বঙ্গবন্ধু টানেলে খুলবে সম্ভাবনার দ্বার

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী এলাকা থেকে পর্যটননগর কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী এলাকা টেকনাফ। দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃত গ্রামীণ এই জনপদে গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পর্যটনশিল্প, এলএনজি টার্মিনাল, জ্বালানি তেলের সিঙ্গেল মুরিং প্রজেক্ট ডিপোসহ আরো বিভিন্ন মেগাপ্রকল্পের উন্নয়নকাজ চলমান আছে। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরে বে-টার্মিনালসহ বেশ কয়েকটি বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আশাজাগানিয়া এসব মেগাপ্রকল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বর্তমানে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।

শিগরির বাংলাদেশে তথা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’-এর দ্বার উন্মোচিত হবে। কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ গড়ে উঠবে। চীনের সহযোগিতায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত স্বপ্নের এই টানেল এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। এই টানেলের উদ্বোধনের মাধ্যমে যানবাহন চলাচল শুরু হলে তা ঘিরেই আগামী কয়েক বছরে দক্ষিণাঞ্চলে আরো প্রায় লাখ কোটি টাকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাপক গতি আসবে। অর্থনীতির পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থায়ও আমূল পরিবর্তন ঘটবে। সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলসহ চট্টগ্রামে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ সুগম হবে।

বঙ্গবন্ধু টানেল চট্টগ্রাম নগর অংশে পতেঙ্গার নেভাল একাডেমির প্রান্ত থেকে শুরু করে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ হয়ে দক্ষিণে জেলার আনোয়ারা অংশে উঠেছে। আনোয়ারা অংশে টানেলের বাঁ পাশে কাফকো ও ডান পাশে সিইউএফএল। চট্টগ্রাম নগর থেকে টানেলের মাধ্যমে আনোয়ারা-চাতরি-চৌমুহনী সংযোগ সড়ক হয়ে কক্সবাজারসহ দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হবে।

ফলে অর্থনীতির উন্নয়নের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যোগাযোগব্যবস্থায় সময়ও অনেক সাশ্রয় হবে। চট্টগ্রাম নগরে যানজট কমে আসার ক্ষেত্রেও এই টানেল সহায়ক ভূমিকা রাখবে। টানেল ঘিরে নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাঁরা বলছেন, এ টানেলের ফলে চট্টগ্রামে পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেগবান হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠার পাশাপাশি এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে। পর্যটন, আবাসন ও যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।

বিজিএমইএর সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম টানেল চট্টগ্রামে। এই টানেল চালুর পর শিল্প-কারখানার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে। চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা জিডিপিতে বড় অবদান রাখবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়বে। ’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘টানেলের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অনেক অজপাড়া গাঁয়েও শিল্প-কারখানার বিকাশ ঘটবে। এতে করে লাখ লাখ মানুষের বেকারত্ব ঘুচে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আবাসনশিল্পের প্রসার ঘটবে। বাণিজ্যের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা অনেক সহজ হবে। সব মিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। ’

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘টানেলের কারণে কানেক্টিভিটি বাড়বে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প-কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান ও শিল্পোদ্যোক্তা আব্দুচ ছালাম বলেন, ‘বিশ্বমানের পর্যটননগরী হবে দক্ষিণ চট্টগ্রামে। বঙ্গবন্ধু টানেলের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল এলাকায় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ অবকাঠামোগত নানা উন্নয়ন প্রকল্পে এক লাখ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ’

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩.৩২ কিলোমিটার। এর মধ্যে টানেলের প্রতিটি সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য ২.৪৫ কিলোমিটার। দুই সুড়ঙ্গে দুটি করে মোট চারটি লেন থাকবে। মূল টানেলের সঙ্গে পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫.৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক থাকবে। আনোয়ারা প্রান্তে রয়েছে ৭২৭ মিটার দীর্ঘ উড়ালসড়ক।

২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি চিনপিং (বাংলাদেশ সফরকালে) কর্ণফুলী নদীর তলদেশে স্বপ্নের এ টানেলে ভিত্তিপ্রস্তর করেন। ওই ভিত্তিপ্রস্তরের পর ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের বোরিং কার্যক্রম উদ্বোধনের পর প্রকল্পে গতি পায়। এরই মধ্যে দুটি টিউবের নির্মাণকাজসহ পুরো প্রকল্পের অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ। প্রকল্পে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। নির্মাণ ব্যয় ও ডলারের দাম বাড়ার কারণে প্রকল্পে ব্যয় আরো বেড়েছে বলে জানা গেছে।