সরকারিভাবে কর্মী যাচ্ছে মালয়েশিয়া

বেসরকারি সিন্ডিকেটের পাশাপাশি সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের (বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড) মাধ্যমে ৩০ জন কর্মী নিয়ে ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইট কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছেছে। এ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে তিন দফায় ৩০ জন করে ৯০ কর্মী মালয়েশিয়ায় যাবেন। এসব কর্মীকে দেশটির প্লান্টেশন সেক্টরে কাজের উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছে বলে জানান বোয়েসেলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) ও অতিরিক্ত সচিব মল্লিক আনোয়ার হোসেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ‘স্পেশাল ওয়ান-অব রিক্রুটমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় বাংলাদেশ থেকে বোয়েসেলের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে প্রায় ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়। এরই মধ্যে ছয়টি কোম্পানি থেকে প্রায় এক হাজার কর্মীর চাহিদা পাওয়া গেছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ডাটাবেইস থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন জেলায় চাকরি মেলার মাধ্যমে কর্মীর তালিকা সংগ্রহ করে ৭০০ কর্মীকে প্রস্তুত করা হয়েছে। এভাবে কর্মী পাঠানোর খরচ প্রায় ৪৬ হাজার টাকা।

কর্মীদের বিদায় জানাতে মঙ্গলবার বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন বোয়েসেলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও অতিরিক্ত সচিব ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন।

বোয়েসেলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) আরো জানান, এক হাজার কর্মীর চাহিদা থাকলেও প্রাথমিকভাবে ৯০ জন যাবেন। আজ বুধবার যাবেন আরো ৩০ জন এবং ১ ডিসেম্বর যাবেন বাকি ৩০ জন। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে পাঠাচ্ছি তাদের। ৬টি কোম্পানি থেকে আমরা এক হাজারের মতো ডিমান্ড পেয়েছি। আরও ডিমান্ড এলে আমরা সবই পাঠাতে পারবো।

মালয়েশিয়ার অন্যতম বৃহৎ প্লান্টেশন কোম্পানি ইউনাইটেড প্লান্টেশন (ইউপি) থেকে এরই মধ্যে ৫৫০ জন কর্মীর চাহিদা পাওয়া গেছে। সেখানে যাওয়া সংক্রান্ত সব ব্যয় ইউপি কোম্পানি বহন করছে। তাই সম্পূর্ণ বিনা খরচে বোয়েসেলের মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মীরা মালয়েশিয়া যাচ্ছেন।

এদিকে, মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানিতে বাড়েনি গতি। দেশটিতে লাখ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও তা’ কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। দীর্ঘ চার বছর পর গত আগস্ট মাস থেকে ২৫ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশটি কর্মী নিয়োগ শুরু হলেও এ যাবত আশানুরুপ কর্মী যাওয়ার সুযোগ পায়নি। ঢাকাস্থ মালয়েশিয়ান হাইকমিশনে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীর পাসপোর্টে ভিসা ইস্যু হচ্ছে ধীরগতিতে। নানা কারণে যথাসময়ে ভিসা ইস্যু না হওয়ায় এসব কর্মীরা দেশটিতে যেতে পারছে না। একাধিক রিক্রুটিং এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এ যাবত প্রায় দেড় ১ লাখ কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র লাভ করেছে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা এবং পদে পদে হয়রানির কারণে জনশক্তি রফতানিতে বাড়ছে না গতি। মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা দ্রুত কর্মী না পাওয়ায় চরমভাবে ক্ষুব্ধ। নেপাল ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী যেতে সময় লাগে মাত্র ১৫ দিন। আর বাংলাদেশ থেকে কর্মী যেতে সময় লাগে দু’মাস থেকে তিন মাস। দেশটিতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি কর্মীরা গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছে।

সরকার এবার দেশটিতে কর্মী প্রেরণের অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করেছে ৭৮ হাজার ৯০০টাকা। মালয়েশিয়ার সাবেক মানবসম্পদ মন্ত্রী এম সারাভানান ঢাকায় ঘোষণা দিয়েছিলেন শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে বাংলাদেশ থেকে কর্মী যাবে। এখন অঘোষিতভাবে ২৫ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী যেতে জনপ্রতি সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে চার লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগি এ অভিমত ব্যক্ত করেছে। এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার রিংগিত দিয়ে কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র ক্রয় করছে বলেও জানা গেছে। চাহিদাপত্র ক্রয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দেশটিতে পাচার হচ্ছে বলেও অসমথিত সূত্র জানায়। কোনো ব্যয় না করেই সিন্ডিকেটের বিশেষ কোডে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের অভিবাসন ব্যয়ের টাকা যোগাতে নাভিশ্বাস উঠছে। অনেকেই চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ, ভিটেমাটি ও গবাদিপশু বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। দিন দিন মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু পরিবারগুলো ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

প্রথমে ২৫ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ শুরু হলেও পরবর্তীতে বায়রা নির্বাচনের পর আরো ৭৫ রিক্রুটিং এজেন্সিকে দেশটিতে কর্মী নিয়োগের অনুমতি দেয়া হয়। এসব এজেন্সিকে পাসওয়ার্ড দেয়া হয়েছে মাত্র। তাদেরকে কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়া সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। হায়দরী ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পাটনার সৈয়দ গোলাম সরওয়ার মঙ্গলবার রাতে বলেন, ৭৫টি নতুন রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের পাসওয়ার্ড পেয়েছে। হায়দরী ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এ যাবত ৩০০ জন কর্মী নিয়োগের চাহিাদপত্র পেয়েছে। এর মধ্যে ১০০ জন কর্মীর কলিং এর জন্য পাঠানো হয়েছে। এসব কর্মীদের আগামী মাসে ফ্লাইট দেয়া সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগানুমতি পাওয়া গেছে।

মালয়েশিয়ায় চাকরি নিয়ে যাওয়ার আশায় মেডিকেল সেন্টারগুলোতে হাজার হাজার কর্মী হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে প্রায় ৬০টি মেডিকেল সেন্টার মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের কাছ থেকে প্রায় দশ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে ২৬০০ টাকা (১০০ রিংগিত) মাইগ্রামসকে গত ২৬ অক্টোবর থেকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর আগে যেসব কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছে তাদের প্রত্যেকের জন্য ২৬০০ টাকা পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট এজেন্সিকে চাপ দিচ্ছে মাইগ্রামস। একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সি এতথ্য জানিয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের নিয়োগানুমতি পেতে এজেন্সির মালিকদের গলদঘর্ম পোহাতে হচ্ছে। টেবিলে টেবিলে নানা প্রকার হয়রানি এবং চরম উদাসিনতার দরুণ বিএমইটি থেকে বর্হিগমন ছাড়পত্র পেতে কর্মীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে বলে একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সি জানিয়েছে। দেশটিতে ছয় লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী কঠোর পরিশ্রম করে প্রচুর রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছে। কর্মী প্রেরণের গতি বাড়ানো সম্ভব হলে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণও বাড়বে। একাধিক জনশক্তি রফতানিকারক এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

এদিকে, ডলার সঙ্কটের মধ্যে রেমিট্যান্সে ভাটার টান শুরু হয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবর মাসে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫২ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১০৪ টাকা হিসাবে) এর পরিমাণ ১৫ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। গত আট মাসের মধ্যে এটিই প্রবাসীদের পাঠানো এক মাসে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স। উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবরে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৬৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। গত ১ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। কর্মী নিয়োগ শুরু থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ৫ লাখ কর্মী যাওয়ার সম্ভাবনা কথা জানিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার গোলাম সরওয়ার। কর্মী প্রেরণে ধীরগতি অব্যাহত থাকলে দেশটিতে ৫ লাখ কর্মী যাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিবে।

মালয়েশিয়ার সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার ধরে রাখতে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি বাড়াতে কর্মী নিয়োগানুমতি ও বর্হিগমন ছাড়পত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ইস্যু করার জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন রিক্রুটিং এজেন্সি নিউ এইজ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো.সওকত হোসেন সিকদার।

তিনি বলেন, প্রবাসী মন্ত্রণালয় থেকে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের নিয়োগানুমতি ও বিএমইটি থেকে বর্হিগমন ছাড়পত্র ইস্যুতে জটিলতা কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির বাজার ধরে রাখতে হলে কর্মী নিয়োগানুমতি ও বর্হিগমন ছাড়পত্র ইস্যু কার্যক্রম আরো সহজীকরণ করতে হবে। অন্যথায় দেশটির শ্রমবাজার হাত ছাড়া হবার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, কর্মী পাঠাতে বিলম্ব হওয়ায় দেশটির নিয়োগকর্তারা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হচ্ছে। আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী ও বায়রার নবনির্বাচিত সদস্য আবুল বাসার মঙ্গলবার জানান, মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণে আমরা উভয় দেশের নিয়ম নীতি অনুসরণ করেই পাঠাচ্ছি।

তিনি কর্মী নিয়োগানুমতি ও বর্হিগমন ছাড়পত্র দ্রুত ইস্যুর ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনাল ১৩শ’ বর্হিগমন ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১১শ’কর্মী দেশটিতে চলে গেছে। ঢাকাস্থ মালয়েশিয়ান হাইকমিশনও এখন দ্রুত ভিসা ইস্যু করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার কর্মী দেশটিতে চলে গেছে। চলতি মাসের মধ্যে প্রায় ত্রিশ হাজার কর্মী দেশটি যাওয়ার সুযোগ পাবে।