নীড় খাদ্য নিরাপত্তা সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর যত পদক্ষেপ

সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর যত পদক্ষেপ

সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর যত পদক্ষেপ

মহামারি করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় বিপর্যস্ত। সারা বিশ্বেই দেখা দিয়েছে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী (ডব্লিউএফপি) এরই মধ্যে সতর্ক করে বলেছে ২০২৩ সালে বিশ্বের ৪৫টি দেশে তীব্র খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ২০ কোটি মানুষের জন্য জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। এফএও এবং ডব্লিউএফপির যৌথ রিপোর্টে বলা হয়েছে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দুর্ভিক্ষের শঙ্কা প্রবল।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা যে যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সেখানে বলা হয়েছে— ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ এবং নানাবিধ সংঘাত খাদ্য ঘাটতির জন্য একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ডিজেল ও সার সংকটের ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। পৃথিবীতে যত মানুষ খাদ্য সংকটে ভুগছে তার মধ্যে ৬০ শতাংশ মানুষ বসবাস করেন যুদ্ধ ও সংঘাত কবলিত এলাকায়। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যুদ্ধের কারণে খাদ্য ঘাটতি কতটা খারাপ হতে পারে। এই যুদ্ধ চলতে থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

খাদ্য সংকটের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, জলবায়ু জনিত। পৃথিবীর অনেক দেশ হয়তো বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে নয়তো খরায় ভুগছে। এর ফলেও খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবার আশঙ্কা রয়েছে ব্যাপক। এর বাইরেও করোনাভাইরাস মহামারি বিশ্ব অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে সেটি এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে বিধায় এটিও খাদ্য ঘাটতির কারণ হতে পারে। এর ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে অনেকের জন্য খাদ্য কেনা কঠিন হয়ে যাচ্ছে বা যাবে।

সম্প্রতি আফ্রিকায় খরার কারণে খাদ্য উৎপাদন কমে গেছে। এতে দুর্ভিক্ষের মত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও সার সংকটের কারণে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় চলতি বছর চার লাখ টন কম হতে পারে বলে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার ধারণা। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে চলতি বছর ধানের উৎপাদন হতে পারে পাঁচ কোটি ৬৪ লাখ টন, যা গত বছর ছিল পাঁচ কোটি ৬৮ লাখ টন। তবে গমের উৎপাদন এক লাখ টন বৃদ্ধি পেয়ে ১২ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর দফতর সূত্র জানিয়েছে, এসবের প্রভাবে বিশ্ব আগামী বছর ‘দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার জন্য বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বক্তৃতা করেছেন। বাংলাদেশে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সেজন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে দেশবাসীকে সব কিছুতেই সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, বিদ্যুৎ ব্যবহার, পানি ব্যবহার, খাদ্য ব্যবহার প্রত্যেকটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাই যেন সাশ্রয়ী হয়।

গত বুধবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর শাহবাগে বিসিএস প্রশাসন অ্যাকাডেমিতে একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমেরিকা, ইউরোপ, ইংল্যান্ডসহ প্রত্যেকটা দেশ এখন অর্থনৈতিক মন্দার কবলে। বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না, খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে, সেখানে সব জায়গায় রেশনিং করা হয়েছে। এমন একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি বহু আগে থেকেই এটা বলে যাচ্ছি যে এক ইঞ্চি জমিও যেন খালি না থাকে। কারণ, আমাদের নিজের খাদ্য নিজেদেরই উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার জন্য শিল্পায়ন দরকার এবং দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তাদের রিপোর্টে বলেছে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সারের ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন রিলেশন্স কমিটির সামনে এক বক্তব্যে ডব্লিউএফপি নির্বাহী পরিচালক জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে এবং এর একটি বড় কারণ হবে রাশিয়া ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ এবং সারের সংকট।

এটা এমন এক ধরনের সংকট হতে যাচ্ছে যা আমরা জীবদ্দশায় দেখিনি—বলেন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর প্রধান।

এমন পরিস্থিতিতে সারের সংকট যাতে দেশে কোনও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে সেজন্য বিশ্বের যেখান থেকে হোক সার কিনে আনার জন্য কৃষিমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অতিরিক্ত দামেই সার কেনার সকল ব্যবস্থা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ভর্তুকির পরিমাণও বাড়িয়েছে সরকার। যেখানে কৃষিতে ভর্তুকি বাবদ বছরে ৮ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হতো, সেখানে খাদ্য সংকট এড়াতে এবছর কৃষিতে ৪৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, কোনও অবস্থায়ই খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত করা ঠিক হবে না। ভর্তুকির এই টাকা যোগাড় করতেই হবে।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশে দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে সাশ্রয়ীমূল্যে দেশের এক কোটি পরিবারকে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ- টিসিবির পণ্য সরবরাহের উদ্যোগ শতভাগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের পাঁচ কোটি মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। একইসঙ্গে ১৫ টাকা এবং ৩০ টাকা কেজি দরে চাল ও ১৮ টাকা কেজি দরে আটা বিক্রির কার্যক্রমও চলছে। সরকার মনে করে সরকারের এসব কর্মসূচি যে কোনও ধরনের খাদ্য সংকট মোকাবিলায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব মতে, দেশে বছরে চালের চাহিদা মোটামুটি তিন কোটি ৫০ লাখ টন। আটার চাহিদা বছরে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন। চালের প্রায় শতভাগ এবং গমের ১০ শতাংশের মত দেশীয় জোগান থেকে আসে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনও কারণে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হলে তখন চাল আমদানি করতে হয়। এমন অবস্থায় সংকট এড়াতে এবছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছর সরকার ১২ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এসব চাল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যে কোনও ধরনের খাদ্য সংকট এড়াতে চাল আমদানিতে সরকার প্রথমে শুল্ক ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করেছিল। তবে ভারতের বাজারে দাম বেশি হওয়ায় দেশীয় আমদানিকারকরা আমদানিতে সুবিধা করতে না পারায় শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে আরও কমিয়ে তা ১৫ শতাংশ করা হয়। এসব সুবিধার ফলে আমদানিকৃত চাল দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এসেছে বলেও জানিয়েছে সূত্র।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সংগ্রহ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সর্বোচ্চ ৩৬ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়েছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছর আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চাল আমদানি করা হয়েছিল ৪ হাজার টন। আর গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল সাড়ে ১৩ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছর তা আবার কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৯ লাখ টনে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সর্বশেষ ২ নভেম্বর-২০২২ পর্যন্ত সরকারি গুদামে মোট ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮৫ টন খাদ্যের মজুত আছে। এর মধ্যে চাল ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫ টন, গম দুই লাখ ৫ হাজার ৬৭৫ টন আর ধান ১৪ হাজার ৯৭৯ টন। চলতি আমন মৌসুমে মোট ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ হয়েছে। আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে করা হয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ মেট্রিক টন। ইতিমধ্যেই আমন ফসল কৃষকের গোলায় উঠতে শুরু করেছে। ১০ নভেম্বর থেকে সরকার আমন কেনা শুরু করবে। চলতি আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে প্রতি কেজি আমন চাল ৪২ টাকা ও আমন ধান ২৮ টাকা দরে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এবছর পাঁচ লাখ টন চাল ও তিন লাখ টন আমন ধান সংগ্রহ করা হবে। এ বছর পাঁচ লাখ টন চাল ও তিন লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশে এবার বৃষ্টিপাত কম হয়েছে, এতে আমন ধানের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তা কাটিয়ে ওঠা গেছে। আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ও তা কতটা হবে সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ মাঠ থেকে সব আমন ফসলে ওঠেনি। অন্যদিকে বিশ্ববাজারেও খাদ্যের সংকট আছে। এই দুই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

তবে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দেশে চাল-আটাসহ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও সেটা খাদ্যাভাবে গড়ানোর মত পরিস্থিতি এখনও হয়নি। খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে আগামী বছর থেকে সারাদেশের কৃষিজমিকে ব্লকে ভাগ করে চাষাবাদ তদারকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।