কৃষি-পর্যটনে চাঙ্গা হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতি

মেঘের রাজ্য খ্যাত ‘সাজেক’ সম্পর্কে কম-বেশি প্রায় সবারই জানা। তবে এর বাইরেও পার্বত্য জেলা বান্দরবানের নীলগিরি, রাঙামাটির কাপ্তাই লেক কিংবা খাগড়াছড়ির আলুটিলাসহ রয়েছে এমন আরও অসংখ্য পর্যটন স্থান। আবিষ্কার হচ্ছে একের পর এক নতুন নতুন দর্শনীয় স্থান। যা হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্রকৃতিপ্রেমীদের। এর প্রভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব খাতেও বড় অঙ্কের আয় বাড়ছে বলেও জানা যায়।

শুধু পর্যটন বা ট্যুরিজমের ক্ষেত্রেই নয়, পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ করে খাগড়াছড়িতে এখন কৃষি অর্থনীতিতেও ব্যাপক উন্নতি ও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। যারা এক সময় জুম চাষ করে কোনোমতে জীবনযাপন করে যাচ্ছিলেন তারা এখন উচ্চফলনশীল ফলমূলসহ নানা কৃষিপণ্য চাষাবাদ করছেন।

খাগড়াছড়িতে প্রতিবছর খাস অনাবাদী জমি আসছে কৃষি চাষের আওতায়। সব মিলিয়ে পার্বত্য খাগড়াছড়িতে এখন কৃষি-পর্যটনে খুলেছে সম্ভাবনার দুয়ার। সরেজমিন খাগড়াছড়িসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

যদিও পর্যটন খাতের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অনেকের মধ্যে নিজ বসতভূমি বা বাস্তুহারা হওয়ার শঙ্কাও কাজ করছে বলে জানাচ্ছেন তারা। পাহাড়ি উপজাতি বাসিন্দারা পর্যটনের উন্নয়ন চাইলেও নিজেদের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতি যেন কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয় সেদিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বলছে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং পরিবেশ ঠিক রেখেই যেখানে পর্যটন কেন্দ্র চালু সম্ভব, কেবল সেখানেই তা করা হবে।

খাগড়াছড়ি মূল শহর থেকে পশ্চিমে মাত্র আট কিলোমিটার দূরেই ‘আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র’। গত ২৮ নভেম্বর বিকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঘুরতে আসা শত শত পর্যটক। পাহাড়ের চূড়ায় বসার জায়গা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য একাধিক ভেন্যু তৈরি করা হয়েছে সেখানে। পরিবারের সঙ্গে অনেক শিশু সেখানে ঘুরে ঘুরে চারদিকের দৃশ্য দেখছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার ফুট উচ্চতার এ আলুটিলা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিচে যেদিকেই চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। পাহাড়ের উপড়ে থেকে সামনের সুদূর এলাকা পর্যন্ত সমউচ্চতার আর কোনো পাহাড় নেই। ফলে নিচের ছোট ছোট পাহাড় এবং খাগড়াছড়ি শহর দেখলেও চোখ জুড়িয়ে যায়। এ ছাড়া আলুটিলা পাহাড়ের অদূরে আরেকটি অংশ আরও বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট স্থান হলো-‘তারেং’। সেখানে গিয়ে চারদিকের সুদূর সবুজ পাহাড়ি অঞ্চল দেখলেই মন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। এদিকে এই আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রেই একপাশে রয়েছে ‘রহস্যময়’ আলুটিলা গুহা। মশাল বা মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে গুহার ভেতরে গিয়ে অনেকেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিচ্ছিলেন।

স্থানীয়দের কাছে এটি মাতাই হাকড় বা দেবতার গুহা হিসেবে পরিচিত। গুহাটি খুবই অন্ধকার ও শীতল। কোনো প্রকার সূর্যের আলো প্রবেশ করে না বলে টর্চের আলো বা মশাল নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। প্রায় ৩৫০ ফুট দৈর্ঘ্যরে সুড়ঙ্গের তলদেশ পিচ্ছিল এবং পাথুরে ও এর তলদেশে একটি ঝরনা প্রবহমান। গুহাটির একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হতে সময় লাগে আনুমানিক ১০-১৫ মিনিট। ওই গুহার সুরুঙ্গের বাইরে ওপরে ডাবসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছিলেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বয়োজ্যেষ্ঠ এক দম্পতি।

আলাপকালে তারা বলেন, আগে তারা দুর্গম পাহাড়ে জুম চাষসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ফল উৎপাদন করতেন। আলুটিলাকে পবিত্র স্থান হিসেবে অনেক আগে উপজাতিরা দুর্গম এই পাহাড়ে আসতেন। তখন কোনো বাইরের লোকজন আসত না। বছর দেড়েক আগে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এটি চালু হলে তারা দোকান নিয়ে বসেন। প্রতিদিন ভালো কেনাবেচা হয়। আয় রোজগারে সংসারেও ফিরেছে বেশ স্বচ্ছলতা। এখানে আরও এমন অনেকেই বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করছেন। কেউ কেউ গুহায় প্রবেশের জন্য বাঁশের লাঠি, মশালসহ নানা পাহাড়ি পণ্যের পসরা সাজিয়েছিলেন। পর্যটক প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের ব্যবসার সম্ভাবনার দুয়ার আরও খুলে যাচ্ছে। যদিও এখানে হোটেল-মোটেল বা স্থায়ী আধুনিক কোনো রিসোর্ট বা রেস্টুরেন্ট এখনও গড়ে ওঠেনি। শহর থেকে কাছাকাছি এবং নতুনভাবে চালু হওয়ায় ধীরে ধীরে এসব ক্ষেত্রেও উন্নতি হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে আলুটিলার এসব উপজাতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের মতো অন্য ক্ষুদ্র এক রকম নয়।

এ প্রসঙ্গে গত ২৯ নভেম্বর খাগড়াছড়ির মহাজনপাড়ায় বসে কথা হয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেওয়া শুভ মঙ্গল চাকমা ওরফে সুদর্শন চাকমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক নৈসর্গিক পরিবেশ খাগড়াছড়িসহ সব পার্বত্য জেলায়। এখানে সাজেকসহ বড় বড় অনেক পর্যটন স্পট গড়ে উঠেছে, যেটা আমাদের জন্য অবশ্যই ভালো। কিন্তু এর মাঝেও আমাদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের মধ্যে চাপা ভীতি বা আস্থাহীনতার ব্যাপার রয়েছে। আমাদের লোকেদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কাও কাজ করে। তারা মনে করছেন, এখানে উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাইরের অনেক পর্যটক আসবে। আমরাও চাই পর্যটক আসুক কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের স্থানীয় কর্তৃত্ব, প্রকৃতি বা সংস্কৃতি বিনষ্ট হতে পারে। তাই এই বিষয়গুলোর নিশ্চয়তা আমাদের খুব দরকার। আমরাও চাই পর্যটনের বিকাশ ঘটুক।

অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, পর্যটন এলাকায় কোনো হোটেল বা রিসোর্ট হলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কেউ নামে মাত্র মালিকানায় থাকছেন আর সব কর্তৃত্ব এবং মুনাফার মালিক থাকছেন বাঙালি ব্যবসায়ীরা। পাহাড়িদের তেমন টাকা-পয়সা না থাকায় তারা নিজেরাও সেভাবে এগোতে পারছে না। আবার সরকারি খাস জমি হলে কোনো ব্যাংক ঋণও পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের কিছু জটিলতার কারণে অনেক সময় পর্যটন স্পট সৃষ্টির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাসিন্দারা বাধা দিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।’

এ প্রসঙ্গে গত ২৯ নভেম্বর নিজ কার্যালয়ে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক (ডিসি) প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘এক সাজেক খাগড়াছড়ির চিত্র ও পরিচিতি অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বেড়েছে পর্যটন কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য বা আয় রোজগার। পরবর্তীতে আলুটিলা গুহাসহ পাহাড়টির অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার পর সেখানেও দর্শনার্থীদের ব্যাপক আনাগোনা শুরু হয়েছে। দুই বছর আগেও দেখা যেত নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যটকদের আনাগোনা, এখন সারা বছরই ব্যাপকহারে আসছে।’ তিনি বলেন, ‘পর্যটন খাতের এই প্রসারে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাসিন্দাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং তাদের লোকজন যথেষ্ট ব্যবসা বাণিজ্য করছে। কেননা একটি পর্যটন স্পটের সঙ্গে নানা রকম ব্যবসা জড়িত। পাহাড়ি নৃ-গোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেই যেখানে যা উন্নয়ন করা যায় সেটাই করা হচ্ছে। তবে এখানে নানা দিক থেকে পাহাড়ি বাসিন্দাদের মধ্যে আস্থার সংকট আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।’

এলাকা ঘুরে জানা যায়, বান্দরবান ও রাঙামাটির মতো পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির বৈচিত্র্যময় জীবনধারা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবাইকে বিমোহিত করে চলেছে। স্থানীয়ভাবে খাগড়াছড়িকে চেংমি, ফালাং তাউং এবং মং সার্কেল নামেও ডাকা হয়। খাগড়াছড়ির দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে-আলুটিলা পাহাড়, আলুটিলা গুহা-ঝরনা, রিসাং ঝরনা, দেবতা পুকুর, মহালছড়ি হ্রদ, পানছড়ির অরণ্য কুটির, মানিকছড়ি মং রাজবাড়ি, বিডিআর স্মৃতিসৌধ, রামগড় লেক ও চা বাগান এবং নতুন তৈরি হওয়া জালিয়াপাড়া-সিন্দুকছড়ি-মহালছড়ি সড়কের পাঙ্খুমোরা ভিউ পয়েন্টসহ এমন অনেক স্থান এখন পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে পর্যটনে বিকাশের সঙ্গে খাগড়াছড়ির কৃষি অর্থনীতিও এগিয়ে যাচ্ছে সমানতালে। খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ থেকে জানা গেছে, এ জেলায় প্রায় ৭৫ হাজার পরিবার কৃষির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
কৃষি অর্থনীতিতে বছরের লেনদেন হচ্ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে খাগড়াছড়িতে আম, লিচু, পেঁপে, কলা, হলুদসহ মসলা জাতীয় ফসল ও ধান উৎপাদনে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। এ ছাড়াও মূল্যবান কৃষিপণ্য হিসেবে কাজুবাদাম, মাল্টা, কমলা, ড্রাগন, চা, আনারস চাষ হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে।

এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির ডিসি প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘ট্যুরিজম এবং কৃষি এই দুটো খাতই খাগড়াছড়ি জেলার অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করেছে। জেলার একেবারেই প্রত্যন্ত এলাকাতেও এখন ব্যাপকহারে কৃষি চাষাবাদ এবং বিভিন্ন ধররের ফল উৎপাদন হচ্ছে। এতে করে কর্মসংস্থান যেমন বেড়েছে, তেমনি অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হচ্ছে।’

গত ২৮ নভেম্বর খাগড়াছড়ি শহরের মহাজনপাড়া মোড়ে বসে ডালায় করে মাল্টা বিক্রি করছিলেন পানছড়ির কুকিছড়ার বাসিন্দা জোলেখা চাকমা। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা জুম চাষ এবং বসতবাড়ির আশপাশে শাকসবজি চাষাবাদ করে জীবন চালাতাম। সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে কুকিছড়ায় অনেকেই মাল্টার চাষ করছেন। ফলনও খুব ভালো। দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। নিজ বাগানের মাল্টা বিক্রি করতেই শহরে এসেছি।’

এসব প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য (এমপি) কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরা বলেন, ‘উন্নয়নে-শান্তিতে আমরা (পাহাড়ি বাসিন্দারা) এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। পর্যটনের পাশাপাশি এখানে কৃষি অর্থনীতিরও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। উৎপাদনশীল নানা কৃষিজাতপণ্য এখন উৎপাদন। বেশ মানসম্পন্ন কাজুবাদাম, ড্রাগন, মাল্টা এমনকি প্রচুর আমের চাষ শুরু হয়েছে এখানে। যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হওয়ায় পাহাড়ি চাষিরাও বেশ ভালো দাম পাচ্ছেন। এটা এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছে।