছে। এখন দরকার ব্যাপক আকারে অনুসন্ধান কূপ খনন করা।

৫০ বছরে ১০৪ কূপ!
দেশের ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যে গত ৫০ বছরে ১০৪টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। এতে মিলেছে ২৮টি গ্যাস ক্ষেত্র। এর সিংহভাগই বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে। সিলেটের বাইরে ভোলা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে কূপ খনন করা হয়েছে, সেখানেও গ্যাস পাওয়া গেছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতের ত্রিপুরার আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। সেখানে ১৫০টিরও বেশি কূপ খনন করা হয়েছে। সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ৯টি গ্যাসক্ষেত্র। ত্রিপুরায় প্রায় ১৭টি অনুসন্ধান কূপের বিপরীতে একটা ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। আর বাংলাদেশে সোয়া চারটি অনুসন্ধান কূপের বিপরীতে একটি গ্যাসক্ষেত্র মিলেছে।

পেট্রোবাংলার প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, গত ২০ বছরে ২৬টি কূপ খনন করা হয়েছে। কোনো দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে এটি সারা দুনিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ডিন ও ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠান কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বাংলাদেশে যারা বলছেন গ্যাস নেই তারা সত্য বলছেন না। বিএনপির আমলে বলা হয়েছিল গ্যাসের ওপর ভাসছে দেশ, মাটির নিচে রেখে কী হবে। গ্যাস ভারতে রপ্তানি করতে হবে। তখন আন্দোলন করে সেটিও বন্ধ করা হয়েছিল। এখন যারা বলছে গ্যাস নেই তারাও ভুল বলছে, মূলত এলএনজির আমদানির জন্য এসব কথা বলা হচ্ছে। দেশে যথেষ্ট পরিমাণ কূপ খনন না করেই গ্যাসসংকটের ভুয়া বার্তা ছড়ানো হচ্ছে।