ড্রাগন চাষে ঈশ্বরদীর কৃষিতে নতুন মাত্রা

পুষ্টি ও ওষুধি গুণ সমৃদ্ধ ড্রাগন ফল ঈশ্বরদীতে প্রথম চাষ শুরু করেন কৃষিতে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ঈশ্বরদীর কৃষক শাহজাহান আলী বাদশা (পেঁপে বাদশা)। প্রথমে শখের বশে অল্প জমিতে চাষ শুরু করলেও সাফল্য পেয়ে এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন। সফলতার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন অন্যদের। উপজেলার সলিমপুর ও মুলাডুলি ইউনিয়নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ড্রাগন ফল চাষ।

উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের বক্তারপুর গ্রামের বাসিন্দা পেঁপে বাদশা। সেখানেই তিনি ‘মা-মনি কৃষি খামার’ নামে কয়েক একর জমিতে গড়ে তুলেছেন কৃষি খামার। এই খামারে তিনি পেঁপে, আতাফল, গাজর, কলা, ফুলকফি, বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন ফল ও সবজির আবাদ করছেন ১০ বছর আগে পেঁপে বাদশা ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেন। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে এ ফলটির আবাদ ঈশ্বরদীতে বেড়েই চলেছে।

ঈশ্বরদী বাজারের ফলের দোকানে দোকানে বিভিন্ন ফলের সঙ্গে এ ফলটি এখন নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে। লাভজনক আর দিন দিন চাহিদা বাড়ায় কৃষকরা ঝুঁকছেন এ ফল চাষে। তবে শিগগিরই বড় পরিসরে জেলার বাইরেও ড্রাগন ফল বাজারজাত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ব্যাপারে শাহজাহান আলী বাদশা বলেন, ড্রাগন ফলটির প্রথম আবাদ শুরু হয় আফ্রিকা, ইউরোপের কিছু দেশে। এরপর ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড হয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই ফলটির চাষ সময় সাপেক্ষ। ১০ বছর আগে চারা সংগ্রহ করে পরিকল্পনা অনুযায়ী চাষ শুরু করি। বর্তমানে তিনি ১০ বিঘা জমিতে এ ফলটি চাষ করছেন।

পেঁপে বাদশা বলেন, প্রতিবিঘা জমিতে ১১০ থেকে ১২০টি চারা লাগানো যায়। আর একটি খুঁটিতে ৪-৫ গাছ লাগানো যায়। প্রতি খুঁটি থেকে মাসে ৪-৫ কেজি ফল পাওয়া যায়। একটি গাছ থেকে এই সুস্বাদু ফলটি মাসে দুইবার পাওয়া যায়। এটি লাভজনক ফল। ঈশ্বরদীসহ ঢাকা এবং দেশের অন্য জেলার ফল ব্যবসায়ীরা ড্রাগন ফল কিনে বাজারজাত করে থাকেন।

আরেক ড্রাগন ফল চাষি রকিবুল ইসলাম। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি এই দামি ফলটি আবাদ শুরু করেছেন। তিনি পাবনার খোদেজা হারুন জামিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। বাড়ি ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের শেখ পাড়া গ্রামে। এখানে পৌনে ৩ বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের আবাদ গড়ে তুলেছেন। তিনি এসএসসি পাস করার পর কৃষিতে ডিপ্লোমা ও পরে ব্যাচেলর অব এগ্রিকালচার এডুকেশন (বিএজিএড) সম্পন্ন করেন।

রকিবুল ইসলাম বলেন, আট মাসে আগে নিজের বাড়ির ছাদে দেশি কিছু ফলের গাছ লাগাই। পরে ইন্টারনেটে দেখে ড্রাগন ফল চাষে উদ্যোগী হই। তিনি বলেন, ৮ মাস আগে এক দাগে সোয়া দুই বিঘা ও ১২ কাটা পরিমাণ আরেক জমিতে চারা লাগিয়ে ড্রাগন ফলের আবাদ শুরু করা হয়। মোট ৩ বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের গাছের জন্য তিনি সিমেন্টের তৈরি পিলার বসিয়েছেন ৫৩৭টি। একেকটি পিলারে ৪-৫টা করে গাছ থাকে। এ হিসাবে ৫৩৭টি পিলারে গাছের সংখ্যা আড়াই থেকে ২ হাজার ৬০০টি। তিনি বলেন, চারা লাগানোর এক বছর পর থেকে ফল পাওয়া যায়। যদি চারা ভালো হয়, যতœ, পরিচর্যা ঠিকমত করা হয়, তাহলে এক বছরের আগেই ফল ধরা শুরু হয়। রকিবুল জানান, ১৩ জাতের ড্রাগন ফল আবাদ হয়ে থাকে। সুস্বাদু আর চাহিদা থাকায় তিনি লাল, সাদা, বেগুনি ও গোলাপি জাতের ড্রাগন ফলের চাষ করছেন। এগুলোর দামেরও তারতম্য রয়েছে।

প্রকারভেদ ও রং অনুযায়ী ১০০-৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়ে থাকে। তিনি জানান, তিন বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের চারা রোপণ থেকে শুরু করে অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ৬ লাখ টাকা। আবহাওয়া ও সার্বিক পরিস্থিতি ড্রাগন ফল চাষের অনুকূলে থাকে তাহলে আগামী বছরের এপ্রিল থেকে তার বাগানের পরিপূর্ণ ড্রাগন ফল বিক্রি শুরু করতে পারবেন। তিনি আশা করছেন আগামী বছরে ১০ লাখ টাকার উপরে এই ফল বিক্রি করে আয় করবেন।

এ ব্যাপারে ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মিতা সরকার বলেন, ড্রাগন বিদেশি ফল। বাণিজ্যিকভাবে বাগান করে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক কৃষক এ ফলটি আবাদ করছেন। ঈশ্বরদীতেও এ ফলটি আবাদ হচ্ছে। এটি লাভজনক একটি ফল। ঈশ্বরদীর চাষিরা এখন পুরনো গতানুগতিক কৃষির ওপর নির্ভরশীল না থেকে সময়ের প্রয়োজনে এবং চাহিদার কথা বিবেচনা করে ড্রাগন ফল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।