চালে এখন বিশ্বে তৃতীয় বাংলাদেশ

আমনের উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বাড়ায় বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার আমনের দর নির্ধারণী সভায় বলা হয়েছে, এবারে গত বছরের চেয়ে ১৩ লাখ টন আমন বেশি হবে; যা উৎপাদিত মোট চালের সঙ্গে যোগ হলে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়াকে টপকে যাবে।

চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় দাবি করলেও জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (ফাও) ওয়েবসাইটে ইন্দোনেশিয়াকেই তৃতীয় বৃহত্তম দেশ দেখানো হচ্ছে। ফাওয়ের গতকাল ১ নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২৯ দশমিক ৬০ শতাংশ চাল উৎপাদন করে চীন। ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ উৎপাদন করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশ উভয় দেশই ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ করে চাল উৎপাদন করলেও ইন্দোনেশিয়াকেই তৃতীয় দেখাচ্ছে ফাও। একই পরিমাণ উৎপাদন করে বাংলাদেশ চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ইন্দোনেশিয়া ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এ কারণে সমান সমান উৎপাদন করলেও বাংলাদেশকে চতুর্থ দেখাচ্ছে সংস্থাটি। তবে এবারের আমন মৌসুমে চাল উৎপাদন ১৩ লাখ টন বেশি হলে ইন্দোনেশিয়াকে টপকে যাবে বাংলাদেশ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছরই বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ফাও ইন্দোনেশিয়াকেই তৃতীয় দেখাচ্ছে। যা-ই হোক, এবারে ১ লাখ টন বেশি হলেও বাংলাদেশ অফিশিয়ালি ইন্দোনেশিয়াকে টপকে যাবে।

আমনের দর নির্ধারণী সভা শেষে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘চাল উৎপাদনে তৃতীয় হওয়া সত্যি বিস্ময়কর। জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবেই বলছে চাল উৎপাদনে আমরা এগিয়েছি দারুণভাবে।’

উৎপাদনের হিসাবে দেশে বোরো ধানই সবচেয়ে বড় ফসল। প্রতি বছর এ মৌসুমে প্রায় দুই কোটি টন চাল উৎপাদন হয়। বোরো বড় ফসল হলেও এর উৎপাদন ব্যয় আমনের তুলনায় অনেক বেশি। বোরোর পরই রয়েছে আমনের অবস্থান। এ বছর শ্রাবণ মাসে এক দিন বৃষ্টি হয়েছে; যা নিয়ে কৃষকদের পাশাপাশি সরকারও খুবই উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিল। বৃষ্টির অভাবে সময়মতো আমন রোপণ করতে পারেননি কৃষক। বিষয়টি মন্ত্রিসভা বৈঠকে তোলা হলে সরকার সেচ দিয়ে আমন রোপণের সিদ্ধান্ত নেয়। দেশে বিদ্যুৎসংকট থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া হয় সেচ পাম্পে। শেষ পর্যন্ত রোপণ করা হলেও আসে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। তবে যেসব জেলায় ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছে, সেসব জেলায় খুব একটা আমন হয় না। তারপরও ৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির আমন ফসল নষ্ট হয়েছে।

সরকারিভাবে আমন ধান ও চাল সংগ্রহের জন্য গতকাল দর নির্ধারণী সভায় কৃষিমন্ত্রী রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেছেন, আমন হলো ফটোসেনথেটিক (সালোকসংশ্লেষী)। দিন ছোট হয়ে এলে আমন ধানে ফুল এসে যায়, ফুল এলেই উৎপাদন কমে যায়। ধান বড় হতে পারে না। কিন্তু একদম শেষ দিকে কৃষকরা সেচ দিয়ে নানাভাবে আমন চাষ করেছেন। বিল বা নিচু জমিতে আমন হয় না। এবার নিচুজমি শুকিয়ে যাওয়ায় সেসব জমিতেও আমন হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত আমনের ভালো ফলন হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঘাটতি হবে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, যে ধানগুলো একটু পরিপক্ব হয়েছিল, সেগুলো কিছুটা পড়ে গেছে। আর দক্ষিণাঞ্চলে ধানটা দিনাজপুর ও নওগাঁর চেয়ে এক মাস পরে লাগানো হয়। কাজেই মনে হয় না খুব একটা ক্ষতি হয়েছে।

খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট (এফপিএমইউ) দেশে খাদ্যের পর্যাপ্ততা নিয়ে গবেষণা করে। একই সঙ্গে আমদানির সুবিধার জন্য সারা বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে। এ ইউনিটই খাদ্য নিয়ে সরকারকে পরামর্শ দেয়। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের কমিটি হচ্ছে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি (এফপিএমসি)। অর্থমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রীসহ আট মন্ত্রী এ কমিটির সদস্য। এই কমিটির গতকালের বৈঠকের কার্যপত্র তৈরি করেছে এফপিএমইউ, যেখানে বলা হয়েছে, এ বছর ১ কোটি ৬৩ লাখ টন আমন উৎপাদন হবে; যা গত বছরের চেয়ে ১৩ লাখ টন বেশি। গত ছয় বছরের আমনের উৎপদন বৃদ্ধির হার পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রতি বছরই কিছু না কিছু উৎপাদন বেড়েছে। ২০১৬-১৭ সালের তুলনায় পরের বছর উৎপাদন বেড়েছে ৩ লাখ টন। আগের বছরের তুলনায় ২০১৮-১৯ সালে উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ টন। ২০১৯-২০ সালে ১ লাখ, ২০২০-২১ সালে ২ লাখ টন উৎপাদন বেড়েছে বলে জানায় এফপিএমসি। গত বছর আমন হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টন।

প্রতি বছর দেশের কৃষিজমি কমছেএ অবস্থায় চালের উৎপাদন বাড়ছে কীভাবে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ধানের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন হচ্ছে। অব্যবহৃত জমি সেচের আওতায় আসছে। নিরবচ্ছিন্ন সেচ দেওয়া হচ্ছে। রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে। সবকিছু মিলে আগামী দিনে ধানের উৎপাদন আরও বাড়বে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ উইং জানিয়েছে, প্রতি বছরই কৃষির উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আমনের উৎপাদন খরচও ঊর্ধ্বমুখী। চলতি বছর প্রতি কেজি আমন চাল উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৪১ টাকা ৫৮ পয়সা; যা গত বছরের তুলনায় ৫৮ পয়সা বেশি। গত সাত বছরে আমন চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রতি কেজিতে ১২ টাকা ৫৮ পয়সা।

খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয়ভাবেই চাল ও গমের আমদানি কমেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেসরকারিভাবে গম এসেছে ৬০ লাখ টন। পরের বছর ২০২০-২১ অর্থবছরে তা ছিল প্রায় ৪৯ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে বেসরকারিভাবে গম এসেছে ৩৪ লাখ ৬৬ হাজার টন। চলতি (২০২২-২৩) অর্থবছরের প্রথম চার মাস, অর্থাৎ জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গম এসেছে মাত্র ৩ লাখ ৫৭ হাজার টন। গত তিন বছরে বেসরকারিভাবে চালও এসেছে খুব কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বেসরকারিভাবে চাল এসেছে মাত্র ১ লাখ ৬১ হাজার টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে যা ছিল ৩ লাখ ৪ হাজার টন।

সরকারিভাবে গম আমদানিতেও প্রভাব পড়েছে। গত চার মাসে সরকারিভাবে গম এসেছে ২ লাখ ১৩ হাজার টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে যা ছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার টন।

চলতি আমন মৌসুমে ধানের দাম কেজিতে ১ টাকা এবং চালের দাম ২ টাকা বাড়িয়ে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। গতকালের পরিধারণ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার সরকারিভাবে সারা দেশের কৃষক ও চালকল মালিকদের কাছ থেকে ৩ লাখ টন ধান ও ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল কেনা হবে। গত আমন মৌসুমে ২৭ টাকা কেজি দরে ধান এবং ৪০ টাকা কেজি দরে চাল সংগ্রহ করেছিল সরকার।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, সরকার দেশের ভেতর থেকে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্র ঠিক করলেও বিদেশ থেকেও চাল আমদানি করা হবে। কয়েকটি দেশের সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। সব কিছু ঠিক থাকলে জি টু জির (সরকার থেকে সরকার) আওতায় চাল আমদানি করা হবে।