খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন জরুরী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণদের নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে অনাবাদি জমিজমা চাষ করে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কৃষি কাজে দেশের শিক্ষিত যুব সমাজকে কাজে লাগানো গেলে কৃষিপণ্যের মান উন্নত হবে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং ভোক্তারা পাবেন নিরাপদ খাদ্যপণ্য। দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে সারা বছর ব্যবহার করা যায়। চাহিদা অনুযায়ী দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে পারলে শিক্ষিত যুব সমাজ কাজ করার সুযোগ পাবে।

অপরদিকে কৃষিপণ্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। দেশ অর্থনৈতিকভাবে হবে লাভবান। বিগত করোনাকালেও যুবলীগ কর্মীরা শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে কৃষকের ধান কেটে দিয়েছে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। যুবলীগের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এ ঘোষণা দিলেও মূলত দেশের সকল দেশপ্রেমিক যুবকের উদ্দেশেই এ আহ্বান রেখেছেন তিনি। চীন, জাপান, ভারত এবং উন্নত দেশে কৃষিবিদদের আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে চাষাবাদ করতে দেখা যায়। আমাদের দেশে এই চিত্র একেবারেই উল্টো।

বাংলাদেশে বর্তমানে ১০টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৪ বছর মেয়াদি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কৃষি ডিপ্লোমা কোর্স চালু আছে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করে বের হচ্ছে। ছোট্ট একটি দেশে এত বিপুল সংখ্যক কৃষিবিদের সরকারি চাকরির তেমন ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের মাটি খুবই উর্বর। এখানে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন করা যায়, যা পৃথিবীতে খুবই বিরল।

কিন্তু মান্ধাতার আমলের সেই কৃষি ব্যবস্থা এখনো দেশে বিদ্যমান। কৃষকরাও আধুনিক শিক্ষায় তেমন শিক্ষিত নন। এমতাবস্থায় এসব শিক্ষিত তরুণ কৃষিবিদ তাদের লব্ধজ্ঞান কৃষি কাজে প্রয়োগ করলে শস্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও খাদ্য রপ্তানি করার সুযোগ হবে।

যুব সমাজই দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। তাদের মেধা, সৃজনশীলতা, সাহস ও প্রতিভাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিম-ল। তারা অনেক বেশি সৃজনশীল, সমাজের সবচেয়ে কর্মক্ষম অংশ, খুব আত্মবিশ্বাসী এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক। তাই জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার, নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী যুব সমাজের জাতীয় স্তরে সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। পরিবর্তনের জন্য যে শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োজন তা একমাত্র যুবশক্তিই সরবরাহ করতে পারে। দুনিয়ার যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে তরুণ সম্প্রদায়। যুবকগণ তাদের সাহসী আচরণ দিয়ে সমাজ পরিবর্তন করতে পারে।

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তরুণদের শক্তি, অবদান এবং আত্মত্যাগ ভোলার মতো নয়। শিক্ষিত যুবকদের কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে খাদ্যে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে বিপ্লব ঘটবে। উন্নত বীজ ও আধুনিক পদ্ধতিতে জমি চাষ ও ফসল ফলানোর কাজে গ্রামে অবস্থানরত বয়োবৃদ্ধ কৃষকদের পরামর্শ দিতে পারে তারা।

জমিতে সময়মতো সার প্রয়োগ, সেচ দেওয়া, আবহাওয়া সম্পর্কে অবহিত করা ইত্যাদি কল্যাণমুখী কাজে কৃষকদের তারা পরামর্শ দিতে পারে, ফসল বেচাকেনা এবং বাজারজাতকরণে ভূমিকা রাখতে পারে, কৃষকের কাছ থেকে প্রকৃত মূল্যে ফসল কিনে সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ এবং সরবরাহের কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে। বর্তমানে মৎস্যচাষ এবং হাঁস-মুরগি পালন খুবই লাভজনক একটি ব্যবসা। সামান্য পুঁজি নিয়ে শুরু করা যায় এই কাজ। একটু পরিশ্রমী হলে নিজে তো বটেই, আশপাশের অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। এক্ষেত্রে সরকার তাদের আর্থিক সহযোগিতা করতে পারে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে আইওটি (ওঙঞ- ওহঃবৎহবঃ ড়ভ ঞযরহমং), যেখানে সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ইন্টারনেট ও স্মার্ট ডিভাইস দিয়ে গ্রামগঞ্জে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে এখনই নজর দিতে হবে। যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য এটি একটি বিশাল সম্ভাবনা। গ্রামে অবস্থানরত শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা এই ব্যবসার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে নিজ উদ্যোগে কিংবা সরকারের কাছ থেকে স্বল্পসুদে ঋণ নিয়ে।

সরকারকেও এ ব্যাপারে সহজ শর্তে এবং সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ঘরে বসেই এসব শিক্ষিত তরুণ-তরুণী আইওটির মাধ্যমে মৎস্যচাষ, বাগান ও শস্য পরিচর্যা ইত্যাদি পরিচালিত করতে পারবে। এসব কাজের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে উপযুক্ত কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তারা আর কখনই শহরমুখী হবে না। গ্রামেই কৃষি জমিতে ফসল উৎপাদনে মনোনিবেশ করবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাসস্থানের ভিত রচনা করবে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে এসব তরুণ পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশে যাওয়ার পরিবর্তে হবে কৃষিমুখী।

করোনায় সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ব্যবসা-বাণিজ্যে, কাজকর্মে ধস নেমেছিল। অনেকেই কর্মহারা হলেও কৃষক ছিলেন বরাবরের মতো ফসল ফলাতে ব্যস্ত। ফলে এত মন্দার পরও বাংলাদেশের মানুষ না খেয়ে থাকেনি। ভাত, মাছ, সবজি, তরি-তরকারি অর্থাৎ সকল কৃষিপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। প্রশ্ন আসে, এই অবদান কার? কৃতজ্ঞচিত্তে বলতেই হবে এই অবদান বাংলাদেশের কৃষকের। দুর্দিনে তারাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল খাইয়ে-পরিয়ে। সচল রেখেছিল গ্রামীণ অর্থনীতি।

অথচ তারা বোঝে না অর্থনীতি, সমাজনীতি কিংবা রাজনীতি। তারা বোঝে শুধু কাজ আর কাজ। তারা গ্রামে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। শহরমুখী হওয়ার ইচ্ছেও তাদের নেই। এই নীরব ও অবহেলিত কৃষকদের আর অবহেলা নয়, এখনই নজর দিতে হবে তাদের কল্যাণের দিকে। কিভাবে? প্রকৃত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে তাদের প্রণোদনা কিংবা মাসিক হারে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। ঘরে অবস্থানরত বৃদ্ধ দাদা-দাদি, মা-চাচি সকলে বাড়ির আঙ্গিনার আশপাশে শাক-সবজি, ফলমূল ইত্যাদি আবাদ করতে পারেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। এখানেও সরকার তাদের প্রণোদনা দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে।

সাধারণ ও নি¤œ আয়ের অনেক মানুষ কর্ম হারিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন করোনাকালীন। অনেকেই নিজের জমিতে এবং গৃহের আশপাশে পরিত্যক্ত জমিতে চাষবাস করছেন এবং ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য করে এখনো গ্রামে আছেন। জাতিসংঘের মতে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের যুবক বলা হয়। বাংলাদেশে এই হিসাব ১৮ থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি।

দেশের উন্নয়নে জনসংখ্যার এই বিশাল অংশটি ভূমিকা রাখলে সোনার বাংলা গড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে মোট ভূমির পরিমাণ ৩ কোটি ৬৪ লাখ ৬৫ হাজার একর। এর মধ্যে ২ কোটি ৮১ হাজার একর জমিতে চাষাবাদ হয়। এছাড়া প্রায় ৬ লাখ ৭১ হাজার একর বা ৬ কোটি ৭১ লাখ শতক জমি আবাদযোগ্য হওয়ার পরও চাষাবাদের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে না, যা মোট ভূমির প্রায় ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

এই অংশটুকুই চাষাবাদ করার জন্য যুবকদের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কৃষি মানেই এখন শিক্ষিত, প্রাণচঞ্চল, সাহসী, উদ্যমী টগবগে যুবক-যুবতীর কর্মস্থল। তাদের পদচারণায় মুখর বাংলাদেশের কৃষি। দেশ আজ ফুলে-ফসলে পরিপূর্ণ, চারদিকে চাল, ডাল, সবজি ও ফলের ছড়াছড়ি, দেশ আজ খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবুও কোভিড-১৯ মহামারীর দুটি ঢেউয়ের পর এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব আরেকটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার জন্য যতটুকু সম্ভব খাদ্য উৎপাদনে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রতি ইঞ্চি জমি ব্যবহারে সচেষ্ট থাকতে হবে সবাইকে।

লেখক : ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার
অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়