চলতি মৌসুমে ৫২ লাখ লিটার গুড় হবে যশোরে

কার্তিকের শেষ সময়ে যশোরের একটি অঞ্চলে শুরু হয়েছে খেজুরগাছ কাটা। যদিও শীত এখনও জেঁকে বসেনি; তবু গাছিরা অল্প অল্প গাছ কেটেছেন। আহরণ করছেন রস, চাই-কী সেই রস জ্বালিয়ে গুড় কিংবা পাটালিও তৈরি করছেন তারা।

যশোর কৃষি বিভাগ বলছে, যশোরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ খেজুরগাছ ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে। আহরণ করা হচ্ছে রস।

যশোর সদরের লেবুতলা ইউনিয়নের তেজরোল গ্রামের মিজানুর রহমান প্রায় ১৫ বছর ধরে গাছ কেটে আসছেন। মৌসুমে রস আর তৈরি করা গুড় ও পাটালি বিক্রিই মূলত তার আয়ের একটি প্রধান অংশ। বংশপরম্পরায় তিনি এই পেশার সঙ্গে রয়েছেন। বাড়ির খাওয়ার পাশাপাশি স্বজনদের প্রদানও হয়ে থাকে এই রস আর গুড়। তিনি বলেন, ‘এ বছর মোট একশটি গাছ কাটবো। তার মধ্যে আমার নিজের ৬০টি আর প্রতিবেশীদের ৪০টি। প্রতিবেশীদের রসের অর্ধেক দিতে হয়।’

মিজানুর রহমান জানান, এখন অনেকেই আর গাছ কাটার কাজে আসতে চান না। অনেক কষ্ট, কিন্তু উপার্জন খুব কম। তা ছাড়া জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুড়-পাটালির দাম বেশি না হলে পোষায় না।

তার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ছয় লিটার রস জ্বালিয়ে এক লিটার গুড় পাওয়া যায়। এক ঠিলে (ভাড়) গুড় বানাতে ১০ ঠিলে রস লাগে। গুড় তৈরি করতে রসের পেছনে প্রায় সারাদিন কেটে যায়। গাছ কাটো, ঠিলে বাঁধো, রস নামাও, সেগুলো জ্বাল দাও– তারপরই গুড়-পাটালির হিসাব। গাছ কেটে এবার যে বাগলো (খেজুর গাছের পাতা) আর ঘরে যে পাটকাঠি রয়েছে, তাতে প্রায় দুই মাসের মতো চলবে। এরপর জ্বালানি কিনে রস জ্বাল দেওয়া লাগবে। সেই কারণে খরচও বাড়বে।

তিনি বলেন, ‘গত বছর গুড় তিনশ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ আর পাটালি বিক্রি করেছি চারশ’ থেকে সাড়ে চারশ’ টাকা কেজি। এবার দুর্মূল্যের বাজারে কেজিতে একশ থেকে দেড়শ’ টাকা না বাড়ালে হাতে কিছুই থাকবে না।’

একই এলাকার পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘শীত বাড়তে বাড়তে আমার গাছের সংখ্যাও বাড়বে। আজ (রবিবার) ২৮টি গাছ কাটবো। নিজের ও স্বজনদের মিলিয়ে মোট একশর কাছাকাছি গাছ রয়েছে। এখন বেশি রস হচ্ছে না; শীত বাড়লে রসও বাড়বে।’

তেজরোল এলাকার চাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে এখন আর গাছ কাটতে পারিনে। অন্যকে দিয়েছি। সেখান থেকেই রস আর নিজেদের জন্যে কিছুটা গুড় তৈরি করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘৮০-র দশকে আমাদের এলাকায় অনেকেই গাছ কাটতো। সেই সময় কখনোই ভাবিনি, গুড়ে ভেজাল দিতে হবে। আমার কাছ থেকে অনেকেই গুড়-পাটালি নিয়ে দেশের ভেতর তো বটেই, দেশের বাইরেও পাঠিয়েছে। এখন অনেক গাছিই গুড়ে চিনি দেয়; খাঁটি গুড়-পাটালি খুব কম লোকই করে।’

কৃষক ইসমাইল লস্কর এবার ৬৫টি গাছ লিজ নিয়েছেন। নিজের আছে ২০টি। লিজের গাছ থেকে আহরণ করা রসের অর্ধেক দিতে হয় মালিককে। তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে যারা গুড়-পাটালি কিনতে আসেন, তারা চান পাটালি যেন শক্ত হয়। সে কারণে পাটালিতে কেউ কেউ চিনি মেশান।’

অপর কৃষক ওসমান লস্কর বলেন, ‘৩০-৩৫ বছর গাছ কাটি। আজও চার কেজি পাটালি তৈরি করেছি।’ এই অঞ্চলে তার একটা সুনাম আছে; তিনি কখনোই পাটালিতে চিনি মেশান না।

ওসমান বলেন, ‘এই অঞ্চলের (খাজুরা) গুড়-পাটালির একটা ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু কিছু অসৎ মানুষের কারণে সেই সুনাম নষ্ট হচ্ছে। ২০ বছর আগেও আমরা খাজুরার হাটে পাটালি নিয়ে গেছি বাঁশের ডালায়। পাটালি থেকে রস ঝরে পড়তো ডালার নিচে। খাঁটি পাটালি একটু নরম হয়।’

স্থানীয়রা জানান, পাশের একটি গ্রামের কিছু মানুষ গুড়-পাটালি তৈরি করেন খেজুরের রস ছাড়াই। তারা বাজার থেকে মুচি (আখের গুড়ের গোল্লা/মালা), চিনি, রঙ আর পানি জ্বালিয়ে তাতে পাটালির একটি ফ্লেভার ব্যবহার করেন।  তারাই খুব কম দামে ‘খেজুরের পাটালি’ নাম দিয়ে সেগুলো বাজারে বিক্রি করে। ওই পাটালি খুব শক্ত হয়।

জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (ক্রপ) মো. আবু তালহা বলেন, ‘যশোরে ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৫৫টি খেজুর গাছ আছে। তার মধ্যে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫৫টি গাছ থেকে খেজুরের রস আহরণ করা হয়। এর সঙ্গে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কৃষক সম্পৃক্ত। এখান থেকে প্রায় ৫২ লাখ ৪৯ হাজার লিটার গুড় উৎপাদন হয়; যার বাজারমূল্য প্রায় ৪২ কোটি টাকা।

তিনি জানান, যশোরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি খেজুরের রস ও গুড়ের ব্যবসাকে লাভজনক করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।