ঢাকায় জনপ্রিয় হচ্ছে ওয়াসার পানির এটিএম বুথ, গ্রাহক প্রায় ৩ লাখ

‘ওয়াটার এটিএম বুথ থেকে ৪৬ পয়সা লিটারে বিশুদ্ধ পানি কিনতে পারছি। এটিএমের পানিতে দুর্গন্ধ নেই, ফুটিয়ে পান করার বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয় না। দামও কম।’

সোমবার (২৮ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর মহাখালীর আইপিএইচে ঢাকা ওয়াসার ওয়াটার এটিএম বুথে পানি নিতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আবসার উদ্দিন একথা বলেন।

তিনি বলেন, ওয়াসার ওয়াটার এটিএম বুথ থেকে নামমাত্র মূল্যে বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারছি। বুথের এ পানি ফোটাতে হয় না। বোতলজাত পানির মতোই স্বাদ।

পশ্চিম শেওড়াপাড়ার পীরেরবাগ রোডের ওয়াসার এটিএম বুথ থেকে ১০ লিটার পানি কেনেন গৃহিণী আমেনা আক্তার। তিনি জানান, তার ছয় সদস্যের পরিবার। দিনে গড়ে ১০ লিটার খাবার পানি লাগে। কম দামে পানি পাওয়ায় মহল্লার সবাই এখান থেকেই পানি কেনেন। কাউকে বেশি দামে বাইরে থেকে বোতলজাত পানি কিনতে হয় না। তবে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা এবং আয়তনের তুলনায় এ ধরনের পাম্পের সংখ্যা অপ্রতুল। ওয়াসার উচিত, নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে এ ধরনের এটিএম বুথ চালু করা।

মহাখালী-শেওড়াপাড়ার মতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ২৮৯টি ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপন করেছে ঢাকা ওয়াসা ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ড্রিংকওয়েল। ব্যাংকের এটিএম কার্ডের মতো একটি আরএফআইডি কার্ড মেশিনে নির্দিষ্ট স্থানে রাখলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসে বিশুদ্ধ খাবার পানি। কার্ডে ১০ টাকা থেকে ৯৯৯ টাকা পর্যন্ত রিচার্জ করে দিতে পারবেন নাগরিকরা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পানি সংগ্রহ করা যায়। এই সেবা পেতে পানির এটিএম বুথের গ্রাহকসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

রাজধানীবাসীকে কম খরচে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে যৌথভাবে ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাওয়ার্ড ফর করপোরেট এক্সিল্যান্স (এসিই) পুরস্কার পেয়েছে ড্রিংকওয়েল। গত ১৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস অ্যাফেয়ার্স ২০২২ সালের পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। জলবায়ুসহিষ্ণুতা বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে ড্রিংকওয়েল।

ওয়াটার এটিএম বুথের এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ওয়াসার কাজের গতি আরও ত্বরান্বিত করবে বলে মনে করেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কম খরচে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা। এরই মধ্যে সেই লক্ষ্যে ঢাকা ওয়াসা অনেকটাই সফল। প্রত্যাশার তুলনায় এটিএম বুথগুলোতে চাহিদা বা গ্রাহক অনেক বাড়ছে। শুধু নিম্নবিত্তই নয়, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরাও এখন বুথের গ্রাহক হয়েছেন। ভবিষ্যতে এটিএম বুথের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।’

যেভাবে ওয়াটার এটিএমের পানি বিক্রি শুরু
ঢাকা ওয়াসার পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা পানি নিয়ে রাজধানীবাসীর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমন অভিযোগের মধ্যে ২০১৭ সালের মে মাসে নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কম দামে নিরাপদ পানি সরবরাহ করতে রাজধানীর মুগদায় প্রথম ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপন করা হয়। এ কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ড্রিংকওয়েলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় ওয়াসার। পরে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী শহরের বিভিন্ন জায়গায় তারা বুথ বসানো শুরু করে। ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত পানি পরিশোধনের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় এসব এটিএম বুথে।

২০১৯ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় বলা হয়, ঢাকা ওয়াসা পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ। ৯১ শতাংশ গ্রাহক খাবার পানি ফুটিয়ে পান করেন। পানি ফুটিয়ে পানের উপযোগী করতে বছরে ৩২২ কোটি টাকার গ্যাস খরচ হয়।

ঢাকা ওয়াসা ও ড্রিংকওয়েলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ওয়াটার এটিএম বুথের সংখ্যা ২৮৯টি। এটিএম বুথের কার্ডের গ্রাহকসংখ্যা ২ লাখ ৮৮ হাজার। প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ লিটার পানি বিক্রি হচ্ছে।

সম্প্রতি পুরান ঢাকার ওয়ারী, নাজিরাবাজার, লালবাগ, হাজারীবাগ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ওয়াটার এটিএম বুথগুলো মূলত ওয়াসার পানির পাম্প সংলগ্ন এলাকায় বসানো হয়েছে। গভীর নলকূপ থেকে পানি তুলে নির্ধারিত পাত্রে রাখা হয়। সেখানে পানি পরিশোধন করে তা এটিএমে আসে। পরে কার্ড যন্ত্রে ঢোকানোর পর নির্ধারিত বোতাম চাপলে পানি পড়তে শুরু করে। পানি নেওয়া শেষে কার্ডটি সরিয়ে ফেললে পানি আসাও বন্ধ হয়ে যায়। প্রতি লিটার পানির জন্য নেওয়া হচ্ছে ৪৬ পয়সা।

নাজিরাবাজারে ওয়াটার এটিএম বুথ থেকে নিয়মিত খাবার পানি নেন স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম খান। তিনি বলেন, ঢাকা ওয়াসার এই সেবা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। এখন মহল্লার সবাই এই এটিএম বুথ থেকে পানি কিনে পান করেন। ফলে গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে, বিলও কম আসছে।

তিনি বলেন, আগে ওয়াটার এটিএম বুথের পানি প্রতি লিটারের দাম ছিল ৪০ পয়সা করে। এখন আরও ৬ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। এই পানির দামটা যাতে আর না বাড়ে সেদিকে কর্তৃপক্ষকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানাই।

ওয়াটার এটিএম বুথ প্রকল্পের পরিচালক ও ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রামেশ্বর দাস বলেন, শুরুতে শহরের নিম্নবিত্ত শ্রেণির লোকজনকে বিশুদ্ধ পানি দেওয়ার লক্ষ্যে এটিএম বসানো হয়েছিল। এটিএমের পানির মানের কারণে এখন সব শ্রেণির লোকজনই গ্রাহক হচ্ছেন। এই পানির গুণগত মান বোতলজাত পানির মতোই।

পানির দাম ৬ পয়সা বাড়ানোর বিষয়ে রামেশ্বর দাস জানান, তারা ৪০ পয়সা লিটারেই পানি বিক্রি করছেন। এখন যে ৬ পয়সা বেশি নেওয়া হচ্ছে, তা সরকার ভ্যাট হিসেবে কেটে নিচ্ছে। আশাকরি ভবিষ্যতে এই পানির দাম আর বাড়বে না।

৫০০ এটিএম বসানোর পরিকল্পনা
বিভিন্ন বুথের অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু নিম্নবিত্তই নয়, মধ্যবিত্ত এবং অনেক উচ্চবিত্তও এখন ওয়াটার এটিএম বুথের গ্রাহক। এখন আর তাদের পানি ফোটানোর কষ্ট করতে হয় না। বুথের পানি দিয়েই চলছে। তবে বুথের বিষয়ে খুব বেশি প্রচার নেই।

ওয়াসা ও ড্রিংকওয়েল বলছে, যেসব এলাকায় পানির সংকট আর পানিতে গন্ধ ও দূষণ রয়েছে, সেসব এলাকায় গ্রাহক বেশি। এসব এলাকার মধ্যে মুগদা, কদমতলা, মিরপুর, ফকিরাপুল ও পুরান ঢাকায় গ্রাহক বেশি।

ওয়াটার এটিএম বুথ প্রকল্পের পরিচালক রামেশ্বর দাস বলেন, প্রতিনিয়ত এটিএম বুথের গ্রাহকসংখ্যা বাড়ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০০টি এটিএম বুথ চালুর বিষয়ে ড্রিংকওয়েলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

গ্রাহক হওয়া যাবে যেভাবে
যে কোনো একটি ওয়াটার এটিএম বুথে গিয়ে দায়িত্বরত অপারেটরকে বললেই কার্ড পাওয়া যায়। এজন্য সঙ্গে নিতে হবে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, দুই কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও ৫০ টাকা (ফি)। এটিএম কার্ডে একবারে সর্বোচ্চ ৯৯৯ টাকা আর সর্বনিম্ন ১০ টাকা রিচার্জ করে পানি নেওয়া যায়। কার্ড রিচার্জও করেন বুথ অপারেটর। তবে এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও রিচার্জের পদ্ধতি চালু হয়েছে।