এপ্রিলে সব বন্দরে চালু হচ্ছে ‘গ্রিন চ্যানেল’

ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর আসছে। তাদের খরচ কমাতে দেশের সব বন্দরে চালু হচ্ছে ‘গ্রিন চ্যানেল’। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উদ্যোগে আগামী এপ্রিলে চালু হচ্ছে এই সুবিধা। তবে সবাই পাবেন না এ সুযোগ। যারা সুনামের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, অতীত রেকর্ড ভালো- কেবল তারাই এই সুবিধা পাবেন।

এনবিআর সূত্র বলেছে, যোগ্য সব প্রতিষ্ঠান গ্রিন চ্যানেলের সুবিধা পাবে। যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করেছে এনবিআর। তার আলোকেই সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করা হবে।

জানা যায়, গ্রিন চ্যানেল ব্যবহার করলে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের কোনো পরীক্ষা হবে না। বন্দরে জাহাজ ভেড়ার পর বিল অব অ্যান্ট্রি দাখিল করলেই প্রযোজ্য শুল্ককর পরিশোধ করে দ্রুত পণ্য খালাস করা যাবে। একইভাবে রপ্তানিকারকরাও তাদের পণ্য দ্রুত শিপমেন্ট করতে পারবেন। যেসব দেশীয় প্রতিষ্ঠান গ্রিন চ্যানেল ব্যবহারের সুবিধা পাবে তাদের মালামাল খালাস ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হবে।

এতে বন্দরে মালামাল আটকের জন্য যে ক্ষতি হয় তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। পণ্য লোড-আনলোডের বা ওঠা-নামার খরচ লাগবে না। লিড টাইম (ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছাতে) কমবে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হবে এবং খরচ কমবে।

সূত্র বলেছে, কাস্টমসকে আধুনিকায়ন করতে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর, তারই অংশ হিসেবে গ্রিন চ্যানলে চালু করা হচ্ছে। অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটরের (এইও) আওতায় এটি চালু করা হচ্ছে।

কাস্টমসকে আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটর চালু করা হয় ২০১৯ সালে। এটি চালুর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমদানি পণ্য দ্রুত খালাস এবং রপ্তানি পণ্য দ্রুত শিপমেন্ট করা। যেসব প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হবে, শুধু তারাই গ্রিন চ্যানেল ব্যবহার করতে পারবে।

বিশ্ব শুল্ক সংস্থা (ডব্লিউওসি) ২০০৫ সালে পণ্যের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য ‘এইও’ কর্মসূচি চালু করে। কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সহজ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে বিদ্যমান শুল্ক আইন সংশোধন করে।

২০১৮ সালে এনবিআর ‘এইও’ সুবিধা পাওয়ার মানদণ্ড উল্লেখ করে একটি আদেশ জারি করে। পরের বছর ওষুধ খাতের তিনটি প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধা দেয়া হয়। যদিও প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রিন চ্যানেলের সুবিধা এখনো পায়নি।

সূত্র বলেছে, এ পর্যন্ত ৬১টি প্রতিষ্ঠান অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটর গ্রিন চ্যানেল সুবিধা পাওয়ার জন্য এনবিআরের কাছে আবেদন করেছে। এর মধ্যে ২৪টি প্রতিষ্ঠানকে ‘যোগ্য’ বলে বিবেচিত করা হয়। ‘এইও’ প্রক্রিয়ার সঙ্গে এনবিআরের কাস্টমস নিরীক্ষা মূল্যায়ন কমিশনারেট জড়িত।

যোগাযোগ করা হলে কমিশনার মোহাম্মদ এনামূল হক বলেন, ‘যাকে-তাকে গ্রিন চ্যানল ব্যবহারের সুবিধা দেয়া যায় না। যেসব প্রতিষ্ঠানের অতীত রেকর্ড স্বচ্ছ, কোনো ধরনের মামলা-মোকদ্দমা নেই, নিয়মিত কর দিয়েছে- এমন প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রিন চ্যানেল ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছে কাস্টমসে তাদের কোনো পরীক্ষা হবে না। ফলে পণ্য-আনা নেয়া সহজ হবে এবং ব্যবসার খরচ কমবে।’

জানা যায়, এ পর্যন্ত ৩টি প্রতিষ্ঠানকে অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটরের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এ গুলো হচ্ছে- বেক্সিমকো, স্কয়ার ও ইনসেপটা। যদিও প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, পণ্য খালাসে কোনো হেরফের হয়নি এখনো। এনবিআর বলেছে, ‘এইও’ চালুর জন্য কিছু প্রক্রিয়া অসম্পন্ন রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, এপ্রিলে এটি চালু করা যাবে।

কাস্টমস সূত্র বলেছে, আরও ৩টি প্রতিষ্ঠানকে গ্রিন চ্যানেল ব্যবহারের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। শিগগিরই অনুমোদন দেবে এনবিআর। পাঁচটি আছে পাইপলাইনে।

কাস্টমস নিরীক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, যারা গ্রিন চ্যানেল ব্যবহারের অনুমতি পাবে তাদের আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত তথ্য দেখভাল করার জন্য বিশেষ সফট ওয়্যার ডেভেলপমেন্ট করা হচ্ছে। এই সফটওয়্যার এনবিআরের এস আই কুডা সিস্টেমের সঙ্গে ডিজিটাল সংযোগ বা কানেক্ট করা হবে। এটি করা হলে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্রীয়ভাবে এনবিআরে বসে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

কমিশনার এনামূল হক বলেন, ‘ডিজিটাল সংযোগ করা হলে বন্দরে পণ্য খালাসের সময় ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশনের দরকার হবে না। অফিসে বসেই মনিটর করা যাবে।’

এনবিআর সূত্র বলেছে, কয়েকটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে ‘এইও’ সুবিধা দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর আইনের আওতায় সন্তোষজনক কমপ্লায়েন্স রেকর্ড থাকতে হবে। আবেদনকারীকে আগের তিন বছর অপরাধমুক্ত থাকতে হবে, কোনো রাজস্ব বকেয়া থাকা যাবে না এবং যেকোনো মামলায় জরিমানার পরিমাণ মোট পণ্য বা সেবামূল্যের ১ শতাংশের বেশি হওয়া যাবে না।

এ ছাড়া আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত মূলধন কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা ও পরিশোধিত মূলধন অন্তত ৫ কোটি টাকা হতে হবে। আর বার্ষিক আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ ন্যূনতম ৫ কোটি টাকা হতে হবে।

এ ব্যবস্থা পরীক্ষামূলক চালু হওয়ার সময় এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এক মাসের মধ্যে টেক্সটাইল, ওষুধ ও চামড়া খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে আরও ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ‘এইও’ সনদ দেয়ার জন্য বাছাই করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ‘এইও’-এর আওতায় আনা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এনবিআর প্রক্রিয়াটি আরও উন্নত ও জনপ্রিয় করতে না পারায় অথোরাইজড ইকোনমিক অপারেটর উদ্যোগে ভাটা পড়ে। তা ছাড়া কাস্টমস কর্মকর্তাদের মনোভাব পরির্বতন করা দরকার।

এদিকে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে এখনো আগের মতোই তিন থেকে চার দিন সময় লাগছে। এ জন্য কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে দায়ী করেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সনদপ্রাপ্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও তারা তা করছেন না। যে কারণে ‘এইও’ সুবিধা পাচ্ছে না কোম্পানিগুলো।

ডব্লিউসিওর তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে এইও সনদ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১ হাজার ২০টি, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ১৭ হাজার ৮৯৫টি, চীনে ৩ হাজার ২০৩টি, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৮৪৫টি এবং জাপানে ৭০৬টি।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ২০২০ সালের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিবেদনে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৮তম। কাস্টমস ও বন্দরে দক্ষতার অভাব বাংলাদেশের এই পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের লজিস্টিক পারফরম্যান্স ইনডেক্স (এলপিআই) অনুযায়ী, চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়াসহ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এই সূচকেও বাংলাদেশ কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স করেছিল।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আরও বেশিসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে এইও সনদ দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘এই উদ্যোগ সফল হলে এটি বন্দরে জট কমানোর পাশাপাশি ব্যবসায় সময় ও খরচ কমাতে সাহায্য করবে।’