রপ্তানি পণ্যের বড় বাজার হতে পারে ভারত

বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আকর্ষণীয় মাথাপিছু আয় তথা ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় বৃহৎ একটি ভোক্তা বাজারের উদ্ভব, রপ্তানি বৃদ্ধিজনিত কারণে বিশাল আকারের সাপ্লাই চেইনের চাহিদা, প্রায় বিচ্ছিন্ন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে একটি বিশদ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে সেপা চুক্তি করার বিষয়ে আগ্রহী করতে অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করছে বলে বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশে চীনের ব্যাপক আকারের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উপস্থিতি বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের জন্য খুব একটা সহনশীল বিষয় নয়। বাংলাদেশকেও চীনের সঙ্গে নতুন নতুন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভারতের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হয়। চীন তো অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করার জন্য মুখিয়ে আছে। চীন এখন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ২৫ শতাংশ এখন চীন মিটিয়ে থাকে।

ভারত মিটিয়ে থাকে সাত থেকে ১৬ শতাংশ। কিছুদিন আগেও কিন্তু এ চিত্রটা ছিল উলটো। দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাংশ তথা বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অংশ এক সময় বিশ্বের অন্যতম দারিদ্র্যপ্রবণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। ক্রমেই এ অংশটির সম্পদগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেশগুলো দারিদ্র্য থেকে অনেকটাই মুক্তি পেতে শুরু করেছে। সার্কের মতো আঞ্চলিক সহযোগিতার প্ল্যাটফরম এ অঞ্চলের শতকোটি মানুষের মাঝে অনেক আশা-ভরসা সৃষ্টি করলেও একসময় আঞ্চলিক বা বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নানা জটিলতার কারণে খুব একটা এগোতে পারেনি। সার্ককে কখনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সহযোগিতার চুক্তি হিসেবে গণ্য করা যায়নি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ১৯৯৩ সালে সম্পাদিত সাফটা চুক্তি প্রকৃত অর্থে ২০০৬ সালে কার্যকর হলেও তেমন কোনো সুফল বয়ে আনেনি। এর কারণ হিসেবে যেসব বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা যায় তা হলো, সার্কের দুই সদস্য দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে বৈরিতা, ভারতের প্রতি ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর সন্দেহ ও অবিশ্বাস, বেশিরভাগ সদস্যের মাঝে সাফটার কার্যকারিতার বিষয়ে আন্তরিকতাসহ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাব। কিন্তু বিশদ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগ, কানেক্টিভিটি এবং সেবাভিত্তিক পণ্য বাণিজ্যের বিষয়গুলো অনুপস্থিত ছিল সাফটায়।

বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্ত বাণিজ্যিক সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কা থেকে দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে এমন চুক্তি করার দিকে ঝুঁকছে। ইতোমধ্যে ভুটানের সঙ্গে এ ধরনের একটি চুক্তি সম্পাদন করেছে ভারত। ইতোমধ্যে সার্কের সদস্য দেশ ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ডসহ সিঙ্গাপুরের সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারত। শ্রীলঙ্কা ২০০৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদন করেছে। ভারত ও চীনসহ অনেক দেশ থেকেই মুক্তবাণিজ্য চুক্তির জন্য বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের কাছে প্রস্তাব এলেও বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ার কারণে বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ বিবেচনায় দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝে অবস্থান করছিল।

এবার ভারত সফর শেষে ভারতের সঙ্গে সেপা চুক্তি করার জন্য আলোচনা শুরুর জন্য দুপক্ষই একমত হয়েছে। ধারণা করা যায়, অতি দ্রুত এ চুক্তি সম্পাদিত হবে। প্রস্তাবিত সেপা চুক্তির তিনটি মাত্রা রয়েছে। পণ্য বাণিজ্য, সেবা বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ। এর মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা, দুই দেশের মধ্যে কানেক্টিভিটিসহ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগানো। এ ছাড়াও এ চুক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যেসব বিষয় রয়েছে তা হলো, সাপ্লাই চেইনের অবাধ প্রাপ্তি নিশ্চিত, প্রতিরক্ষা সামগ্রীর যৌথ উৎপাদন এবং যৌথ উদ্যোগে ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য ওষুধ সামগ্রী উৎপাদন। সেপা চুক্তি সম্পাদিত হলে কয়েক বছরের মধ্যে উভয় দেশের বাণিজ্য প্রায় ৩ গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বড় ধরনের একটি বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এ চুক্তি বাণিজ্য ঘাটতি বেশ কমিয়ে আনবে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে বিবিআইএন এবং বিমসটেক পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। এ চুক্তির ফলে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন নতুন উৎপাদনের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে উভয় দেশের সাপ্লাই চেইনের বিরাজমান বাধা হবে দূরীভূত। দুই দেশের মাঝে সড়ক, রেল ও নৌপথে যোগাযোগের সহজলভ্য ব্যবস্থা থাকায় কোভিড এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সাপ্লাই চেইনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ ভারতের উদ্যোক্তাদের জন্য তিনটি বৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করছে। এসব বিশেষ অঞ্চলে ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাপ্লাই চেইনের চাহিদা বিবেচনায় এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি করার জন্য শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে পারবেন। প্রস্তাবিত সেপা চুক্তিতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে রেলওয়ে ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্ডার হাট, মাল্টিমডাল পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বাড়ানোর কথাও রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কানেক্টিভিটির প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে প্রথম থেকেই বেশ জোরেশোরেই শুরু হয়েছে। এ ধরনের বহুমাত্রিক কানেক্টিভিটি স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যেই বড় বড় কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ভারত সরকার মাল্টিমডাল কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ সহায়তা প্রদান করছে। তবে বিভিন্ন জটিলতায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজটি বিলম্বিত হচ্ছে। এ কারণে কানেক্টিভিটির উদ্যোগগুলো কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান ভারত সফরের সময় ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের সঙ্গে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির জন্য ট্রানজিট সুবিধা প্রদানের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলবেষ্টিত প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে সহজ হবে– এমনটা আশা করা যায়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সেপা বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে বাংলাদেশের ভেতরে কিছু দ্বিধা-দ্বন্দ্বও রয়েছে। ভারত ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বেশিরভাগ পণ্যের ওপর ট্যারিফ সুবিধা প্রদান করেছে। তবে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা সেগুলো পুরোপুরি ভোগ করতে পারছেন না বলে কিছু অভিযোগ রয়েছে। ভারতের দিক থেকে নানা ধরনের ট্যারিফবহির্ভূত বাধা সৃষ্টির কারণে ভারতে বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানি গতি পাচ্ছে না। রুলস অব অরিজিন, পণ্যের মান নির্ণয়ে জটিলতাসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব ইস্যুগুলো এ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে তথ্য রয়েছে।

এ কারণে ভারত কর্তৃক ঘোষিত শুল্ক সুবিধাগুলো ভোগ করে বাংলাদেশের পণ্য ভারতে আশানুরূপ পরিমাণে রপ্তানি হচ্ছে না। বাংলাদেশের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ার আশঙ্কায় ভারতের ব্যবসায়ীদেরও নানারকম চাপ রয়েছে। বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য কোনো অদৃশ্য বাধা ছাড়াই যেভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, বাংলাদেশের পণ্যগুলো ঠিক একইভাবে নির্বিঘ্নভাবে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সেপা চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ভারত থেকে কয়েকগুণ পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। সেপা চুক্তি বাস্তবায়ন হলে আগামী কয়েক বছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশে থেকে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ এ বাংলাদেশ থেকে ভারতে মাত্র ১.৭১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যদিও ২০২০-২১ সালে এ রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ বিলিয়ন ডলার।

প্রায় ১৫০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে বাংলাদেশের বিশাল রপ্তানির সম্ভাবনা থাকলেও কাক্সিক্ষত মাত্রায় তা সম্ভব হচ্ছে না। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ হলেও ভারতে ২০২০-২১ সালে মাত্র ২৩৮ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি সম্ভব হয়েছে। ভারত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির একটি বড় গন্তব্যস্থল হতে পারে। কেননা, বাংলাদেশের পোশাক বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে সস্তা। তাছাড়াও বাংলাদেশে এখন বিশ্বমানের পোশাক তৈরি হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয়ের পরিবহন খরচ অনেক কম। দ্রুত ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব। আর তাই বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকদের যেমনি ভারতে প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, ঠিক তেমনি ভারতের আমদানিকারকদেরও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বাংলাদেশের পোশাকের কদর দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভারতের সব রাজ্যে অশুল্ক বাধা দূরীকরণ, রুলস অব অরিজিন সহজীকরণ এবং সেইসঙ্গে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মনমানসিকতার পরিবর্তন। সেপা কার্যকর হলে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করলেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা এ চাপ সামলে ভারতের মতো একটি বিশাল বাজার বিবেচনায় নিয়ে সক্ষমতা অর্জন করতে পারলে ভারতকে বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজারে পরিণত করা সম্ভব হতে পারে।

লেখক : ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক-বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোঃ লিঃ