পাহাড়ি এলাকায় কফি চাষে অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা

বাংলাদেশে কফি চাষ! কিছুটা অবাক হওয়ার মতোই ব্যাপারই অথচ ক্রমশ সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে এই ফসল। মৌলভীবাজারের পাহাড় ও টিলার অনাবাদি-আবাদি জমিতে চায়ের মতোই গড়ে উঠছে কফি এলাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজু বাদাম ও কফি গবেষণা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আকবরপুর আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা জাতের কফির চাষাবাদ শুরু হয়েছে। জেলার মাটি ও জলবায়ু কফি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। প্রথমে শখ করে দু’একজন কফি চারা রোপণ করলেও এখন অন্যান্য ফসলের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এভাবে কফি চাষ বাড়লে আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

মৌলভীবাজার আকবরপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণার সূত্রে জানা গেছে- কফি আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প মাঠে বাস্তবায়িত হচ্ছে। জেলার ২টি উপজেলায় কৃষকের মাঠে ৪টি প্রদর্শনী প্রতিটি এক একর করে বাস্তবায়িত হচ্ছে। চারা রোপণের ২-৩ বছরের মধ্যেই কফি গাছে ফল আসা শুরু হয়েছে। এটি অন্যান্য ফসলের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে ব্যাপক সমাদর লাভ করেছে। কফি গাছ ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত অনায়াসে বেঁচে থাকে। এ ফলে কৃষক কফি চাষে দিনদিন আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

কফি চাষিরা জানিয়েছেন- বাণিজ্যিকভাবে তারা অন্যান্য ফসলের মাঝে সাথি ফসল হিসেবে কফি চাষ করেছেন এতে মূল ফসলের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং সহজে কফি চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব। তবে কফি গ্রাইন্ডিং করার মেশিনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তারা।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বোরতলা গ্রামে মো. হুমাউন কবির বলেন, কফির ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে কৃষি গবেষণা থেকে চারা এনে ৪ বিঘা জমিতে কফি চাষ শুরু করেছি। অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা জাতের গাছে ফলন আসা শুরু হয়েছে।

রাজনগর উপজেলার মাথিউরা চা-বাগানের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১৭ সালে পরীক্ষামূলকভাবে বাগানে কফি চাষ করা হয়। চা বাগানের সেকশনের পতিত জায়গায় পরিপক্ক কফি গাছে এখন ফলের সমারোহ। কফি গাছ একবার লাগালে দ্বিতীয়বার আর কোনো কাজ থাকে না। এতে সবদিক দিয়ে লাভবান হওয়া যায় সহজে। বিশ্বের বাজারে কফির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দামও অনেক। তবে কফির প্রক্রিয়াজাত করণ ও বিপনন ব্যবস্থা নেই বলে জানান তিনি।

মৌলভীবাজার আকবরপুর আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সামসুজ্জামান বলেন- জেলার মাটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর এটাই প্রতিয়মান হয়েছে, এ জেলার পাহাড় টিলায় কফি চাষ সম্ভব। তাই চারটি কফি বাগানে অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা জাতের প্রায় ৪ হাজার কফি গাছ লাগানো হয়েছে। দুই বছরেই কফি গাছে ব্যাপক ফল এসেছে। কৃষক এ ফল দেখে বেশি পরিমাণে জায়গায় কফি চাষে আগ্রহী হচ্ছে। কৃষকের চাহিদা মতো চারা, সার ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি।

গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. জামাল হোসেন বলেন, জেলার টিলা ও পাহাড়ের মাটি সাধারণ এসিডিক। এখানে পিএইচ সাধারণ ৫ এর নিচে থাকায় এ মাটিতে কফি উৎপাদনের জন্য অত্যান্ত উপযোগী। তিনি আরো বলেন, কফি চাষ খুবই সহজ। কফি চাষে খরচ খুবই কম, পতিত, অনুর্বর ও টিলার জমিতে এটির চাষ ব্যাপকভাবে করা সম্ভব। চারা রোপণের ২-৩ বছরের মধ্যেই কফি গাছে ফল আসা শুরু হয়। এটি অন্যান্য ফসলের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে ব্যাপক সমাদর লাভ করেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হায়দার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর কফি আমদানি হ্রাস করার লক্ষে বৈজ্ঞানিকরা একটি প্রকল্পের মাধ্যমে কফি উৎপাদনের কাজ করে যাচ্ছেন। মৌলভীবাজারের আবহাওয়া কফি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। সুতরাং কফি চাষের উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বিশ্বব্যাপী কফি খুবই জনপ্রিয় এক প্রকার পানীয়। কফিতে রয়েছে ২-৩ শতাংশ ক্যাফেইন, ৩-৫ শতাংশ ট্যানিন, ১৩ শতাংশ প্রোটিন এবং ১০-১৫ শতাংশ ফিক্সড ওয়েল। এছাড়াও এর বীজে রিবোফ্লাভিন (ভিটামিন বি২), নিয়াসিন (ভিটামিন বি৩), ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, এবং বিভিন্ন ধরনের ফেনোলিক যৌগসহ এন্টিঅক্সিডেন্টস রয়েছে। এক কাপ কফি দেহের প্রতি দিনের চাহিদার ১১ শতাংশ রিবোফ্লাভিনের ঘাটতি পুরণ করে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সামসুদ্দিন আহমদ বলেন, এ অঞ্চলে কফি সম্প্রসারণে কৃষিমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনা রয়েছে। এ লক্ষে কৃষি বিভাগও কাজ করছে। এরই মধ্যে কৃষি বিভাগ অ্যারাবিক জাতের বেশকিছু কফি গাছের চারা বিতরণের কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশে রয়েছে কফির ব্যাপক চাহিদা। চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ কফি আমদানি করতে হয়। অথচ অনুকূল আবহাওয়ায় দেশের মাটিতে রয়েছে কফি চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা।