১২২৫ কোটি টাকায় আশুগঞ্জে হচ্ছে আন্তর্জাতিক নৌ-বন্দর

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ নৌ-বন্দরে এক যুগেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। বছরের পর বছর বন্দরের দুটি জেটি দিয়ে চলছে পণ্য লোড-আনলোডের কাজ। এতে প্রায়ই নৌ-বন্দরে কার্গো জটের সৃষ্টি হয়। ফলে পণ্য খালাস নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন বন্দরের ব্যবসায়ীরা।

অবশেষে ৩১ দশমিক পাঁচ একর জমির ওপর নির্মাণ হচ্ছে আশুগঞ্জ নৌ-বন্দর। বন্দরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ২২৫ কোটি টাকা। এটি আন্তর্জাতিক মানের নৌ-বন্দর হবে। শিগগিরই শুরু হবে নির্মাণকাজ। ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হলে উন্নয়নকাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০১০ সালে মেঘনার পূর্বপাড়ে অবস্থিত আশুগঞ্জ নৌ-বন্দরকে অভ্যন্তরীণ নৌ-বন্দর ঘোষণা করে সরকার। একই বছর ২৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে বন্দরের উন্নয়নের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি ভারতীয় নমনীয় সুদের লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় বাস্তবায়নের কথা ছিল। পরে ঋণ সহায়তা না পাওয়ায় বন্দরের উন্নয়নকাজ থেমে যায়। গত ১২ বছরে বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। পুরনো দুটি জেটি দিয়ে চলছে কার্গো জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামার কাজ। এতে প্রায়ই বন্দরে কার্গো জটের সৃষ্টি হয়। ব্যাহত হয় পণ্য ওঠানামার কাজ।

তবে ২০১১ সালে আশুগঞ্জ নৌ-বন্দর ব্যবহার করে ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ভারী মালামাল পরিবহন করে ভারত। পরে কয়েক দফায় বন্দর ব্যবহার করে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করে তারা। এর মধ্য দিয়ে অভ্যন্তরীণ নৌ-বন্দরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে আশুগঞ্জ নৌ-বন্দরের গুরুত্ব বেড়ে যায়। কিন্তু পণ্য খালাসের জেটিতে কার্গো জটসহ নানা জটিলতার কারণে ভোগান্তিতে পড়েন ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় বন্দরের উন্নয়ন ও এটিকে আন্তর্জাতিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের দাবি তোলেন বন্দরের ব্যবহারকারীরা। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথভাবে আন্তর্জাতিক মানের অভ্যন্তরীণ নৌ-বন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।

এ বিষয়ে আশুগঞ্জ নৌ-বন্দরের ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন বলেন, ‌‘বন্দরে দুটি জেটি আছে। এর মধ্যে একটি আমরা ব্যবহার করি। অপরটি ভারতের মালামাল নেওয়ার জন্য বরাদ্দ। অনেক সময় দেখা যায়, আমাদের কার্গো জাহাজ বন্দরে থাকার সময় ভারতের কার্গো বন্দরে এলে ঘাট ছেড়ে দিতে হয়। তখন কার্গো জট লেগে পণ্য ওঠানামা ব্যাহত হয়। এখানে আন্তর্জাতিক কনটেইনার টার্মিনাল হলে সবাই চাহিদা অনুযায়ী সযোগ-সুবিধা পাবে। এতে বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। দুই দেশের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।’

বন্দরের আরেক ব্যবসায়ী আলমগীর মিয়া বলেন, ‘বন্দরটি আন্তর্জাতিক মানের কনটেইনার টার্মিনাল হলে পণ্য লোড-আনলোড জটিলতা কমে যাবে। আশুগঞ্জ নৌ-বন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়কের ফোরলেনের কাজ শেষ হলে সহজে ভারতে মালামাল পাঠাতে পারবো আমরা। এতে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও জোরালো হবে।’

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ভৈরব-আশুগঞ্জ নৌ-বন্দরের উপ-পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, ‘৩১ দশমিক পাঁচ একর জমির ওপর আশুগঞ্জ নৌ-বন্দর নির্মাণ হচ্ছে। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ শুরু হবে। বন্দরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ২২৫ কোটি টাকা। এরই মধ্যে আশুগঞ্জ নদী বন্দরের কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে। নৌ-বন্দর নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত শুরু হবে উন্নয়নকাজ।’

তিনি বলেন, ‘আশুগঞ্জ নৌ-বন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলে মোংলা-পায়রা এবং চট্টগ্রাম নৌ-বন্দর থেকে আসা কনটেইনার এই বন্দর দিয়ে ওঠানামা করবে। এতে বন্দরটি আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক নৌ-যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু হয়ে অল্প সময়ে শেষ হয়ে যাবে।’

আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরবিন্দু বিশ্বাস বলেন, ‘আশুগঞ্জ থেকে মহাসড়কের চারলেনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। চারলেনের কাজ শেষ হলে আশুগঞ্জ নৌ-বন্দরে আন্তর্জাতিক মানের নৌ-বন্দর নির্মাণকাজ শুরু হবে। এতে আশুগঞ্জ উপজেলা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। ইতোমধ্যে টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ভারতের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বন্দরটি পরিদর্শন করেছেন। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু হবে।’