অর্থনীতির সব সূচকে গতি ফিরতে শুরু করেছে

রপ্তানিতে নেতৃত্ব দিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং চামড়াবিহীন জুতার রপ্তানি বেড়েছে। তবে হোম টেক্সটাইল, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, রাসায়নিক পণ্য, প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি কমেছে। মোট পণ্য রপ্তানির সাড়ে ৮৩ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে। সেই সঙ্গে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনার প্রভাব এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। আমদানি আয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের সব দেশই তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে সব থেকে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমদানি ব্যয় মেটানো, মেগা প্রকল্পের সুদের কিস্তি পরিশোধের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির জন্য বাংলাদেশের রিজার্ভ ও আগের চেয়ে কমেছে। কিন্তু গত নভেম্বর মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বাড়া, নতুন দেশ থেকে তৈরি পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ আসা ও শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতায় অর্থনীতিতে গতি ফিরছে। সেই সঙ্গে বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতার আলোচনা ও বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হলো রেমিট্যান্স। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এই রেমিট্যান্স ছিল নিম্নমুখী। যেখানে গত জুলাই ও আগস্ট মাসে গড়ে দুইশ কোটি ডলার করে রেমিট্যান্স আসত হঠাৎ করে তা কমে দেড়শ কোটি ডলারে নেমে যায়।

তবে গত নভেম্বর মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রেমিট্যান্স কিছুটা বেড়েছে। মাসটিতে বিগত মাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয় হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরোর তথ্যানুসারে গত নভেম্বর মাসে সব ধরনের পণ্য রপ্তানি বাড়ে ২৬ শতাংশ। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার যে চাপ পড়ছিল এভাবে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাড়তে থাকলে তা কমে আসবে। ইতোমধ্যেই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পুনরায় দ্বিতীয় অবস্থান ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশ। যুদ্ধের মধ্যেও ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বেড়েছে। এ ছাড়া নতুন করে একটি দেশ থেকে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ এসেছে। রেমিট্যান্স আয় বাড়া এবং ডলারের দাম নিয়ে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতায় স্থবির শেয়ারবাজারেও প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে। সেখানে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও লেনদেন বাড়ছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিদেশি ঋণের সুদের কিস্তিত্ম পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন কমে যাচ্ছে ঠিক সেই সময়ে সরকার ব্যাংকের মাধ্যমে বৈধভাবে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য প্রচার-প্রচারণা এবং প্রবাসীদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকরির সুবিধা প্রদানসহ নানা প্রণোদনা প্রদানের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং মাধ্যমের বাইরে মোবাইল বা অন্য কোনো মাধ্যমে ডলার পাঠানোকে নিরুৎসাহিত করছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার নিয়ে কারসাজির অভিযোগে বেশ কিছু ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর ব্যবস্থা নিয়েছে। সব মিলে রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর জন্য সরকারের এমন ইতিবাচক পদক্ষেপে নানা ফল এসেছে। যার প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স বাড়ার মাধ্যমে। গত নভেম্বরে বাংলাদেশ থেকে ৫০৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে- যা চলতি বছরের ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর গত বছরের নভেম্বরের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। গত বছরের নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছিল ৪০৪ কোটি ডলারের পণ্য। সেই হিসাবে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট আশার সঞ্চার করেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরোর (ইপিবি) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে সব ধরনের পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। গত অক্টোবর শেষে সামগ্রিকভাবে পণ্য রপ্তানিতে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল। নভেম্বর শেষে সেটি বেড়ে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ২ হাজার ১৯৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। দেশীয় মুদ্রায় যা ২ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালানাগাদ প্রতিবেদন অনুসারে, নভেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। গত বছরের নভেম্বরে যা ছিল ১৫৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। সেই হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় গত মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গত অক্টোবর মাসে ১৫২ কোটি ৫৪ লাখ ডলার দেশে আসে। এর আগে জুলাই ও আগস্টে গড়ে ২০০ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় বৈধ পথে দেশে পাঠিয়ে ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। রপ্তানিতে নেতৃত্ব দিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং চামড়াবিহীন জুতার রপ্তানি বেড়েছে। তবে হোম টেক্সটাইল, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, রাসায়নিক পণ্য, প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি কমেছে। মোট পণ্য রপ্তানির সাড়ে ৮৩ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে। সেই সঙ্গে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশ।

ডবিস্নউটিওর পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, গত বছর বাংলাদেশ থেকে আরএমজি রপ্তানি দৃঢভাবে বেড়েছে এবং বার্ষিক ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি রেকর্ড করেছে। ২০২০ সালে এই রপ্তানি একটি বড় ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছিল এবং ভিয়েত নামের আরএমজি রপ্তানির ৭ শতাংশ বৃদ্ধির বিপরীতে বাংলাদেশে ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানি বাজারে ২০১০ সালে বাংলাদেশের অংশ ছিল ৪.২০ শতাংশ, তখন ভিয়েত নামের অংশ ছিল ২.৯০ শতাংশ। চীন ২০২০ সালে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানি বাজারে দেশটির অংশ ৩১.৬০ শতাংশ থেকে গত বছরে ৩২.৮০ শতাংশে উন্নীত করে প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে। ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্যে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক সরবরাহকারী সব শীর্ষ দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বাংলাদেশের।

উলিস্নখিত সময়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ থেকে ১৫.৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে, যেখানে বিশ্ব থেকে তাদের মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ৬৭.১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানিতে ২২.৮ শতাংশ নিয়ে বাংলাদেশ ইউরোপের পোশাক আমদানির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেন বেড়েছে। মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতির কারণে শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেন টানা কম ছিল। তবে সবকিছু কাটিয়ে গত সপ্তাহের তিন কার্যদিবসেই সূচকের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। নভেম্বর মাসে রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। সবমিলে অর্থনীতির সব সূচকেই আস্তে আস্তে গতি ফিরতে শুরু করেছে।

লেখক: অধ্যাপক মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া,
ট্রেজারার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক চেয়ারম্যান টু্যরিজম অ্যান্ড হস্‌পিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়