ভাঙ্গার আদলে করা হবে পঞ্চবটি মোড়

পঞ্চবটি-মুক্তারপুর দ্বিতল সড়কের সয়েল টেস্ট চলছে পুরোদমে। ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতল সড়কের ২৮৮ পয়েন্টে সয়েল টেস্ট হবে। এরইমধ্যে ৭২ পয়েন্টে সয়েল টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই এই সয়েল টেস্ট সম্পন্ন করা হবে জানিয়েছেন দায়িত্বশীলরা। প্রকল্পটির পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, মুন্সীগঞ্জ অংশে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর ৯০ শতাংশেরও বেশি জমি প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

অধিগ্রহণকৃত এলাকার স্থাপনাও অপসারণ করা হয়েছে। বাকি সব স্থাপনা রয়েছে, তাও শীঘ্রই অপসারণ করা হবে। এদিকে নারায়ণগঞ্জ অংশের অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে এখন। প্রকল্প পরিচালক জানান, সয়েল টেস্টের মধ্য দিয়েই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে। তবে সড়কের সব জমি ঠিকাদারকে হস্তান্তরের পরপরই পরবর্তী ধাপের কাজও শুরু হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ সেতু বিভাগের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত করার জন্যই প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রকল্প পরিচালক জানান। এদিকে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু গত ১১ অক্টোবর চালু হওয়ার পর পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়কের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। বেড়েছে যানবাহনের চাপ। তাই দ্রুত তা সামাল দিতেই সড়কটির আধুনিকায়ন কাজ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়ক প্রশস্ত ও দোতলাকরণ প্রকল্প বদলে দেবে মুন্সীগঞ্জের সড়ক নেটওয়ার্ক। পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়ক আধুনিকায়ন হলে যাতায়াতে সময় কমবে অর্ধেকের বেশি আর যানবাহনের গতি বাড়বে প্রায় ৫ গুণ। যানজট কমাতে ফরিদপুরের ভাঙ্গার আদলে করা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি মোড়।

পঞ্চবটি-মুক্তারপুর বর্তমান সরু সড়কের গড় প্রশস্ততা মাত্র সাড়ে ৫ মিটার। মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের প্রধান এই সড়কের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলছে। মুক্তারপুরে সিমেন্ট কারখানা, হিমাগারসহ ভারি ভারি শিল্প কারখানায় ২৪ থেকে ৫০ মেট্রিক টন ওজনের যান চলাচল করে। কিন্তু আঁকাবাঁকা সড়কে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

আর যানজট তো লেগেই থাকে। এ অবস্থায় পুরো সড়কের চেহারা বদলে দিতে নেওয়া হয়েছে আধুনিকায়ন প্রকল্প। ১০ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে ২ দশমিক ৮০৫ কিলোমিটার র‌্যামসহ দোতলা হবে ৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার।

পঞ্চবটিকে কেন্দ্র করে সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত হয়ে ৩১০ মিটার করে ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জ দুই দিকে প্রসারিত হবে। আর শীতলক্ষ্যা-৩ সেতু পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার পথ দোতলা হবে দুই লেনে। সঙ্গে পুরনো সড়কটিও প্রসারিত হয়ে উন্নীত হবে দুই লেনে।

আরেকটি গোলচত্বর হবে চর সৈয়দপুরের একেএম নাসিম ওসমান শীতলক্ষ্যা-৩ সেতু পয়েন্টে। এই গোল চত্বর থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার সড়ক হবে সরাসরি চার লেন। পাঁচটি ওজন স্কেল আর টোলপ্লাজা থাকবে চারটি।

প্রকল্পটির পরিচালক শফিকুল ইসলাম আরও জানান, ২ হাজার ২শ’ ৪২ কোটি ৭৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্যানডন ও সিএসআই তিন বছরের মধ্যে এর নির্মাণ কাজ শেষ করবে।

গেল ২৯ মার্চ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পরই পুরোদমে মূল কাজ শুরুর কথা রয়েছে। তিনি মনে করেন ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারির মধ্যেই মূল কাজ শুরু সম্ভব হবে। মূল কাজ অক্টোবরের মধ্যে শুরু কথা থাকলেও জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার কিছু চ্যালেঞ্জের কারণেই মূল কাজ শুরুর দুই মাস পিছিয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া মুন্সীগঞ্জ অংশের জমির পুরোপুরি দখল বুঝে নেওয়া এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের অংশের জমি অধিগ্রহণের চূড়ান্ত কাজ সমন্বয়সহ যাবতীয় কর্মকা- পরিচালনা করছে। আর চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির কাজ শুরুর যাবতীয় প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছে।

গতি বাড়বে ৫ গুণ ॥ পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়ক আধুনিকায়ন হলে যাতায়াতে সময় কমবে অর্ধেকের বেশি। আর যানবাহনের গতি বাড়বে প্রায় ৫ গুণ। প্রকল্প গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এই সড়ক ভ্রমণে সময় হ্রাস পাবে ৬২ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

আর যানবাহনগুলোর গতি বেড়ে যাবে ৪ দশমিক ৪৫ গুণ। তাই এই সড়ক ব্যবহারকারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে যেমন ঝামেলাহীন গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন আবার সময় কমে যাওয়ায় জ্বালানি অপচয়রোধ হবে। শিল্প-কারখানাগুলোর কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত সহজ হবে এবং ব্যয় কমে যাবে। তাই এই অঞ্চলের অর্থনীতি চাকা ঘুরবে বিশেষ গতিতে।

রাজধানীর চাপ কমবে ॥ পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়ক প্রশস্তকরণে রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমে যাবে। এই অঞ্চলের অনেকেই চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা পড়শোনার জন্য রাজধানী ঢাকায় বসবাস করছেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তারা নিজ এলাকায় বসবাস করেই রাজধানীতে অফিস করতে পারবেন।

স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা ছাড়াও গ্রামগুলোর গুরুত্ব বেড়ে যাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুন্সীগঞ্জ এবং আশপাশের কয়েক হাজার মানুষ এখন রাজধানীতে অবস্থান করছে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকার কারণে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে এখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন।

জমি লাগছে ৫৬ একর ॥ পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়ক প্রশস্তকরণে জমি প্রয়োজন ৫৬ দশমিক ৭৪৭৫ একর। তবে এরমধ্যে অধিগ্রহণ করতে হবে ৩৭ দশমিক ১১ একর। যার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলায় ২ দশমিক ৯৭ একর এবং নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৩৪ দশমিক ১৪ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন। এছাড়া সরকারি খাস সম্পত্তি রয়েছে ১৪ দশমকি ৮৫২৫ একর। মুন্সীগঞ্জ অংশের অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়ে গেছে।

৯০ শতাংশ জমির দখলও বুঝে নিয়েছে সেতু বিভাগ। তবে কিছু স্থাপনা অপসারণ নিয়ে শেষ পর্যায়ের শুনানি রয়েছে। তা শেষেই স্থাপনাগুলো জমি মালিকরা সরিয়ে নেবেন, না হয় জেলা প্রশাসন সরকারি বিধি মোতাবেক অপসারণ করবে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ অংশের অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।

টোল দিতে হবে দোতলায় ॥ পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়কের আধুনিকায়ন হলেও টোল দিতে হবে দোতলা সড়ক ব্যবহারে। নিচতলা সড়ক ব্যবহারে কোনো টোল নেই। পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়কে এখন প্রতিদিন যান চলাচল করছে ১৭ হাজার ৯১০টি। ট্রাফিক পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৩ সালে এই সংখ্যা হবে ২৩ হাজার ৯২০, এই সংখ্যা ২০২৫ সালে হবে ২৭ হাজার, ২০৩৩ সালে এই সড়কে চলবে ৩৯ হাজার যান আর ২০৪৩ সালে এই সড়কের যানবাহনের সংখ্যা হবে ৬৩ হাজার ৫৮০।

পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়ক আধুনিকায়নে সড়কটি দৈর্ঘ্য হবে ১০ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার। এরমধ্যে দোতলা সড়ক হবে ২ দশমিক ৮০৫ কিলোমিটার র‌্যাম্পসহ ৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার। যানজট নিরসনে পঞ্চবটি মোড় থেকে ফতুল্লার দিকে ও নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ার দিকে ৩১০ মিটার করে ছয় লেন সড়ক হবে।

পঞ্চবটি থেকে ৩য় শীতলক্ষ্যা সেতু পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার সড়ক হবে দোতলা। পঞ্চবটি হতে কাশিপুর পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার নিচ তলায় দুই লেন এবং দ্বিতীয় তলায় দুই লেন সড়ক থাকবে। আর কাশিপুর থেকে পাশের লো-লেনের ওপর দিয়ে ২ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার দ্বিতল সড়ক পৌঁছবে চরসৈয়দপুরের শীতলক্ষ্যা-৩ সেতুর গোল চত্বর পর্যন্ত। এই অংশে পুরনো সড়কটিও উন্নীত হবে দুই লেনে। তাই পুরো সড়কজুড়েই অন্তত চার লেন সুবিধা মিলবে।