ফুচকাওয়ালার আড়ালে একজন শিল্পী আজিজ

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় উত্তরাঞ্চলের জেলা ঠাকুরগাঁও যেন কিছুটা রুক্ষ। আদিগন্ত ধানখেতের বিস্তার। শীতের শুরুতে ধান কাটা হয়ে গেলে পড়ে থাকে শূন্য মাঠ। তখন সেখানকার প্রকৃতিতে ভর করে এক ধরনের শূন্যতা, হাহাকার।

যে ছোট্ট টাঙ্গন নদ একসময় ক্লান্ত পথিকের শ্রান্তি জুড়াত, সেখানকার দৃশ্যপটও এখন পাল্টে গেছে। ব্যস্ত সেতু আর নদের ধারে দাঁড়ানোর জায়গাও নেই। আছে শুধু ইলেকট্রিক আলো, যন্ত্রাংশের দোকান, পি… পি শব্দ করে ছুটে চলা তিন চাকার যান। ঠাসবুনোটের ভিড়ের এ শহর যেন শুধুই নিংড়ে নিতে চায় প্রাণশক্তি।

এই শহরেই থাকেন এক শিল্পমনা মানুষ। জীবনের যাঁতাকলে ক্রমাগত পিষ্ট হলেও নষ্ট হতে দেননি নিজের শিল্পরুচি আর ভালোবাসাকে। শহরের সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় বড় মাঠের কোণে বসে ফুচকা বিক্রি করেন তিনি। নাম আব্দুল আজিজ। বেশি পরিচিত আজিজ ভাই নামে।

তার দোকানের নাম ছবি চটপটি ঘর। সেখানে টেবিল সামনে নিয়ে বসে আছেন আজিজ ভাই। পেছনের দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধা এক ছবি; যুদ্ধাহত নারীকে কোলে করে নিরাপদ স্থানে নিচ্ছেন যুবক।

পেশায় ফুচকা, চটপটি বিক্রেতা হলেও আব্দুল আজিজ ছবি আঁকেন। সারা দিন ‍ফুচকা বেচে রাতে বাসায় ফিরে আঁকতে বসেন। দিনভর মনের ভেতর যেসব দৃশ্য খেলা করে সেগুলোই সাদা কাগজের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন কাঠপেনসিল দিয়ে।

এ পর্যন্ত শতাধিক ছবি এঁকেছেন। স্থানীয়ভাবে সেগুলোর প্রদর্শনীও হয়েছে। দোকানে নিয়মিত ফুচকা খেতে আসা গ্রাহকদের পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের অনেকেই এখন আব্দুল আজিজকে চেনেন শিল্পী হিসেবে।

আলাপ করে জানা গেল, আজিজের প্রতিবেশী এখনকার বিখ্যাত কার্টুনিস্ট শিশির ভট্টাচার্য। শৈশবে বাড়ির সামনে বসে শিশিরের আঁকাআঁকি দেখতেন। তা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে শিল্পী হওয়ার বাসনাতে ম্যাট্রিক ফেল করা আজিজ পাড়ি জমান ঢাকায়। এখনকার চারুকলা তখন ছিল আর্ট কলেজ। প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত পূরণ করতে না পারায় সেখানে ভর্তি হতে পারেননি। শহরে টিকে থাকতে কাজ শুরু করেন মগবাজারের এক ফুচকার দোকানে।

শিল্পী হতে ঢাকায় গিয়ে ফুচকাওয়ালা হয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ফেরেন আজিজ। ১৯৭৯ সালে শহরের বড় মাঠের এক কোণে দোকান পেতে বসেন। হয়ে যান পুরোদস্তুর ফুচকাওয়ালা। সময়ের সঙ্গে দোকান বড় হয়েছে। এখন তার অধীনে কয়েকজন কর্মচারী কাজ করেন। বিয়ে দিয়েছেন এক মেয়েকে।

দোকান থেকে পায়ে হাঁটার দূরত্বে মুন্সিপাড়া এলাকায় আজিজের বাড়ি। একটি ঘর বরাদ্দ রেখেছেন নিজের জন্য। ভেতরে তার আঁকা নানা শিল্পকর্ম।

আজিজ বলেন, আর্ট কলেজে ভর্তি হতে না পারার আফসোস থেকে ছবি আঁকার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়। মনে যা আসে এক সময় তাই আঁকতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে ‘আইডিয়া’ গুছিয়ে আঁকতে বসেন।

আজিজের শিল্পকর্মের মধ্য উল্লেখযোগ্য হলো- রাখালের গোধূলি, মধ্যদুপুর, জন্মের সাধ, বিয়ের বিদায়, ক্ষুধার্তের মুখোমুখিসহ শতাধিক চিত্রকর্ম। এ ছাড়া পাহাড়ি নারীর জুম চাষ, কিষানের বাড়ি ফেরার দৃশ্যও এঁকেছেন।’

আজিজ বলেন, ‘এখন পথিক শিরোনামের একটি ছবি আঁকার কাজ করছি। এই আইডিয়া পেয়েছি দোকানের সামনে ঘটা এক ঘটনা থেকে।’

আজিজকে বেশি টানে বিষাদমাখা দৃশ্য। নিজের আঁকা চিত্রকর্মের ঢাকায় প্রদর্শনীর ইচ্ছা আছে আজিজের। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রাঙ্গণে। এক সময় যে আর্ট কলেজে ভর্তি হতে পারেননি, সেখানে শিল্পকর্মের প্রদর্শন করতে চান ফুচকা বিক্রেতা পরিচয়ের গৌরব নিয়ে।