খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রত্যয়

মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর শীর্ষে থাকা খাদ্য উৎপাদনে আমরা কতটা সফলতা অর্জন করতে পেরেছি, তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে শর্করা (চাল, গম, আলু), আমিষ (মাছ, মাংস, ডিম, ডাল), স্নেহ পদার্থ (ভোজ্যতেল, দুগ্ধজাতীয় খাবার), মিনারেলস (শাক-সবজি), মসলা (পেঁয়াজ, রসুন, আদা) এবং পানীয় (চা, কফি)। তবে এ দেশের কমবেশি ৯০ শতাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। শুধু তাই নয়, চাল দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। অতীতে কোনো সরকারই চায়নি এবং বর্তমান সরকারও চায় না দেশে চালের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিক এবং পণ্যটির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে যাক। স্বাধীনতা-পরবর্তী সব সরকারই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) থেকে সদ্যসমাপ্ত সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৫-২০), প্রেক্ষিত পরিকল্পনার (২০১০-২০) উদ্দেশ্যাবলি, বাস্তবায়ন কৌশল, গত পাঁচ দশকে বার্ষিক বাজেটে কৃষি খাতে অর্থ বরাদ্দ, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২১-২৫) এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১) পর্যালোচনা করলে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। খাদ্য উৎপাদন নিয়ে আলোচনায় প্রথমে আসে আমাদের প্রধান খাদ্য চালের বিষয়টি। স্বাধীনতা লাভের সময় দেশে চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল কমবেশি ১ কোটি টন, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার টনে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২১)। অর্থাৎ স্বাধীনতাকালীন দেশের সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যা দ্বিগুণের কিছুটা বেশি বৃদ্ধি পেলেও চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ। তবে চাল উৎপাদনে দেশ এখন পর্যন্ত স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারেনি। চাহিদা মেটাতে প্রায় প্রতিবছর আমাদের কিছু পরিমাণ চাল আমদানি করতে হয়। চাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনে সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. অনেক দেশের তুলনায় চালের কম উৎপাদনশীলতা; খ. কৃষি জমির প্রাপ্যতা হ্রাস; গ. হাওড়াঞ্চলে অকাল বন্যায় বোরো ধানের ক্ষতিসহ প্রলয়ঙ্করী বন্যায় সারাদেশে আমন ফসলের মারাত্মক ক্ষতি; ঘ. খরা; ঙ. পোকার আক্রমণ ইত্যাদি। খাদ্যশস্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গমের উৎপাদন মোটেই সন্তোষজনক নয়। সরকারি তথ্য মোতাবেক ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে দেশে গমের উৎপাদন দাঁড়িয়েছিল ১৯ লাখ ৮ হাজার টন। আর এখন তা বহুলাংশে কমে গেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২১-এর তথ্যে জানা যায়, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে গমের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১০ লাখ ৯৯ হাজার, ১১ লাখ ৪৮ হাজার এবং ১২ লাখ ৪৬ হাজার টন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব হ্রাস, গম ফসলে মারাত্মক ক্লাস্ট রোগের আক্রমণ ইত্যাদি কারণে একরপ্রতি উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়ায় গম চাষে কৃষকের কিছুটা অনীহার কারণে দেশে গমের উৎপাদন কমেছে।

চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের পরিমাণ পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে আসায় দেশ গমে প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। আরেকটি শর্করা জাতীয় খাদ্য আলু উৎপাদনে দেশ স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে তা রপ্তানি করছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত অর্থবছরে দেশে ১ কোটি টনের বেশি উন্নতমানের আলু উৎপাদিত হয়েছে, যখন দেশে পণ্যটির চাহিদা ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। সবজি উৎপাদনে দেশ স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। এফএওর তথ্য মতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। এফএও এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) সূত্রের বরাত দিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক সবজি খাওয়ার পরিমাণ ছিল ৪২ গ্রাম, যা গত বছরে দাঁড়িয়েছে ৭০ গ্রামে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে সবজি বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। আমিষের প্রধান উৎস মাছ উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২১-এ বলা হয়েছে, বিশ্বে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান এবং চাষকৃত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১১তম। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক শূন্য ৩ লাখ টনে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দেশে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯ লাখ ৯৫ হাজার টন। এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য, বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম এবং তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ ও এশিয়ার মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। মাছ ও মৎস্যজাতপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে।

সরকারি তথ্য মোতাবেক সপ্তম পরিকল্পনা মেয়াদকালে প্রাণিসম্পদে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। দেশ মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে এবং ডিম উৎপাদনে স্বনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাংস উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭০ লাখ ৫১ হাজার টনে; যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ৫০ লাখ ৮৬ হাজার টন। তবে দুধ উৎপাদনে আমরা অনেকটা পিছিয়ে আছি। ১ কোটি ৫০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুধ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০ লাখ ৯২ হাজার টনে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৭৪৮২.০৭ মিলিয়ন পিস ডিমের চাহিদার বিপরীতে এর উৎপাদন দাঁড়ায় ১৭১০৯.৭০ মিলিয়ন পিসে। প্রাণিসম্পদে উন্নতি হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উল্লেখ্য, দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদনশীলতা ও মূল্য সংযোজনের টেকসই প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। দেশে যেসব খাদ্যপণ্যের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ডাল, ভোজ্যতেল, দুধ, চিনি, ফল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২০-২১ লাখ টন। এর বিপরীতে দেশে তেলজাতীয় শস্য উৎপাদন হচ্ছে ১০-১১ লাখ টন। এখান থেকে ভোজ্যতেল পাওয়া যায় ৪ থেকে ৫ লাখ টন। ফলে, ঘাটতি থাকছে ১৪-১৫ লাখ টন। দেশে বছরে ডালের ২৫-২৬ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ৮-৯ লাখ টন। দেশে বছরে চিনির ১৪-১৫ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কমবেশি ১ লাখ টন। খাদ্যে মসলা হিসাবে ব্যবহারের সঙ্গে বীজ উৎপাদন, মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত ও ওষুধ শিল্পে পেঁয়াজের ব্যবহার যোগ করলে দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক মোট চাহিদা প্রায় ২২ লাখ টন। এর বিপরীতে কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২০-এর তথ্য মতে, ২০২০ সালে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল ১৯ দশমিক ৫৪ লাখ টন। দেশে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টন আদার বার্ষিক চাহিদার বিপরীতে উৎপাদনের পরিমাণ কমবেশি দুই থেকে আড়াই লাখ টন। আর বছরে ছয় লাখ টনের ওপর রসুনের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কমবেশি পাঁচ লাখ টন। আমদানির মাধ্যমে এসব খাদ্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে হয়।

দেশ প্রধান খাদ্যশস্য চাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতার অনেকটা নিকটবর্তী হলেও পণ্যটি উৎপাদনে এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি। দ্বিতীয় খাদ্যশস্য গমে দেশ মূলত আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মাছ ও মাংস উৎপাদনে স্বনির্ভর হলেও দেশের চাহিদা মেটাতে দুধ ও ডিম আমদানি করতে হচ্ছে। দেশের চাহিদা মেটাতে ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ ও রসুনসহ মসলাজাতীয় খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। তাই খাদ্য উৎপাদনে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের সার্বিক খাদ্য উৎপাদনে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে সচেতন থাকতে হবে। খাদ্য উৎপাদনে সঠিক তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নীতিনির্ধারক ও পরিকল্পনাবিদরা সঠিক কার্যক্রম গ্রহণে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আসুন খাদ্যশস্যসহ খাদ্যের অন্য যেসব উপাদানে আমাদের উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় কম, সেগুলোতে উৎপাদন বাড়িয়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রত্যয় ব্যক্ত করি।

লেখক : ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোঃ লিঃ