ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা মারবে ব্যাক্টেরিয়া ‘ওলব্যাকিয়া’

কীটনাশক, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, চিরুনি অভিযান, ড্রোন, গাপ্পি মাছের দাওয়াই চলছে, তবুও নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু। এবার ডেঙ্গু সংক্রমণে দায়ী এডিস মশা মারতে নতুন করে ব্যাক্টেরিয়ার দারস্থ হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ‘ওলব্যাকিয়া’ নামের এই ব্যাকটেরিয়া পুরুষ এডিস মশার শরীরে প্রবেশ করিয়ে বন্ধ্যাকরণের মাধ্যমে ডেঙ্গুর নিয়ন্ত্রণ করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।

দেশে ডেঙ্গুরোগ নির্মূল কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশেষ ধরনের এ ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে মশার বংশ বিস্তার সহজেই রোধ করা যাবে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান। তিনি বলেন, ওলব্যাকিয়া ব্যাকটেরিয়া পরিবেশের কোনো ধরনের ক্ষতি ছাড়াই মশার লার্ভা ধ্বংস করবে। এই ব্যাকটেরিয়া প্রথমে পুরুষ মশার শরীরে প্রবেশ করানো হবে। পরে স্বাভাবিক নিয়মে পুরুষ মশার শরীর থেকে সেটা চলে যাবে স্ত্রী মশার শরীরে। জৈবিক প্রক্রিয়ায় এই ব্যাকটেরিয়া চলে যাবে লার্ভায়। লার্ভাকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম এই ব্যাকটেরিয়া। এমনকি মৃত লার্ভাকে যদি সুস্থ ও জীবিত লার্ভা খেয়ে ফেলে তবে সেটিও আক্রান্ত হবে এবং এক পর্যায়ে মারা যাবে।

এছাড়া এডিস মশার ডিমের উপর এই ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করলে ওই ডিম থেকে যে লার্ভা বের হবে তা পরিপক্ক হয়ে কাউকে কামড়ালে তার ডেঙ্গু হবে না। এভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লার্ভার জীবনচক্র ধ্বংস হবে। ডেঙ্গু নিধনে ব্যাকটেরিয়া ‘ওলব্যাকিয়া’ প্রকল্পটি আনা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। খুব শিগগিরই এই প্রকল্প নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করা হবে। ওলব্যাকিয়া ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগে এডিস নিধন কার্যক্রমে সফলতা আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন জোবায়দুর রহমান।

জানা গেছে, ‘ওলব্যাকিয়া’ একটি সাধারণ, নিরীহ ও নিরাপদ ব্যাকটেরিয়া। যা সব ধরনের পোকামাকড়ে ৬০ শতাংশ পাওয়া যায়। কিন্তু এটি এডিস (পুুরো নাম এডিস ইজিপ্টি) মশায় তা পাওয়া যায় না। এডিস মশাকে ওলব্যাকিয়া দেয়া হলে তা তাদের ডেঙ্গুর ভাইরাস সংক্রমণে বাধা দেয়। ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঠেকাতে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে মানুষকে আক্রমণকারী মশাবাহিত ভাইরাস প্রতিরোধে ওলব্যাকিয়া ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করছেন। বিশ্বের ১৭টি দেশে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে অস্ট্রেলিয়া ও চীন। বাংলাদেশেও এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা চলছে।

ওলব্যাকিয়া ব্যাকটেরিয়া মূলত দুই ভাবে মশার দেহে কাজ করে- ভাইরাসের বিরুদ্ধে মশার শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ায় এবং ভাইরাস বৃদ্ধি ব্যাহত করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ প্রক্রিয়াটি প্রাকৃতিক, সাশ্রয়ী এবং টেকসই। ওলব্যাকিয়া ছাড়াও স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) বা মশা বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতি প্রয়োগ করে কোনো কোনো দেশে এডিস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় গামা রশ্মি ব্যবহার করে পুরুষ এডিস মশাকে বন্ধ্যা করা হয়। এরপর এ মশা স্বাভাবিক মশার তুলনায় ১০ গুণ বেশি ছেড়ে স্ত্রী মশার সঙ্গে প্রজনন ঘটানো হয়। সেই স্ত্রী এডিস মশা ডিম পাড়লে সেই ডিম থেকে আর লার্ভা জন্মায় না।

গত জুন মাসে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ওলব্যাকিয়াবাহী মশা ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭ শতাংশ কমিয়েছে। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা ৮৬ শতাংশ কমেছে। এখন ওয়ার্ল্ড মসকিউটো প্রোগ্রাম শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া, ফিজিসহ বিশ্বের যেসব দেশের শহরগুলোয় ডেঙ্গু একটি হুমকি, সেখানে এই প্রচেষ্টা স¤প্রসারিত করার জন্য কাজ করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ওলব্যাকিয়া’ প্রকল্প বাংলাদেশের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে খুব একটা কাজে আসবে না। মাঠের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া হঠাৎ করে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে মশা মারার পরিকল্পনা অমূলক। জানতে চাইলে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ব্যাকটেরিয়া দিয়ে মশা মারার প্রকল্পে সফলতা আসবে না। কারণ এর আগেও ‘ওলব্যাকিয়া এবং এসআইটি’- এই দুটি পদ্ধতি ব্যাবহার করে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। দুটি পদ্ধতিই ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের দেশে ডেঙ্গুর যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে এসব পদ্ধতি প্রয়োগ সময়োপযোগী নয়। কারণ বাংলাদেশের মতো এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এসব পদ্ধতি কার্যকর হলেও শতকরা ১০ ভাগের বেশি সফলতা আসবে না। মাত্র ১০ শতাংশ কার্যকরের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে এই প্রকল্প হাতে নেয়ার আগে প্রথমে অল্প পরিমাণে ব্যবহারের মাধ্যমে পরীক্ষমূলক সফলতা দেখে আনুষ্ঠানিক প্রয়োগের চিন্তা করা উচিত।

২০১৯ সালে ‘ওলব্যাকিয়া’ ব্যাকটেরিয়া দিয়ে মশা বন্ধাকরণের মাধ্যমে ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার হাতে নেয় সিটি করপোরেশন। ঢাকার কাছে সাভারে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে পুরুষ এডিস মশাকে বন্ধ্যা করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে একটি গবেষণা সম্পন্ন করেন সংশ্লিষ্টরা। এ কাজের কার্যকারিতা বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি খতিয়ে দেখতে জেনেভার এক বিশেষজ্ঞ দল এ দেশে আসে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা পরমাণু শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে সেখানকার গবেষকদের সঙ্গেও আলোচনা করেন। তাদের মতে, (এসআইটি) বা বন্ধ্যাকরণ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। কিন্তু বাংলাদেশে এ মুহূর্তে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বন্ধ্যাকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ প্রক্রিয়ায় সফলতা পাওয়া সম্ভব।

চলতি বছরের শুরু থেকেই অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, কীটনাশক ছিটানো, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, চিরুনি অভিযান, মশা গিলতে নালা-নর্দমায় গাপ্পি মাছের চাষ, ইন্ট্রিগেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু, প্রচারণামূলক সভা-সমাবেশ, পোস্টার-র‌্যালি কর্মসূচি, সর্বোপরি মশার অস্তিত্ব খুঁজতে ড্রোনের মাধ্যমে জরিপ করার পাশাপাশি আধুনিক সব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। তবে এত আয়োজনের পরও কেন নিয়ন্ত্রণহীন ডেঙ্গু? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজছে নগরবাসী। অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চেষ্টার কমতি নেই- দাবি করে সিটি করপোরেশন বলছে, জনগণ সচেতন না হলে সন্তোষজনক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।