মেট্রোরেলকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা

চলতি ডিসেম্বর মাসেই স্বপ্নের মেট্রোলে যাত্রী নিয়ে চলবে, এরইমধ্যে এমন ঘোষণা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ঘোষণা অনুযায়ী, মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১.৭৩ কিলোমিটার রেলপথ যাত্রী চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। আর এই মেট্রোরেল চালু করাকে কেন্দ্র করে প্রতিটি স্টেশন এলাকায় গড়ে উঠেছে নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আবার পুরনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও জমজমাট হয়ে উঠেছে। গড়ে উঠতে দেখা গেছে নামিদামী পোশাক ও খাবারের ব্র্যান্ডের শোরুম। স্কুল, কলেজের শাখার পাশাপাশি খোলা হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, বিনোদনকেন্দ্র।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সূত্র মতে, রাজধানীর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত রেলপথে মেট্রোলাইন, স্টেশন থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রগতি প্রায় ৯৯ শতাংশ। এই পথে মোট নয়টি স্টেশনের কাজই প্রায় শেষ। এখন চলছে স্টেশনের ভেতরের কাজ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব স্টেশনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনেক নতুন নতুন ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনের পাশের কয়েকটি পুরনো কারখানা ভবন বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তর করা হচ্ছে। এই ভবনে দেশের শীর্ষস্থানীয় পোশাক ও খাবারের শপ খোলা হচ্ছে। উত্তরা স্টেশন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট বড় অনেক দোকান। যদিও এখন সেখানে লোকসমাগম কম।

সেখানকার দোকানদার ইসমাইল হোসেন জানান, এখানে মেট্রোরেলের স্টেশন নির্মাণ কাজ শুরু থেকেই তিনি ব্যবসা করছেন। শুরুতে চায়ের দোকান থাকলেও এখন প্রয়োজনীয়তা বাড়ায় অন্যান্য খাবার বিক্রি শুরু করেছেন। এখানকার কর্মরত শ্রমিকেরা নিয়মিত তার দোকান থেকে খাবার নিয়ে থাকেন।

আরেক ব্যবসায়ী শওকত আলী জানান, শুরুতে এখানে কোনো মানুষই দেখা যেতো না। এদিকটাতে শুধু কাশফুল দেখতে মানুষ আসতো, সেজন্য বেচাকেনাও মৌসুম কেন্দ্রিক হতো। কিন্তু যখন থেকে মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয় তখন থেকে ব্যবসা জমতে শুরু করে। তিনি বলেন, ‘এখন এ এলাকায় ব্যবসায় পজিশনের দামও বেড়ে গেছে অনেক।’

এদিকে মেট্রোরেল লাইন নির্মাণকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লোকসান গুনতে হয়েছে অনেককে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়েও নিয়েছেন। আবার কেউ চলে গেছেন অন্য পেশায়। এমন ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর ব্যস্ততম বেগম রোকেয়া স্মরণি সড়কে। সেখানকার একটা বড় অংশ দখল করে মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ কাজের কারণে বছরের পর বছর এই এলাকার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ব্যবসায়ীরা পার করেছেন কঠিন সময়। নির্মাণ কাজের কারণে এখানকার সড়কে দিনরাত যানজট লেগে থাকতো। আর এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ক্রেতাশুন্য ছিলো এখানকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। মেট্রোরেল লাইন, স্টেশন নির্মাণ এমনকি ফুটপাথ নির্মাণের কাজও শেষ। এখন বন্ধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে। আবার গুটিয়ে নেওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মালিকরা নতুন করে ওই এলাকায় ব্যবসার উপায় খুঁজছেন।

শ্যাওড়াপাড়া এলাকার ফার্নিচার ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনছেন ব্যবসায়। পৈত্রিক ব্যবসা হওয়ায় এখান থেকে অন্যত্র সরে যাওয়াও সম্ভব হয়নি। এখন মেট্রোর কাজ শেষ এখন অনেকটা স্বস্তি লাগছে। কাস্টমার আসতে শুরু করেছে।’

উত্তরা থেকে রাজধানীর আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের মোট স্টেশনের সংখ্যা ৯টি। এসব স্টেশন থেকে বিভিন্ন স্থানে যাওয়া-আসা করবেন যাত্রীরা। ফলে এখানে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা। যে কারণে মেট্রোরেল চালুর আগেই স্টেশনগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে শুরু করেছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আবার মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজ শুরুর পর অনেক আবাসন প্রতিস্ঠানও এসকল এলাকায় প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

জানা গেছে, এরই মধ্যে শ্যাওড়াপাড়া এলাকায় ৫৯ কাঠা জমির ওপরে তরু কাব্য নামে কনডোমিনিয়াম নামে একটি আবাসন প্রকল্প এরইমধ্যে গড়ে উঠেছে। আবার মিরপুর স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকায় ইস্টার্ন হাউজিং আবাসিক হাউজিং গড়ে তুলেছেন।

অন্যদিকে উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় একশোর বেশি আবাসিক ভবন নির্মাণের কাজ চলসান। এসব ভবনের অধিকাংশই বেসরকারি আবাসন কোম্পানি নির্মাণ করছে। মেট্রোরেল নির্মাণের অনেক আগে ১৯৯৯ সালে উত্তরার দিয়াবাড়ী এলাকায় ‘উত্তরা আবাসিক শহর’ তৃতীয় পর্যায় প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। মোট ২ হাজার ৮ একর জায়গায় মোট ৮ হাজার ২৯৫টি প্লট তৈরি করা হয়। কিন্তু নির্জন পরিবেশের কারণে সেখানকার ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছিলো না।

জানা গেছে, মেট্রোরেলের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে সেসব ফ্ল্যাটের বিক্রি পুরোদমে শুরু হয়েছে। আবার এ এলাকায় বেসরকারি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস খোলার উদ্যোগ নিয়েছে। উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ১৩৪ বিঘা জমির ওপর আধুনিক শহর গড়ে তুলেছে রূপায়ন গ্রুপ। সে প্রকল্পে স্কুল, খেলার মাঠ, মসজিদ, জিম, সুপারশপ, মেডিকেল কলেজ, শপিং মল, হাসপাতাল থেকে শুরু করে চার তারকা হোটেল অর্থাৎ নাগরিক জীবনের সকল সুবিধা সম্বলিত একটি পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা হচ্ছে। আর এসবই মেট্রোরেলকে উদ্দেশ্য করে।

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ডিএমটিসিএলেরও পরিকল্পনা রয়েছে, মেট্রোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার খরচ মেটাতে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি স্টেশনগুলো বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া। সে লক্ষ্যে এমআরটি লাইন-৬ এর চারটি স্টেশনের চত্বরে পর্যাপ্ত জায়গাও রাখা হয়েছে।

ডিএমটিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক জানিয়েছেন, মেট্রোরেলকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়বে। আর মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার ব্যয় যাত্রী সেবার পাশাপাশি বাণিজ্যিক কার্যক্রমেরও পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

রাজধানীর যানজট কমানোর পাশাপাশি যাতায়াত সহজ করতে ২০১২ সালে মেট্রোরেল নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন হয়। ২০১২ সাল থেকে ২০২৫ মেয়াদে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০.১০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। পরে সংশোধন করে মতিঝিলের পরিবর্তে কমলাপুর পর্যন্ত ১.১৬ কিলোমিটার বাড়িয়ে ২১.২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ করার পরিকল্পনা করা হয়। এই পথে মোট ১৭টি স্টেশনের মধ্যে মতিঝিল পর্যন্ত নির্মাণ হবে ১৬টি স্টেশন, যা এখনও চলমান।