হালাল পণ্যের বিশ্ববাজার ধরতে চায় বাংলাদেশ

মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি অমুসলিম দেশগুলোতেও হালাল পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বিপুল সম্ভাবনাময় বৈশ্বিক এই বাজার ধরতে চায় বাংলাদেশি কম্পানিগুলোও। সেই লক্ষ্যে হালাল সনদ দিচ্ছে দেশে বিভিন্ন পণ্যের মান যাচাই ও সনদ দেওয়া একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)।

জানা যায়, দেশে এখন পর্যন্ত তিনটি কম্পানি ২০টি পণ্যের হালাল সনদ অর্জন করতে পেরেছে।

সনদ পাওয়ার অপেক্ষায় আছে আরো ১২টি পণ্য। সাধারণত প্রক্রিয়াজাত দ্রব্য, প্রসাধনসামগ্রী, ওষুধ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া বা সেবার জন্য হালাল সনদ দেওয়া হয়।
হালাল সনদ পাওয়া তিনটি কম্পানি শরিয়াহভিত্তিক উপায়ে ‘হালাল’ পণ্যের প্রস্তুত ও বাজারজাত করছে। কম্পানিগুলো হলো অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ড্যানিশ ফুড লিমিটেড, কোকোলা ফুড প্রডাক্টস লিমিটেড।

হালাল সনদ নেওয়া সবচেয়ে বেশি পণ্য প্রস্তুত করছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ। কম্পানিটি বিস্কুট, চকোলেট, ওয়েফার বিস্কুট, টফি, লজেন্স, প্লেন কেক, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও চিপস প্রস্তুত করছে। এ ছাড়া ড্যানিশ ফুড তৈরি করছে বিস্কুট, হলুদ ও মরিচের গুঁড়া, ধনে ও জিরার গুঁড়া, মাছ ও মাংসের মসলার গুঁড়া, বিরিয়ানির মসলার গুঁড়া ও আমের জুস। আর কোকোলা ফুড প্রডাক্টস তৈরি করছে সাধারণ নুডলস ও ইনস্ট্যান্ট নুডলস।

ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদিত পণ্যের গায়ে যেসব উপদান লেখা থাকে তার মধ্যে যদি ইসলামে নিষিদ্ধ কোনো কিছু মেশানো হয়, তবেই সেই পণ্যকে হারাম বলা যাবে। তার আগে ওই সব পণ্যকে হারাম বলা যাবে না।

এ বিষয়ে রাজধানীর বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের প্রধান মুফতি এনামুল হাসান বলেন, ‘শরাব, শূকরের মাংসসহ যেগুলো ইসলামে নিষেধ করা আছে, সেগুলো মিশিয়ে প্রস্তুত করা হলে সেগুলো হারাম হবে। হালাল প্রাণী যদি শরিয়াহ পদ্ধতিতে জবাই করা না হয়, সেটাও হারাম পণ্য। এ ছাড়া বাকি যা আছে বেশির ভাগই হালাল পণ্য। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হালাল খাদ্য খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। নিরাপদ হওয়ায় শুধু মুসলিম নয়, অমুসলিমদের মধ্যেও এই খাবার খাওয়ার হার বাড়ছে। দুগ্ধজাতীয় পণ্য, সাবান, কসমেটিকস, ওষুধের ক্ষেত্রে বিরাট একটা মার্কেট আছে; কিন্তু আমরা সেটা ধরতে পারছি না। ’

বিএসটিআই থেকে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরে শুরু দিকে হালাল সনদ দেওয়া শুরু হয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির ১৫ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। কোনো কম্পানি সনদের জন্য আবেদন করলে হালাল লিটারেটর টিম ওই কম্পানির কারখানায় একাধিকবার পরিদর্শন করে। পরে বিএসটিআইয়ের ল্যাবে পণ্যের নমুনা নিয়ে ডিএনএ টেস্ট করে দেখা হয় হারাম কোনো উপাদান আছে কি না। এরপর ১৫ সদস্যের ওই কমিটির সামনে ভিডিও চিত্রসহ উপস্থাপন করা হয়। পরে কমিটির কোনো আপত্তি না থাকলে হালাল সনদ দেওয়া হয়। প্রতিটি পণ্যের জন্য ফি নেওয়া হয়, ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা, মাঝারি শিল্পে তিন হাজার টাকা আর বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে ফি পাঁচ হাজার টাকা।

হালাল সনদ দেওয়া নিয়ে বিএসটিআই মুখপাত্র ও ডেপুটি ডিরেক্টর মো. রেজাউল হক বলেন, ‘আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বর্তমান বিশ্বের অন্যান্য দেশেও হালাল পণ্যের চাহিদা অনেক বেশি। বিশ্ববাজারের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা হালাল সনদ দেওয়ার উদ্যোগ নিই। কারণ বিএসটিআইয়ের হালাল সনদ মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলো গ্রহণ করতে উৎসাহী। সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে আমাদের অবহিত করেছে যে হালাল সনদ দিচ্ছি কি না। আমরা আমাদের আইন সংশোধন করে চলতি বছরের শুরুর দিকে হালাল সনদ দেওয়া শুরু করি। ’ তিনি বলেন, ‘আরো তিন-চারটি কম্পানির ১২টি পণ্যের লাইসেন্স রেডি হয়ে আছে। যেকোনো সময় কমিটির মিটিং কল করে আমরা এগুলোর অনুমোদন দিয়ে দেব। তারপর তারা উৎপাদনে যেতে পারবে। ’

হালাল পণ্যের গুণগত মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি না থাকায় নিরাপদ খাদ্য হিসেবে শুধু মুসলিম দেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোতেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ২০২৪ সালের বিশ্বে এসব পণ্যের বাজার প্রায় ১০.৫১ ট্রিলিয়ন ডলার হবে।

দেশে তিন বছরের জন্য হালাল পণ্যের সনদ দেওয়া হয়। এরপর সনদ নবায়ন করতে হয় বলে জানান পার্টেক্স স্টার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ড্যানিশ ফুড লিমিটেডের ডিজিএম মো. হাবিবুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘যে পণ্যগুলো আমরা বানাই সেগুলো কিন্তু হালাল। এখন টুকটাক কিছু রপ্তানি করি। তার মধ্যে কিছু কিছু দেশ হালাল পণ্যের সনদ দেখতে চায়, কী উপাদান দিয়ে উৎপাদন করা হয়। বিশেষ করে মালয়েশিয়া এই সনদ দেখতে চায়। মূলত রপ্তানি করার জন্য এটা নেওয়া। ’