সব পথ মিলবে মাল্টিমডাল ট্রান্সপোর্ট হাবে, বদলে যাবে কমলাপুর

এখন প্রায় সোয়া লাখ যাত্রী ১১৭টি ট্রেনে যাতায়াতের জন্য দৈনিক কমলাপুর রেল স্টেশনে আসেন। স্টেশনের কাছেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দূরপাল্লার বাস স্ট্যান্ডও।কয়েক বছরের মধ্যে এখানে যােগ হচ্ছে মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে আর বিআরটির পথও।

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম এ অংশে বিপুল এসব যাত্রীর ঢল সামাল দিতে ‘মাল্টিমডাল ট্রান্সপোর্ট হাব’ হিসেবে পরিচিত আধুনিক একটি বহুমুখী যাতায়াত কেন্দ্র গড়ে তোলার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা এবার বাস্তবে রূপ দিতে কাজ শুরু হয়েছে; সরকারের নীতিগত অনুমোদনের পর অর্থায়নের চেষ্টা চলছে।

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বছর কয়কের মধ্যে আমূল বদল আসবে মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে ও বিআরটির হাত ধরে। সেটির সঙ্গে আধুনিক যাত্রীসেবার ব্যবস্থা করতেই উন্নত দেশের আদলে গড়ে তোলা হবে বিশাল বাজেটের এ মাল্টিমডাল ট্রান্সপোর্ট হাব।

সড়ক ও রেলপথকে একই কেন্দ্রে আনা ঐতিহ্যবাহী কমলাপুর রেল স্টেশনকে ঘিরেই হবে দেশের প্রথম এই হাব; যাতে যাত্রী সেবার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও আসবে নতুনত্ব, সহজেই অদল বদল করা যাবে বাহন। বদলে যাবে পুরো এলাকার চিত্র।

প্রাথমিকভাবে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য ধরে কাজ শুরু করা এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের সঙ্গে দ্রুত গতির রেল যোগাযোগের কাজও হবে। সরিয়ে দেওয়া হবে কমলাপুর আইসিডি কন্টেইনার টার্মিনাল; গড়ে তোলা হবে ৬০তলা মাল্টি পারপাস ভবন।

কমলাপুরের পাশাপাশি বিমানবন্দর স্টেশনেও আরেকটি মাল্টিমডাল ট্রান্সপোর্ট হাব নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম সব প্রান্তের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াতে উড়াল ও পাতালসহ ছয়টি রুটে মেট্রো রেল নির্মাণ করছে সরকার। এসব রেলের একটি প্রধান গন্তব্য হচ্ছে কমলাপুর রেলস্টেশন।

একইসঙ্গে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত যাওয়া ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েরও অন্যতম প্রধান গন্তব্য হচ্ছে কমলাপুর রেল স্টেশন।

কমলাপুরে এসে আন্ত:জেলা ও রাজধানীর রেল ও সড়ক পথের যাত্রীরা যাতে এক পরিবহন থেকে অন্য পরিবহন বদলে ভিন্ন গন্তব্যে যেতে পারে সেজন্য এ হাব তাদের যাতায়াতকে সহজ করবে।

সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে জাপান ও বাংলাদেশ দুই দেশের সরকারভিত্তিক (জি টু জি) এ প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য প্রাথমিকভাবে ঠিক করা হয়েছে। কাজিমা করপোরেশনকে প্রধান করে একটি কনসোর্টিয়ামও গঠন করে দিয়েছে জাপান সরকার।

বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে জাপানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি সই করে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বৈঠকে অনুমোদনও দিয়েছে।

এজন্য সমীক্ষা শুরু হয়েছে এবং অর্থায়নের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, “কমলাপুর ও ঢাকা বিমানবন্দর রেল স্টেশনকে মাল্টিমডাল ট্রান্সপোর্ট হাবে উন্নীত করা একটি মহাপরিকল্পনা।“

তিনি জানান, মেট্রো রেল, পাতাল রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বিআরটি যাত্রীদের পরিষেবা দিতে আন্ডারগ্রাউন্ডে বহুতল রেলস্টেশনসহ বিশ্বমানের ৬০তলা মাল্টি পারপাস ভবন তৈরি করা হবে।

রেল, সড়ক, টানেল তৈরির জন্য কাজিমা করপোরেশনকে প্রধান করে গঠিত ‘সাব ওয়ার্কিং গ্রুপের’ বাকির দুই কোম্পানি নিপ্পন কোই ও ওরিয়েন্টাল কনসাল্ট্যান্ট গ্লোবাল। এই গ্রুপই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।

কী থাকছে মাল্টিমডাল ট্রান্সপোর্ট হাবে
এটি এমন একটি কেন্দ্র যেখানে অনেকগুলো পথ এসে মিলেছে। এখান থেকে যাত্রীরা সহজেই নিজের গন্তব্যের পরিবহন বদল করতে পারেন। মাল্টিমডাল ট্রান্সপোর্ট হাব সড়ক ও রেলকে যেমন একই সংযোগের আওতায় আনে, তেমনি চলাচল সহজ করে পরিবহন খাতকে গতিময় ও সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

কমলাপুর ও ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশনকে ঘিরে এ হাব গড়ে তোলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপরিবহন করিডোরের আধুনিকায়ন, কমলাপুর রেলস্টেশনের বিদ্যমান অবকাঠামো স্থানান্তরের কাজও হবে।

প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে যেখানে আইসিডি রয়েছে সেই পুরো জায়গাটি খালি করে সেখানে পরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করে বহুমাত্রিক সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা (মাল্টিমডাল ট্রান্সপোর্ট হাব) নির্মাণ কাজে হাত দেওয়া হবে।

সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) ওয়েবসাইটে এ প্রকল্পের বিষয়ে বলা হয়েছে, এ হাবে যাত্রীর পাশাপাশি পণ্যের গাড়ি ও গন্তব্য বদলের ব্যবস্থা থাকবে।

একটি স্টেশনে বিদ্যমান অন্যান্য সুবিধার সঙ্গে অপেক্ষারত যাত্রীদের খাবার, কেনাকাটার পাশাপাশি হোটেল ও অফিস থাকবে। এ ভবনের সুবিশাল পরিসরে উন্নত বিশ্বের আদলে শপিং কমপ্লেক্সসহ নানামুখী বাণিজ্যক জায়গা থেকে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা চলছে।

প্রকল্প পরিচালক ফাত্তাহ জানান, প্রাথমিকভাবে এ পরিকল্পনার মাধ্যমে পাতাল রেলের যাত্রী ব্যবস্থাপনার জন্য পাতাল রেল স্টেশন, মেট্রো রেল এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের যাত্রী ব্যবস্থাপনার জন্যও আলাদা অবকাঠামো তৈরি করা হবে।

বহুমুখী এ কেন্দ্র উন্নত যাত্রী সেবার পাশাপাশি যানজট কমাতে এবং রাজধানীতে যাওয়া আসা করা ব্যক্তিদের চলাচল সহজ করতে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।
একইভাবে বিমানবন্দর রেল স্টেশনেও প্রয়োজনীয় জমির ওপর অবকাঠামো নির্মাণের জন্য উপযুক্ত করবে বাংলাদেশ সরকার।

কমলাপুর রেল স্টেশন: প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী এতে থাকবে
কমলাপুর রেল স্টেশনে নতুন ভবন ও বহুমাত্রিক স্টেশন তৈরি করা হবে। সঙ্গে থাকবে পরিবহন হাব; ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলার।
বিমানবন্দর রেল স্টেশনের হাবের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি ডলার।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোর উন্নত করা হবে; ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৬ কোটি ডলার।
চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট-সিজিপিওয়াই মিটার গেজ সেকশনকে ডাবলসহ ডুয়েল গেজে রূপান্তর করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকামুখী কার্গো পরিবহনে বে টার্মিনালের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হবে।
রেলের জন্য উন্নতমানের ওয়ার্কশপ নির্মাণ করা হবে।
২০টি রেল ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি কেনা হবে।

অর্থায়ন কোথা থেকে
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। এজন্য বিশ্ব ব্যাংকের কাছে ১০৯ কোটি ৫৮ লাখ ডলার (সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা) ঋণ চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রস্তাব দিয়েছে। বাকি অর্থ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে।

রেল বিভাগের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা এস এম সলিমুল্লাহ বাহার জানিয়েছেন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাটির সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে।
চলতি বছরের ১১ থেকে ২১ এপ্রিল এবং ৪ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই ধাপে বিশ্ব ব্যাংকের কারিগরি প্রতিনিধি দল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনও করে গেছে বলে জানান তিনি।

বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা আবাসিক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোর ইম্প্রুভমেন্ট ইনক্লুডিং ঢাকা স্টেশন ইয়ার্ড রিমডেলিং কনস্ট্রাকশন অব নিউ স্টেশন বিল্ডিং অ্যান্ড শিফটিং অ্যান্ড মেনটেইন্যান্স’ নামের প্রকল্পের আওতায় এ ঋণ চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

সরাতে হবে কমলাপুর আইসিডি
রেল বিভাগের তৈরি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রস্তাবে দেখা যায়, ঢাকার প্রধান দুই রেলস্টেশনে মাল্টি মডাল ট্রান্সপোর্ট হাব তৈরির জন্য বিদ্যমান যেসব অবকাঠামো রয়েছে সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কমলাপুরের আইসিডি সরানো।

এটি গাজীপুরে স্থানান্তরের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় আলাদা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ফাত্তাহ জানান, বাংলাদেশের কাজের অংশ হিসেবে কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপো (আইসিডি) অন্য কোনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হবে। এরপর সেখানকার প্রায় ৪১ একর জমিতে থাকা অন্যান্য ভবন ভেঙে নতুন কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুত করা হবে।

রেল বিভাগের এক সমীক্ষা তুলে ধরে প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়, মাল্টিমডাল ট্রান্সপোর্ট হাবের আওতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোর হলে পণ্য পরিবহনে সড়কের ওপর চাপ কমবে। এতে দৈনিক ৫০০টি ট্রাকের সমপরিমাণ পণ্য বহন করা যাবে রেলে। এতে সময় বাঁচবে বলে পণ্যের ব্যয়ও কমবে।

কীভাবে বাস্তবায়ন
কাজিমা করপোরেশন ও বাংলাদেশ রেলওয়ের পাশাপাশি ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), সেতু কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সঙ্গে সমন্বয় করে এ প্রকল্প এগিয়ে নেবে।

প্রকল্প পরিচালক ফাত্তাহ জানান, বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের মধ্যে জি টু জিভিত্তিক অর্থায়ন চুক্তির আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে। কাজিমা করপোরেশনের নেতৃত্বে গঠিত সাব ওয়ার্কিং গ্রুপ এখন পুরো পরিকল্পনার নকশা তৈরি করছে।

পিপিপির চূড়ান্ত চুক্তি অনুযায়ী, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং সরকার এ আয় থেকে ভাগ পাবে। তবে এখনও কার কত বিনিয়োগ করতে হবে বা কে কত লভ্যাংশ পাবে তা চূড়ান্ত হয়নি।

নকশা ও ব্যয় চূড়ান্ত হলে কার কত ব্যয় এবং কে কত অংশ পাবে তা নির্ধারণ করা হবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।