বঙ্গবন্ধু রেল সেতুর ৪৬ শতাংশ কাজ শেষ

বাংলাদেশ রেলওয়ের মেগা প্রকল্প বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুর নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। যমুনা নদীর ওপর দিয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের ফলে ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পর এবার রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা হচ্ছে। বদলে যাবে রেলওয়ের পশিচমাঞ্চলের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। যমুনার ওপর রেল সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে একদিকে যেমন গোটা দেশ রেল যোগাযোগের একটি নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হবে। অপরদিকে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ খাতে সড়ক পথের পাশাপাশি রেল যোগাযোগে আমূল পরিবর্তন হবে, খুলবে অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই রেল সেতু চালু হলে ট্রেন চলবে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার বেগে। ট্রেনের সংখ্যা ৩৮ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৮৮টিতে, সমান্তরালভাবে বাড়বে যাত্রী সংখ্যাও। পণ্য পরিবহনে নতুন মাত্রা যোগ হবে। যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে সময়ও কমবে। ইতোমধ্যে সেতুর চারটি স্প্যান দৃশ্যমান হয়েছে।

আরও একটি স্প্যানের সরঞ্জামাদি পিয়ারের ওপর সংযোজন করা হচ্ছে। চারটি স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে সেতুর ৪৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ৫০টি পিলারের ওপর ৪৯টি স্প্যানে তৈরি হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় ডুয়েল গেজ ডাবল ট্র্যাকের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু। ৫০টি পিলারের মধ্যে ৩৬টি পিলারের কাজ বিভিন্ন মাত্রায় কমবেশি এগিয়ে চলেছে। সেতুর পূর্ব পাশে ইতোমধ্যে ১১ পিলারের কাজ সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হওয়া পিলারগুলোর ওপর স্প্যান বসানোর কাজ করছেন দেশী বিদেশী প্রকৌশলীরা। ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা বিশেষ ধরনের বড় বড় স্টিলের পাটাতন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে স্প্যানগুলো। এটি তৈরি করা হয়েছে ওয়েদার স্টিল দিয়ে। দেশের রেল সেতুতে এ ধরনের স্টিল ব্যবহার এই প্রথম। এই রেল সেতু বাস্তবায়িত হলে আমদানি-রপ্তানি খরচ কমে যাওয়াসহ বঙ্গবন্ধু সেতু ও মহাসড়কের ওপর চাপ কমবে। এতে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগের গতি বাড়বে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বঙ্গবন্ধু সেতুর ৩শ মিটার উজানে ৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েল গেজ ডাবল ট্র্যাকসহ এ রেল সেতুর সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে যমুনার দুই প্রান্তে দুটি ভাগে কাজ হচ্ছে। টাঙ্গাইল প্রান্তে ২৭ পিলার এবং সিরাজগঞ্জ প্রান্তে ২৩ পিলারসহ ৫০ পিলারের নির্মাণ কাজ দেশী, বিদেশী প্রকৌশলী আর কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে চলছে। ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর মধ্য দিয়ে ঢাকার সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ চালু হয়। তবে ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতুতে ফাটল দেখা দেয়ায় ট্রেনের গতি কমিয়ে দেয়া হয়। এতে ট্রেন চলাচলে সময়ক্ষেপণসহ সিডিউল বিপর্যয়ে যাত্রীরা প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়েন। এরপরই বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আসে। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর ওই সেতু নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এই রেল সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে থাকবে নতুন স্টেশন ভবন, ইয়ার্ড রিমডেলিং ও রেলওয়ে সেতু মিউজিয়াম। সিরাজগঞ্জে কন্টেনার ইয়ার্ড স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্প সূত্র জানায়, যমুনা ইকোপার্কের পাশ দিয়ে বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম অংশের রেলপথের সঙ্গে যুক্ত হবে শেখ মুজিব রেল সেতু। সেতুর দুপাশে দশমিক ৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট (উড়াল সেতু), ৭ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার রেলওয়ে অ্যাপ্রোচ সড়ক (সংযোগ বাঁধ) নির্মাণ করা হচ্ছে। লুপ, সাইডিংসহ মোট ৩০ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি তিনটি স্টেশন বিল্ডিং, তিনটি প্ল্যাটফর্ম ও শেড, তিনটি লেভেল ক্রসিং গেট ও ছয়টি কালভার্ট নির্মাণ করার পরিকল্পন রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জাপানি কোম্পানি ওরিয়েন্টাল কনসালট্যান্ট গ্লোবাল কোম্পানি লিমিটেডসহ যৌথভাবে কয়েকটি কোম্পানি প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

রেল সেতুটি নির্মাণ শেষ হলে আন্তঃদেশীয়যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি চলাচল করতে পারবে। এতে আমদানি-রপ্তানি খরচ কমে যাওয়াসহ বঙ্গবন্ধু সেতু ও মহাসড়কের ওপর চাপ কমবে। রেল সেতুটি নির্মিত হলে বঙ্গবন্ধু সেতুর ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গ থেকে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হবে, কমবে পরিবহন খরচ যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। রেল বিভাগের তথ্য মতে, ডুয়েল গেজ ডাবল-ট্র্যাকের এ সেতুটি হবে দেশের সবচেয়ে বড় রেল সেতু অর্থাৎ মেগা প্রকল্প। এটি রাজধানীর সঙ্গে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ ও উন্নত করবে। এছাড়া ট্রেন সিডিউল বিপর্যয় কমাতেও এ সেতু সহায়তা করবে বলে রেল কর্তৃপক্ষ মনে করছেন।

বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩৮টি ট্রেন ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার গতিতে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে পারাপার হওয়ায় সময় অপচয়ের পাশাপাশি সিডিউল বিপর্যয়ে বাড়ছে যাত্রী ভোগান্তি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে ট্রেন চলবে ৮৮টি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী। ওই সেতুর অনুমোদিত নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি ৭ লাখ টাকা। উদ্বোধনের আগে নির্মাণ খরচ বেড়ে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)১২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে, বাকি ৪ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু সেতু ও রেল সেতুর পশ্চিমেই গড়ে উঠছে সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন ও বিসিক শিল্প পার্ক। এখানে উত্তর জনপদের ৭ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ইতোমধ্যে এসব অঞ্চলে শিল্প কারখানা স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশী-বিদেশী শিল্পোদ্যোক্তারা। বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মাণ হলে এই শিল্পাঞ্চল থেকে রেলপথ, সড়কপথ, স্থলপথ ব্যবহার করে বিশ্বের যে কোনো দেশে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গে উৎপাদিত কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী পরিবহনও সহজ হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী মহল। এতে এই জনপদের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের অপার সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ইউসুফ সূর্য জানান, দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষার রেল সেতু নির্মাণ হতে চলেছে। এই সেতু নির্মাণ হলে সড়কপথ, স্থলপথ ব্যবহার করে বিশ্বের যে কোনো দেশে পণ্য পরিবহন সহজ হবে। এ সেতুর মাধ্যমে যাত্রী সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যেরও দ্রুত প্রসার ঘটবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সিরাজগঞ্জ সদর ও কামারখন্দ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত মুন্না বলেন, সিরাজগঞ্জবাসীর প্রতিক্ষার ফল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেল সেতু। দীর্ঘ অন্দোলন সংগ্রাম করে আমাদের সোনার বাংলায় পেয়েছি দেশের দীর্ঘতম রেল সেতু।

সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট কেএম হোসেন আলী হাসান বলেন- সিরাজগঞ্জ এক সময় রেলসিটি হিসেবে পরিচিতি ছিল। সেই হৃত গৌরব ফিরছে রেলওয়ে সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধু সেতু ও রেল সেতুর পশ্চিমেই গড়ে উঠছে সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন ও বিসিক শিল্প পার্ক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবু ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান জানান, যমুনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেল সেতু নির্মাণ কাজ চলছে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে। টাঙ্গাইল প্রান্তে ২৭ পিলার এবং সিরাজগঞ্জ প্রান্তে ২৩ পিলার নির্মাণে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। অবিরাম গতিতে দেশী-বিদেশী প্রকৌশলী এবং সহযোগীরা কাজ করছেন। এ পর্যন্ত প্রকল্প এলাকায় ৪৯টি স্প্যান পৌঁছেছে। ৫০টি পিলারের ওপর ৪৯টি স্প্যান বসানো হবে। ইতোমধ্যেই ৪টি স্প্যান প্রকল্প এলাকায় দৃশ্যমান হয়েছে। তবে তিনটি স্প্যান পরিপূর্ণভাবে বসানো হয়েছে। অপরটি পিলারের ওপর বসানো হলেও কাজ শেষ করতে কয়েকদিন সময় লাগবে। আরও একটি বসানোর প্রস্তুতি চলছে। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জ এবং টাঙ্গাইল প্রান্তে এক যোগে এই রেল সেতুর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ইতোমধ্যে এ রেল সেতুর ৪৬ শতাংশেরও বেশি কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৯ জুলাই থেকে টাঙ্গাইল প্রান্তে রেল সেতুর প্রথম স্প্যানটি বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। সেতুর ওপর স্প্যান স্থাপন এখন দিনের আলোর মতো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আমরা দ্রুত গতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। জাপান এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে রেল সেতু প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করছে জাইকা।