বন্যা, খরা, ও লবণ সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনে বাড়ছে সফলতা

ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কৃষি বিজ্ঞানীদের সফলতা বাড়ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও এরই মধ্যে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা অন্তত দুই ডজন প্রতিকূল পরিবেশে সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে লবণসহিষ্ণু খরাসহিষ্ণু ও বন্যাসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন তারা। বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেন বাংলাদেশের কৃষি গবেষকরা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এতগুলো প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা এই মুহূর্তে সারাবিশ্বে সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। প্রায় প্রতি বছরই দেশে বন্যা হচ্ছে, খরা হচ্ছে, অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে, বর্ষা মৌসুমে যখন বৃষ্টি হওয়ার সময়, তখন বৃষ্টি হচ্ছে না। আবার অসময়ে বা বিলম্বে বা একনাগারে কয়েকদিন প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে হঠাৎ বন্যা দেখা দিচ্ছে। কয়েকদিন বৃষ্টি হলেই নদীর পানি দুই কূল ছাপিয়ে আশপাশের নিচু এলাকা ডুবিয়ে দিচ্ছে। জমির ফসল পানিতে তলিয়ে নষ্ট হচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো বেশকিছু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। ব্রি-৫৫ হচ্ছে আউশ ও বোরো মৌসুমের ধান। এটি মাঝারি খরা, ঠান্ডা ও লবণাক্ত পরিবেশ সহ্য করতে পারে। আউশ মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ৫ টন ফলন হলেও বোরো মৌসুমে এই জাত ফলন দেয় প্রতি হেক্টরে সাত টন। ব্রি ৫৫ ধান ১০-১২ দিন সেচহীন অবস্থায় এবং ১৫-১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ৮ ডিএস মিটার লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। ১৪৫ দিনের মধ্যে এ ধান কাটার উপযোগী হয়। ব্রি ৫৭ জাতের এই ধানটিও আমন মৌসুমের। এটিও খরা সহনীয় ধান। পানির স্তর ২০ সেমি নিচে নেমে গেলেও এ জাতটি টিকে থাকতে পারে। এর ফলন হেক্টরপ্রতি সাড়ে ৩ থেকে চার টন। ১০৫ দিনে এ ধান কাটার উপযোগী হয়। খরা সহনীয় আগাম আমন মৌসুমের ধান হলো ব্রি ৫৬। ১৫ থেকে ১৬ দিন সেচহীন অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। ব্রি ৫৬ প্রতি হেক্টরে চার থেকে সাড়ে চার টন ফলন দেয়। বীজতলা থেকে শুরু করে ১১০ থেকে ১১৫ দিনের মধ্যে ধান কাটার উপযোগী হয়।

ব্রি ৪৩ বোনা আউশের আগাম জাত ও খরাসহিষ্ণু। ছিটিয়ে, সারি করে এবং ডিবলিং- এই তিন পদ্ধতিতেই এর বীজ বোনা যায়। জাতটির জীবনকাল মাত্র ১০০ দিন। উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এই ধান হেক্টরপ্রতি সাড়ে তিন টন ফলন দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয়েছে ব্রি ৭১ ধানের জাত। খরা সহনশীল জাতটি প্রজনন পর্যায়ে ২১ থেকে ২৮ দিন বৃষ্টি না হলেও টিকে থাকতে পারে। দেখতে মাঝারি মোটা আকৃতির। জীবনকাল ১১৪ থেকে ১১৭ দিন। অতি খরা বা মাটির আর্দ্রতা ২০ শতাংশের নিচে থাকলেও প্রতি হেক্টরে ৩.৫ টন, মধ্যম মানের খরায় চার টন ও খরা না থাকলে পাঁচ থেকে ছয় টন পর্যন্ত ফলন হয়।

ব্রি ২৯ জাতের ধান চাষে সেচ, সার ও সময় কম লাগে। ঝড়, বৃষ্টিতেও হেলে পড়ে না। ১৬০ দিনে ফসল ঘরে তোলা যায়। বিঘাপ্রতি ফলন ২৪-২৮ মণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানের ফসলিজমি প্রায়ই আকস্মিক বন্যায় পস্নাবিত হয়। এ ধরনের বন্যা সহ্য করতে পারে এমন কিছু জাতের ধান উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে একটি ব্রি ৫১। এটি টানা ১৫ থেকে ১৭ দিন পানির নিচে ডুবে থাকলেও নষ্ট হয় না। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। হেক্টরে ৪ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। দক্ষিণাঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় ধানের জাত এটি। ব্রি ৭৯ জাতের ধানের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি ১৮ থেকে ২১ দিন বন্যার পানিতে ডুবে থাকলেও ফলনের তেমন ক্ষতি হয় না। আর এত দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে না পড়লে স্বাভাবিক অবস্থায় এটি হেক্টরপ্রতি ৭ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। আমন জাতের ব্রি-৭৩ ধান লবণসহিষ্ণু ও অধিক ফলনশীল। চাল মাঝারি চিকন ও সাদা। ভাতও হয় অন্য চালের চেয়ে ঝরঝরে। প্রতি হেক্টরে স্বাভাবিক ফলন হয় সাড়ে চার টন। কম লবণাক্ত জমিতে এ ধান ৬ দশমিক ১ টন ফলন দিতে পারে। এ জাতের ধানে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উপদ্রবও অনেক কম। ব্রি ৭৮ জাতের আমন ধানটি একাধারে বন্যা ও লবণসহিষ্ণু। বাংলাদেশে এই জাতের ধান এটিই প্রথম উদ্ভাবিত হয়েছে। এর আগে আলাদাভাবে লবণাক্ততা ও বন্যা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছিল। সে রকম দুই জাতের ধানের জিন একীভূত করে ব্রি-৭৮ উদ্ভাবন করা হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জোয়ার-ভাটা এলাকায় চাষের উপোযোগী জাত ব্রি ৭৬। এ জাতের ধানগাছের উচ্চতা ১৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এ জাতের ধান অন্য যে-কোনো আমনের চেয়ে হেক্টরপ্রতি এক টন বেশি ফলন দেয়।

অতি সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা সহিষ্ণু ধানের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করেছেন বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) বিজ্ঞানীরা। এর ফলে বাংলাদেশের ধান গবেষণায় নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। দেশে ২০ লাখ হেক্টর লবণাক্ত জমি রয়েছে, যেখানে বছরে একটি ফসল হয়। খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই করতে ও ভবিষ্যতে খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে লবণাক্ত, হাওরসহ প্রতিকূল এলাকায় বছরে দু-তিনটি ফসল উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচনের ফলে প্রতিকূল পরিবেশ-সহিষ্ণু ধানের ফলন সহজতর হবে।

আকস্মিক বন্যার হাত থেকে ধানকে রক্ষা করার জন্য আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) একসঙ্গে কাজ করছে। বেশ কয়েক বছর গবেষণা করে কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে, যেগুলো ১৫ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ পানির নিচে ডুবে থাকলেও নষ্ট হয় না। অর্থাৎ ১৫ দিনের মধ্যে বন্যার পানি নেমে গেলে এই জাতগুলো আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন দেয়। বন্যাসহিষ্ণু জাতের এ ধরনের আশাতীত সাফল্য দেখে বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় বীজ বোর্ড বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ব্রি ধান৫১ এবং ব্রি ধান ৫২ নামে দুটি জাত বন্যাসহিষ্ণু ধানের জাত। বিশেষ করে ১৪ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত পানির নিচে ডুবে থাকলেও ধানের কোনো ক্ষতি হবে না। এমন বিস্ময়কর ধানের জাত আবিষ্কৃত হয়েছে বাংলাদেশেই। বাংলাদেশ কৃষি পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বিনা ধান ১১ এবং বিনা ধান১২ ধানের জাত দুটি আমন মৌসুমের জন্য বন্যাসহিষ্ণু জাত হিসেবে অনুমোদন দেয়। এই দুটি জাত অপেক্ষাকৃত কম সময়ে পাকে। বাংলাদেশে আমন মৌসুমের জনপ্রিয় জাত বিআর ১১ ধানকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সাব-১ জিন দিয়ে পরিশীলিত করে ব্রি ধান ৫২ জাতটিকে একটি বন্যাসহিষ্ণু ধানের জাত হিসেবে উদ্ভাবন করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্রি ধান ৫২ বন্যাসহিষ্ণু ধানের জাতটি বিআর ১১ ধানেরই একটি উন্নত সংস্করণ। এই জাতটিতে বন্যার পানিতে ডুবে থাকার ক্ষমতাসম্পন্ন বৈশিষ্ট্য বা জিন, যা সাবমার্জেন্স জিন-১ বা সংক্ষেপে সাব-১ বিদ্যমান থাকার কারণে এটি বন্যার পানিতে কমপক্ষে ১৫ দিন পর্যন্ত ডুবে থাকতে পারে এবং হেক্টরপ্রতি চার টনেরও বেশি ফলন দিতে সক্ষম। বন্যার পানিতে না ডুবলে এই জাতটি হেক্টরপ্রতি ৫ টনেরও বেশি ফলন দেবে। তাই যেখানেই বিআর-১১ ধানের চাষাবাদ হয়, সেই এলাকাটি বন্যাপ্রবণ বা বন্যামুক্ত যে এলাকাই হোক না কেন সেখানে বিআর ১১ ধানের পরিবর্তে ব্রি ধান-৫২ চাষাবাদ করা যেতে পারে।F