যেন স্বপ্নের বাস্তব রূপ

পদ্মা সেতুর মতো দেশবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন দেশের বৃহত্তম পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত রেল সার্ভিস

বাংলাদেশের জনগণের স্বপ্ন ছিল পদ্মা নদীরও সেতু নির্মাণ করা। বর্তমান সরকারের উদ্যোগে, বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ পদক্ষেপে পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। পদ্মা সেতুর মতো দেশের মানুষ বিশেষ করে চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন দেশের বৃহত্তম পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালু করা। যদিও ১৯২৯-৩০ সালের দিকে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার বার্মার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে রেল সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বার্মা পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালু করা সম্ভব হয়নি। শুধু চট্টগ্রাম শহর থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালু হয়েছিল। তারপর অনেক সময় কেটে গেছে। ব্রিটিশ শাসনের পর পাকিস্তানি শাসক এলো। পাকিস্তানি শাসন আমলে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালু করার বেশ কয়েক বার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সব উদ্যোগই ব্যর্থ হয়। তারপর দেশ স্বাধীন হলে এ পর্যন্ত বহু সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু কোনো সরকার কক্সবাজার পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিতে পারেনি। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে বার্মার সঙ্গে রেল সার্ভিস চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

আন্তঃএশিয়া রেলপথের আওতায় এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ইতিমধ্যে কক্সবাজার রেলপথের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ২০১৬ সাল থেকে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। ডুয়েল গেজের রেলপথের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছেন বর্তমানে যে গতিতে কাজ চলছে এতে আগামী দুই-এক বছরের মধ্যে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল সার্ভিস চালু করা সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে রেলপথের কাজের পাশাপাশি রেল স্টেশন, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণকাজ চলছে। কক্সবাজারে নির্মিত হচ্ছে এশিয়ার মধ্যে সর্বাধুনিক রেল স্টেশন। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়—কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথের মধ্যে ৩৯টি ব্রিজ, ১৪৪টি কালভার্ট, ১৮৩টি পানি চলাচলের পথ রয়েছে। বর্তমানে এই প্রকল্পে ৩ হাজার ৫০০ শ্রমিক কর্মরত আছেন। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেল পথ চালু হলে সমগ্র দক্ষিণ চট্টগ্রামের চেহারা পালটে যাবে। দেশের উল্লেখযোগ্য পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে সারা বছর ধরে পর্যটকদের আনাগোনা রয়েছে। বর্তমানে পর্যটকরা সড়কপথে যাতায়াত করছেন। সড়কপথে যাতায়াত করতে গিয়ে পর্যটকদের নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা সরাসরি বাসে করে কক্সবাজার আসছেন। বাসে যাতায়াত করতে পর্যটকদের অনেক সময় ব্যয় হয় এবং সড়কপথে যানজটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি বিমান সার্ভিস রয়েছে। যারা বিত্তবান, তারা বিমানে স্বল্প সময়ে বেশ আরামে কক্সবাজার পৌঁছে যাচ্ছেন। কক্সবাজার রেল সার্ভিস চালু হলে শুধু চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়া যাবে না, রাজধানী ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের কলকাতা থেকে সরাসরি রেল সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কক্সবাজার পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালুর ব্যাপারে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। এই রুটে সর্বাধুনিক মানসম্পন্ন দ্রুতগামী রেল সার্ভিস চালু করা হবে। পর্যটকদের দেওয়া হবে নানা সুযোগ-সুবিধা। আরামদায়ক, নিরাপদ এবং দ্রুতগামী রেল সার্ভিস হওয়ার কারণে পর্যটকরা রেল সার্ভিসকে প্রাধান্য দেবে। কক্সবাজার পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালু হলে কক্সবাজারের গুরুত্ব বহু গুণ বেড়ে যাবে। কক্সবাজার হবে এশিয়ার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র। শুধু তা-ই নয়, কক্সবাজারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যাবে। তখন পর্যটন খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় আসবে। তাছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের মত্স্যশিল্প, লবণশিল্প, বনজ শিল্পের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের দুর্ভোগের অবসান হবে। আন্তঃএশিয়া রেল সার্ভিস চালুর যে পরিকল্পনা রয়েছে, তাও বাস্তবায়ন হবে। কক্সবাজার পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের হলেও বর্তমান সরকার এর বাস্তব রূপ দিতে যাচ্ছে। অতীতে কোনো সরকার এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিতে সক্ষম হয়নি। সরকারের উদ্যোগে জনসাধারণ বেশ আনন্দিত। এই বৃহৎ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৫১২ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ সরকার। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক ১০৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার কথা, কোরিয়ার একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ সরকারের এই বৃহৎ প্রকল্পের কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ (সিআরইসি), টোমা গ্রুপ, চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন ও ম্যাক্স গ্রুপ।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ হবে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। সবুজ প্রান্তর, পাহাড় এবং গহিন বনের ভেতর দিয়ে রেল যাতায়াত করবে। পর্যটকরা রেলে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলকন করতে পারবেন। রেলের অভ্যন্তরে পর্যটকদের জন্য থাকবে সেবার সর্বোত্তম ব্যবস্থা। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের কাজ শেষ হতে আর বেশি সময় লাগবে না। তবে কালুরঘাট সেতুটি এখন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এই সেতুটি অনেক পুরোনো ও পরিত্যক্ত। এই সেতু দিয়ে দ্রুতগামী রেল চলাচল করতে পারবে না। এখানে দ্রুত নতুন রেলের ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। তবেই কক্সবাজার রেল সার্ভিস চালু করতে আর কোনো বাধা থাকবে না। আমরা কক্সবাজার রেলপথের সফল বাস্তবায়ন আশা করছি।

লেখক : আবুল কাসেম ভূঁইয়া, প্রাবন্ধিক