হৃদরোগের চিকিৎসায় অর্ধেক খরচ দেবে ‘শিওরকেয়ার’

দেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়বহুল। যার সিংহভাগ খরচ হয় হাসপাতালে ভর্তি হলে, ওষুধ কিনতে কিংবা রোগ নির্ণয়ে। হার্ট ও কিডনির অসুখ কিংবা ক্যানসারের মতো ব্যয়বহুল রোগ যেন দুর্ভাগ্য বয়ে আনে পুরো পরিবারের জন্য। যার ব্যয় মেটাতে ফি বছর দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায় কয়েক লাখ মানুষ। মানুষের ওপর এই ব্যয়ের চাপ কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে শিওরকেয়ার ফাউন্ডেশন। হৃদরোগের চিকিৎসার অর্ধেক ব্যয় বহন করবে তারা।

শুক্রবার (২ ডিসেম্বর) রাতে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কনফারেন্সে একথা জানানো হয়। ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ সিটি হেলথ এবং শিওর কেয়ার এই কনফারেন্সের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। প্ল্যাটফর্মটির তৈরি শিওরকেয়ার অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের মাধ্যমে সদস্য হয়ে এই সেবা নেওয়া যাবে। তবে শর্ত হচ্ছে, সদস্য পদের মেয়াদ কমপক্ষে ৯০ দিনের হতে হবে।

শিওরকেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. চৌধুরী হাফিজুল আহসান বলেন, ‘আমরা যারা বাংলাদেশি চিকিৎসক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছি, অনেক দিন ধরেই তাদের ইচ্ছা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার। আবার আমাদের সমসাময়িক যারা দেশে বহুদিন চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পর অবসরে গেছেন বা যাচ্ছেন, তাদের ঐকান্তিক ইচ্ছা দেশের জন্য ভালো কোনও সমন্বিত চিকিৎসা কার্যক্রমে যুক্ত থাকা। যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম মনে করে যে, একটা অর্থবহ প্রচেষ্টা আমাদের ছিল। অন্য আরও অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উত্তরণের দিকে নিয়ে যেতে আমাদের চিকিৎসকদেরও একটা ভাবনা এবং দিক-নির্দেশনা আছে; যা আমাদের জনগণের জন্য আস্থাশীল, দায়িত্বশীল, অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবার প্রতিশ্রুতি দেবে। সেই লক্ষ্যে আমরা শিওরকেয়ার নামে এমন একটি কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছি যাতে বাংলাদেশের মানুষকে দায়িত্বশীল স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হয়।’

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশি, প্রবাসী ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অ্যাপ ডাউনলোড করে (শিওর কেয়ার ফিজিশিয়ান পোর্টাল) শিওরকেয়ার কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবেন। তাদের নিজেদের পরিচিতি, কাজের বর্ণনা এবং মেডিক্যালের কোন ক্ষেত্রে কাজ করেন এসব তথ্যাদি সাধারণ মানুষের অবগতির জন্য তুলে ধরতে পারবেন।

সাধারণ মানুষ শিওর কেয়ার অ্যাপ ব্যবহার করে তাদের মেডিক্যাল রেকর্ড, ইসিজি, এক্সরে, ল্যাব রিপোর্ট নিজেরাই সংরক্ষণ করতে পারবেন। হাসপাতালে ভর্তি, ওষুধ কেনা কিংবা রোগ নির্ণয়ে খরচ হয় সবচেয়ে বেশি। ওই সময়ে চিকিৎসা কেমন হবে, রোগের ধরন এবং তার নিরাময় কী– এসব নিয়ে কোনও ধারণা না থাকায় রোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। শিওরকেয়ার আগে থেকেই মেম্বারদের এসব রোগ সম্বন্ধে ধারণা দেবে, প্রতিরোধ করার বিষয়ে সতর্ক করবে এবং অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে।

মাঠকর্মী জুনিয়র ডাক্তাররা ফ্যামিলি মেম্বারের মতো রোগী ও তার স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসার বিষয়ে কথা বলবেন। অ্যাপের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বরেণ্য বিশেষজ্ঞদের টিম ওই রিপোর্ট এবং পুরো বর্ণনা দেখবেন। এরপর তাদের মতামত এবং চিকিৎসা নির্দেশনা দেবেন। প্রয়োজনে স্থানীয় চিকিৎসকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রোগী এবং তার নিকটাত্মীয়কে আশ্বস্ত করবেন। প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র হার্টের চিকিৎসার ক্ষেত্রে শিওরকেয়ার মেম্বারদের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা থাকবে। বাংলাদেশে হার্ট অ্যাটাকের প্রসিডিউরাল কস্টের ৫০ শতাংশ শিওর কেয়ার তার সদস্যদের জন্য বহন করবে।

এর পাশাপাশি অন্য অসুখে হাসপাতালের খরচ এককালীন বহন করা কষ্টকর– এই কথা স্মরণ রেখে, সুস্থ থাকা অবস্থায় ব্যাংকের মাধ্যমে মেম্বারদের হেলথ ইকুইটি লাইন অফ ক্রেডিট নিতে উৎসাহিত করবে শিওরকেয়ার। এর সুবিধা হলো, এই টাকা থাকছে ‘যদি লাগে’ এই ভিত্তিতে। এর ফলে আগে থেকে ব্যাংক অনুমোদিত লোন এককালীন ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা যখন-তখন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয়ভারের জন্য পাওয়া যাবে। যা পরে ৩০-৩৬ মাসে পরিশোধ করতে হবে। ফলে রোগী এবং পরিবারের ওপর এককালীন টাকা জোগাড়ের চাপ কমবে। এর ফলে অসুস্থ সদস্যের পরিবারটি দারিদ্র্যসীমার আরও এক ধাপ নিচে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে। এ ছাড়া অচিরেই ল্যাব টেস্টিং এবং হাসপাতালের খরচের ক্ষেত্রে মেম্বারদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থাও করবে শিওরকেয়ার।

অনুষ্ঠানে ডা. দীপু মনি বলেন, ‘ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো, সদস্য তালিকাভুক্ত করা, সদস্যদের সেবা দেওয়া, হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে কাজ করা, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা এসব অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমাদের এখনও যেতে হবে অনেক দূর। আমরা স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে পারলে যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দেখিয়েছেন, সোনার বাংলার স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছেন, সেখানে পৌঁছানো অনেক সহজ হবে।’

শিওরকেয়ার দেশি, প্রবাসী এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে সমন্বিত টিম গঠন করেছে। যাতে শিওরকেয়ারের সদস্যদের কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে স্থানীয় চিকিৎসককে সঙ্গে নিয়ে এই টিমের মাধ্যমে একটি সক্রিয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এতে স্বাস্থ্যসেবায় হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা যাবে এবং এই দায়িত্বশীল স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে লাগামহীন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে শিওরকেয়ার বিশ্বাস করে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন– ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান, মহাসচিব অধ্যাপক সায়েফ উদ্দিন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. এম জি আজম, ওয়ার্ল্ড হার্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি ডা. জগৎ নারুলা, সিটি হেলথের পরিচালক ফারুক আজম খান প্রমুখ।