জনমিতিক ভিত্তিতে উন্নয়নের প্রকৃষ্ট সময়

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

কবি হেলাল হাফিজের অসাধারণ দুটি কবিতার লাইন। কবিতার নাম ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’। কবি হেলাল হাফিজের দ্রোহের শব্দমালায় দৃপ্তভাবে উচ্চারিত হয়েছে যৌবনের আহ্বান। এটি সকলের কথা। চিন্তা, চেতনা, উচ্চারণ ও প্রকাশে দ্রোহ ও বিদ্রোহ না থাকলে যৌবনের এ কথা বিস্ফোরণের ন্যায় প্রকাশিত হয় না। ব্যক্তির জীবনে যেমন যৌবন শ্রেষ্ঠ সময়, দেশের জন্যও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ যৌবনকাল আসে।

সময়কালটা হচ্ছে তরুণ ও কর্মক্ষম লোকের আধিক্য। বাংলাদেশ এখন এ সময়টা পার করছে। বলতে গেলে অনেকটা পথই পার করে এসেছে। যৌবনকাল যেমন একবার অতিক্রান্ত হলে আর কখনোই আসে না, দেশের তরুণ ও কর্মক্ষম লোকের আধিক্য তেমনি একটা পর্যায়ে শেষ হয়। শত বিনিয়োগেও তা আর ফেরে না।
সব দেশেই ডেমোগ্রাফিক বা জনমিতির পরিবর্তনে শুধু একবারই কর্মক্ষম লোকের আধিক্য আসে। সময়ান্তরে তা শেষ হয়। বাড়ে বয়স্ক লোকের সংখ্যা। উন্নয়নের গতি তখন আর তেমন অগ্রসর হয় না। পৃথিবীর সকল উন্নত দেশই এ সময়কাল অতিক্রম করেছে। জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আহরণ করেছে। এগুলোর প্রয়োগ ও যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা দেশের প্রবৃদ্ধি বহুগুণ করেছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে।

উন্নত দেশের তালিকায় নাম উঠিয়েছে। এখন সেসব দেশে বয়স্ক লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, উন্নয়নের গতি সেসব দেশে শ্লথ হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়নের গতি নেতিবাচক হয়েছে। তবে উন্নয়নের ফলে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সর্বোপরি জীবনমানের যে উন্নয়ন হয়েছে, তা অক্ষুণœ থাকছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আধিক্য বা জনমিতির সুবর্ণ সময়কে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক বোনাস। উন্নয়নের এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ সময়।
কোনো দেশের জনগণের সংখ্যাগত ও গুণগত পরিবর্তনের বিদ্যার নাম জনমিতি বা ডেমোগ্রাফি। দেশের জন্মহার ও মৃত্যুহার জনমিতির পরিবর্তনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। জনমিতি বিজ্ঞানী থমাস রবার্ট মালথাস ১৯১৮ সালে প্রকাশিত ‘অহ ঊংংধু ড়হ ঃযব চৎরহপরঢ়ষব ড়ভ চড়ঢ়ঁষধঃরড়হ’ শীর্ষক প্রবন্ধে তার ঐতিহাসিক জনসংখ্যা তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন জনসংখ্যা যে গতিতে বৃদ্ধি পায়, খাদ্য উৎপাদন সে গতিতে বাড়ে না।

সে প্রেক্ষিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদির মাধ্যমে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়। এভাবে জনসংখ্যা প্রাকৃতিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ হয়ে একটা ভারসাম্য অবস্থা বজায় রাখে।
প্রাকৃতিক নিয়মে এভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ হলে কোনো এলাকার জনসংখ্যা খুবই শ্লথ গতিতে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। জনমিতিক বৈশিষ্ট্যের খুব একটা পরিবর্তন দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু জন্মহার বা মৃত্যুহার কমানোর কার্যক্রমে একটু গতি পেলেই জনমিতিক পরিবর্তন শুরু হয়। জনমিতিক পরিবর্তনের এ প্রক্রিয়া কয়েকটি ধাপে অগ্রসর হয়। কোনো জনপদে জন্মহার ও মৃত্যুহার যদি খুব বেশি থাকে, তখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কম থাকে।

১৯৬০-এর দশকে এ দেশে জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন উন্নয়ন, টিকা কার্যক্রম, কুমিল্লা মডেল বাস্তবায়ন, সেচ কার্যক্রম, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রাম এবং অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন কিছুটা বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, পানীয় জল-সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহারে উন্নয়ন হয়। মৃত্যুহার কিছুটা হ্রাস পায়। কিন্তু জন্মহার আগের অবস্থাতেই বা উচ্চ জন্মহার থাকে।

উচ্চ জন্মহার থাকা অবস্থায় মৃত্যুহার হ্রাস পাওয়ায় জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। যেমন- ১৯৫১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এদেশে লোক সংখ্যা ছিল প্রায় ৩.৭৯ কোটি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ জনসংখ্যা প্রায় ৭ কোটিতে উন্নীত হয়। মাত্র ২০ বছরে এদেশে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের জনমিতিক পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
জনমিতিক পরিবর্তনের এ প্রথম ধাপে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বর্ধিত জনসংখ্যা উৎপাদনের জায়গা দখল করে। ফলে, উৎপাদন হ্রাস পায়। তখন দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কারণে মৃত্যুহারের বৃদ্ধি ঘটে। জনসংখ্যা আবার হ্রাস পায়। জনমিতিক পরিবর্তনের প্রথম ধাপের এ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে বলা হয় মালথাসের জনসংখ্যা ফাঁদ (Malthusian Population Trap)।

তবে স্বাধীনতার পরে শিক্ষা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, নারী উন্নয়ন এবং ব্যাপক জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ জনসংখ্যা ফাঁদ এড়াতে সক্ষম হয়।
সব দেশ বা অঞ্চলে ডেমোগ্রাফিক বোনাসকাল একবারই আসে। জন্মহার একবার হ্রাস পেলে আর তা কখনোই বাড়ে না। ডেমোগ্রাফিক বোনাসকালের শেষ দিকে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়, জন্মহার হ্রাস পায়, দেশের জনসংখ্যা কমতে থাকে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ কর্মক্ষম জনসংখ্যার ঘাটতিসহ বয়স্ক জনসংখ্যার আধিক্যে ভুগছে। কিন্তু তারা ডেমোগ্রাফিক বোনাসকাল যথাযথ ব্যবহার করে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তির উৎকর্ষ লাভে সক্ষম হয়েছে।

কাছাকাছি সময় যেসব দেশ এ বোনাসকাল যথাযথ ব্যবহার করতে পারেনি, তার মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কা জন্মহার, শিশুমৃতু, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়নসহ সব মানব উন্নয়ন সূচকে এ অঞ্চলে অগ্রগামী ছিল। তাদের ডেমোগ্রাফিক বোনাসকাল আমাদের থেকে কমপক্ষে ১৫ বছর আগে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের এ সময়কাল শুরু হয় ২০০০ সাল থেকে। শ্রীলঙ্কায় শুরু হয়েছে ১৯৮০-এর দশকে। তারা এ সময়কাল প্রায় শেষ করে ফেলেছে। গৃহযুদ্ধ, তামিল-সিংহলী নাগরিক দ্বন্দ্ব, অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অন্যান্য বিষয়ে সময়ক্ষেপণ করেছে। বাংলাদেশের হাতে এখনো প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর সময় আছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে জনশুমারি ২০২২ শেষ হয়েছে। শুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে শিশু বয়সী জনসংখ্যা ২৮.৬১% এ নেমে এসেছে। ২০১১ সালের শুমারিতে এ হার ছিল ৩৪.৬৪%। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী শিশু বয়সী জনসংখ্যা ২০৫০ সালে সব থেকে কম হবে (১৭.৩%)। এ সময় বয়স্ক জনসংখ্যার হার হবে ২২.৫%। বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য স্বাস্থ্য খাতে চাপ থাকবে।

কর্মক্ষম লোকের ঘাটতি উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত করবে। এখনই বিরাট জনসংখ্যা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। ৩৫ বছরের ওপরের বয়সী ৬৭% পুরুষ এবং ৫১% নারী জানেন না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। মাত্র ১৫% নারী ও ৯% পুরুষ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখেন। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আক্রান্তের গতি এভাবে চলতে থাকলে হƒদরোগ, কিডনি রোগ, স্ট্রোক ও অন্যান্য মারণঘাতী অসংক্রামক রোগীর সংখ্যা এত বৃদ্ধি পাবে যে, গ্রামে গ্রামে হাসপাতাল করেও রক্ষা পাওয়া যাবে না। সবাই যদি রোগী হয়, তবে উৎপাদন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া হবে নিম্নগামী ।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেল্থ সার্ভের প্রতিবেদন অনুযায়ী টিএফআর বা একজন মায়ের গড়প্রতি সন্তান সংখ্যা ২.২-এর নিচে নেমেছে। খুলনা বিভাগে এ সংখ্যা ১.৯ এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ২.১। অর্থাৎ এ তিন বিভাগে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটবে না। খুলনা বিভাগে এ দশকেই জনসংখ্যা কমা শুরু করবে। কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি (৬৭%)।

এ জনসংখ্যার দক্ষতা উন্নয়ন, স্বকর্মসংস্থানসহ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, যোগাযোগ, বৈদেশিক কর্মসংস্থানসহ বহুমুখী কার্যক্রমের এখনই সবচেয়ে উত্তম সময়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি করেছে। ২০ বছর আগে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের রপ্তানি আয় সমান ছিল। এখন বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের আয় ২৫ বিলিয়ন ডলার। তবে আমাদের আমদানি ঘাটতি আছে। রপ্তানি যে গতিতে বাড়ছে, আমদানি বেড়েছে সমান গতিতে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমদানি একটু বেশি বেড়েছে। যেসব মালামাল আমদানি হয়, তা দেশেই উৎপাদনের ব্যবস্থা নিতে হবে। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা অবহেলিত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে। যা দূর করা খুব জরুরী। শিশু বয়সী জনসংখ্যা যেহেতু কমছে, প্রত্যেক শিশুর সুস্থজন্ম, বিকাশ ও শিক্ষার পর্যাপ্ত বিনিয়োগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সব বিষয়ের মানোন্নয়ন। মোট কথা, আমাদের উন্নয়নের রাস্তার প্রধান সময়কাল যেহেতু শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাই প্রত্যেকটি মুহূর্ত সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে।

প্রতিটা ক্ষেত্রে বৃদ্ধি করতে হবে দক্ষতা। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে সর্বাত্মক আত্মনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। এ সময় আর পাওয়া যাবে না। উন্নয়ন আমাদের নাগালের মধ্যে। তা ধরার জন্য একটা কিছু করতেই হবে জরুরি ভিত্তিতে। কবি হেলাল হাফিজের ‘রাডার’ কবিতার ভাষায়- একটা কিছু সন্নিকটে, হাত বাড়িয়ে ধরুন।/দোহাই লাগে একটা কিছু করুন।

লেখক : সাবেক সচিব।