রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিশাল কর্মযজ্ঞ

বিশ্বে জ্বালানির বাজারসহ অন্যান্য খাতে সাম্প্রতিক তৈরি হওয়া অস্থিরতার অন্যতম কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। অথচ এই দুই প্রতিপক্ষ দেশের দক্ষ কর্মীদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে গড়ে উঠছে অন্যতম বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যার কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য দিন-রাত কাজ করে চলেছেন তারা। তারই ধারাবাহিকতায় আজ কেন্দ্রটিতে বসছে দ্বিতীয় ইউনিটের রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভ্যাসেল (পারমাণবিক চুল্লির মূল কাঠামো)। যাকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের হৃৎপিণ্ডও বলা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করবেন এর। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধের প্রভাব তো নয়ই বরং উৎসাহ আর উদ্দীপনার মধ্যেই চলছে এখানকার কাজ। ইতোমধ্যে এর প্রথম ইউনিটের ৭০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটেরও কাজ সম্পন্ন প্রায় ৪৮ শতাংশ। এরই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালের শুরুতে এর প্রথম ইউনিট এবং ২০২৫ সালের শুরুতে দ্বিতীয় ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।

দুই ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এমনকি যেহেতু জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার হবে তাই গ্যাসের চলমান সংকট অনেকাংশেই কাটবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এরই মধ্যে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাইলফলকও স্পর্শ করবে।
পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার পদ্মা নদী তীরবর্তী রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২৬০ একর জায়গার ওপর চলছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মযজ্ঞ। এর আবাসিক এলাকা রয়েছে আরও ৩২ একর।

প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, এর আগেই প্রথম ইউনিটে বসা রিঅ্যাক্টর ভ্যাসেল চলছে পুরোদমে। উদ্বোধনী উপলক্ষে দ্বিতীয় ইউনিট জুড়েও চলছে কর্মযজ্ঞ।
গত বছরের ১০ অক্টোবর এই প্রকল্পের প্রথম চুল্লির কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটার কাজ শেষ হলে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। আর দ্বিতীয় চুল্লির কাজ শেষ হলে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা রয়েছে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, একক প্রকল্প হিসেবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। আর এই অর্থের ৯০ শতাংশই রাশিয়ার ভিবি ব্যাংকের মাধ্যমে দেশটি ঋণ সহায়তা হিসেবে দিচ্ছে।

রাশিয়ায় তৈরি ভিভিআর-১২০০ মডেলের এই পারমাণবিক চুল্লির বর্জ্য রাশিয়া নিয়ে যাবে।
এই প্রকল্পের বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জিয়াউল আহসান জানান, এখন এই প্রকল্পে ২৬ হাজারের মতো লোক কাজ করছেন। বিদেশীদের মধ্যে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং কাজাখস্তানের ছয় হাজার লোক কাজ করছেন। রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি পাঁচ হাজার।

বাকিরা স্থানীয়। এদের পেমেন্ট আমরা দেই না। আমরা এক একটি মাইলস্টোনের কাজ শেষে সার্টিফিকেট দেই। পেমেন্ট করে রুশ কর্তৃপক্ষ। আমাদের কাজ পূর্ণ গতিতেই চলছে। আমাদের সুপারভিশনেই কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশের যারা প্রকল্পের কাজ করছেন তাদের মধ্যে প্রায় চারশ জন রাশিয়ায় প্রশিক্ষণে আছেন।

মঙ্গলবার প্রকল্প এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, আগামী বছর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম দেশে আসবে। ফলে আগামী বছরের ডিসেম্বর থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট উৎপাদন শুরু করতে পারবে।

এ সময় ইয়াসেফ ওসমান বলেন, চুল্লি স্থাপনের মাধ্যমে কত শতাংশ কাজ এগোলো সেটা ওইভাবে হিসাব করে বলা যায় না। কারণ আমাদের অনেকগুলো কাজ আছে। সেগুলো শেষ হওয়ার পর একটা রিপোর্ট দিতে হয়।

সেই রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত আমরা পেমেন্ট করতে পারি না। যার মধ্যে অনেক কাজ ফিজিক্যালি হয়ে গেলেও হিসাবের মধ্যে আনতে পারিনি। তার জন্য আমরা দুটো হিসাব করি। একটি হচ্ছে ফিন্যান্সিয়াল, আরেকটি হচ্ছে ফিজিক্যাল। ফিজিক্যাল প্রোগ্রেস অনেকদূর এগিয়ে গেছে। যেই সময়ের মধ্যে আমরা কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছি। সেটি ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে কাজ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাজেও শতভাগ স্বচ্ছতা রক্ষা করা যায়। আমার জানা মতে, শতভাগ স্বচ্ছতার মধ্যে দিয়ে এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি আমরা সময়মতো শেষ করতে পারব ইনশাআল্লাহ। এই ধরনের প্রকল্পে খুব বেশি কিছু বলা যায় না। কারণ এখানে অনেক ধরনের সিকিউরিটি ইস্যু আছে। আমাদের দেশের সেনাবাহিনী কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

কবে উৎপাদন শুরু হবে- জানতে চাইলে মন্ত্রী আরও বলেন, আমি একটা কথা বলে রাখি। আমি তৈরি হলেই তো হবে না। আমি তো এখানে বিদ্যুৎ বিক্রি করব। কিন্তু যারা কিনবে তাদের কথা তো বলতে পারব না।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চালু হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে আমরা রেডি। আগামী বছরের মধ্যেই আমাদের প্রথম জ্বালানি আসবে।

এ সময় প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর বলেন, কাল আমাদের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের দ্বিতীয় ইউনিটের যে কন্সট্রাকশন সেটার কাজ শুরু করব। এরপর স্টার্টআপ, তারপর কমিশনিং শুরু করব। এরপর আমরা জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করবো। এই কমিশনিংয়ের কাজ ২০২৩ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়ার কথা। আর গ্রিডে যাবে ২০২৪ সালে। দ্বিতীয় ইউনিট গ্রিডে যাবে ২০২৫ সালে।

আমাদের কোনও চ্যালেঞ্জ নেই। এখানে প্রকল্প এলাকার ৩০০ মিটারের পর থেকে জনগণ বসবাস করতে পারবে।

এই প্রকল্পে রাশিয়ার অর্থায়ন, ডিজাইন ও কারিগরি সহায়তায় ভিভিআর-১২০০ মডেলের দুটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন হবে। ২০১৭ সালে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এর পর থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। প্রথম ইউনিটের চুল্লি স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ার এক বছরের মাথায় দ্বিতীয় ইউনিটের চুল্লি স্থাপন শুরু হচ্ছে। যা পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য একটি বড় অর্জন বলে মনে করছেন রূপপুর প্রকল্পের কর্মকর্তারা।

জানা যায়, প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের ভৌত ও অবকাঠামোগত কাজ প্রায় ৭০ ভাগ শেষ।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন নাটোরের লালপুরের ছেলে উচ্চ মাধ্যমিক পাস আব্দুর রহমান। গত ছয় মাস যাবত এখানে কাজ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে চাকরি হওয়ার আগে রিক্সা চালাতাম। আমাদের গ্রামের একজনের মাধ্যমে চাকরিটা হয়। তারপর বদলে যায় আমাদের পরিবারের ভাগ্য। শুধু আমার নয়। আমাদের গ্রামের আরও ২ থেকে আড়াইশ ছেলে এখানে কাজ করে নিজেদের ভাগ্য বদল করেছে।

আরেক শ্রমিক সজল বলেন, এই চাকরিটা না হলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হতো। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমাদের কপাল খুলে দিয়েছে।

শুধু আব্দুর রহিম নন, একই অবস্থা এই প্রকল্পে কর্মরত প্রায় সব শ্রমিকের। এটি একটি শুধু প্রকল্প নয় যেন রূপপূরের রূপকথার রাজ্যে পরিণত হওয়ার গল্প।