রেল নেটওয়ার্কে প্রথম যুক্ত হচ্ছে শেরপুর

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের জামালপুর ও শেরপুর জেলার মধ্যে নতুন রেললাইন করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। নতুন রেললাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিশদ নকশার বিষয়ে আলোচনা করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে রেলওয়ে। সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা করতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ব্যয় বাংলাদেশ সরকার বহন করবে বলে প্রস্তাবে বলা হয়েছে।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করার জন্য প্রাথমিকভাবে যে রুট নির্ধারণ করা হয়েছে তা পড়েছে জামালপুর ও শেরপুর জেলার মধ্যে। প্রস্তাবে নতুন যে রুটের কথা বলা হয়েছে তা হলো, জামালপুর-শেরপুর-বকশীগঞ্জ এবং জারিয়া ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত। এই লাইনটি যুক্ত হবে শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দর পর্যন্ত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলের জামালপুর পর্যন্ত বর্তমানে যে রেললাইন আছে সেটি মিটারগেজ এবং সিঙ্গেল লাইন অবস্থায় আছে। তবে নতুন যে রেললাইনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করার প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে সেখানে ডুয়েলগেজ রেললাইন করতে চায় রেল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে শেরপুর জেলায় রেললাইন নেই। এই রেললাইন হলে শেরপুর জেলাও রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে।

রেল মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশা এবং প্রকল্পের ওপর একটি সভা করেছে গতকাল সোমবার। সভায় প্রকল্পের মেয়াদকাল, সমীক্ষার সময়কাল, পরামর্শকের সংখ্যা, পরামর্শক ব্যয়, জনমাস, আউটসোর্সিং জনবলের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে রেলওয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সভায় অংশ নেয়া রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নতুন রেললাইনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করার জন্য রেলের পক্ষ থেকে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। সভায় দেখা হয়েছে, সমীক্ষার জন্য তারা যেসব বিষয় উপস্থাপন করেছে সেগুলো ঠিক আছে কি না । অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিছু মতামত দেয়া হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। সেগুলো সংশোধন করে পরবর্তীতে আবারও সমীক্ষা প্রস্তাব জমা দেবে। তবে প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার যে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে সেটার কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।’

এই প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ায় করে রেল মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। তারপর সেটার অনুমোদন পেলে পরামর্শক নিয়োগ দেয়া এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশার মূল কাজ শুরু হবে বলে জানা গেছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন ও পরিকল্পনা) মো. ইয়াসীন বলেন, ‘প্রকল্পটি খুবই প্রথমিক পর্যায়ে আছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশার প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। অনেক বিষয় যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত হবে।’

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হচ্ছে প্রস্তাবিত রুটটি প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামাজিকভাবে কার্যকর হবে কি না সেটি দেখার জন্য । তা ছাড়া জমি অধিগ্রহণ এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনা করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কেমন ব্যয় হবে এবং দরপত্র নথি প্রস্তুত-সংক্রান্ত কাজ করা হবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মধ্যে।

এই রেললাইন করার বিষয়ে রেলের সমীক্ষা প্রস্তাবে বলা হচ্ছে, জামালপুর-শেরপুরের অর্থনীতি প্রধানত কৃষিভিত্তিক। জামালপুর স্থানীয় ধান, আখ, পাট, তামাক ও সরিষার বাজারকেন্দ্র। এখানকার প্রধান রপ্তানি দ্রব্য হলো পাট, তামাক, সরিষা, চীনাবাদাম, চামড়া, ডিম, ডাল, পান এবং হস্তশিল্প। নকশিকাঁথা তৈরি করাও একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা। তা ছাড়া জামালপুরে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করছে বেজা। সে কারণে নতুন এই লাইনটি হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়, প্রস্তাবিত রেল নেটওয়ার্ক জামালপুর, শেরপুর এবং কুড়িগ্রামকে রেলপথের পাশাপাশি সীমান্ত স্থলবন্দরের সঙ্গেও যুক্ত করবে। এটি রপ্তানি উন্নয়নের জন্য দেশকে শিল্পায়ন করতে এবং স্থানীয় এলাকার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে বিদেশি এবং স্থানীয় বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করবে যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে পরিচালিত করবে।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘একটি প্রকল্প শুরুর আগে তার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের দেশে বেশির ভাগ প্রকল্পের এই কাজটি সঠিকভাবে হয় না । ফলে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে নানা সমস্যা দেখা দেয়। বেড়ে যায় প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, সমীক্ষার নামে অর্থও নষ্ট হচ্ছে। এগুলোর জন্য জবাবদিহি প্রয়োজন। তবে রেলওয়ে যে নতুন সমীক্ষা হাতে নিয়েছে সেটি যেন সঠিকভাবে করে। না হলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হবে।’