যোগাযোগে বিপ্লব: তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু ও মধুমতি সেতু চালু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর পর খুলে গেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক দুয়ার। ওই অঞ্চলে ব্যবসা, বাণিজ্য, শিল্পায়ন, পর্যটন শিল্পে নতুন জোয়ার এসেছে; লেগেছে উন্নয়নের ঢেউ। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সড়ক পথের দূরত্ব কমে যাওয়ায় কয়েকটি জেলায় কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য ঢাকায় বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। পর্যটনসহ দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ ঘটায় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সেই ‘উন্নয়ন ও সুযোগ সুবিধার ডানায়’ নতুন পালক যোগ হলো নরাইলের মধুমতি সেতু ও নারায়ণগঞ্জের সদর ও বন্দর উপজেলাকে সংযুক্ত করা তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু। এই দুই এলাকার কয়েক লাখ মানুষ দু’টি নদীর কারণে পদ্মা সেতুর সুফল এতোদিন পুরোপুরি পায়নি। নতুন এই দুই সেতু চালু হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সুবিধা আরো বাড়বে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে শিল্পের আরো বিকাশ ঘটবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নড়াইলের কালনায় দেশের প্রথম ৬ লেনের মধুমতি সেতু উদ্বোধন করলেন। মধুমতি সেতু উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে খুললো দক্ষিণের অরেকটি দুয়ার। এতে অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঘটবে বিপ্লব। একই দিন শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের সদর ও বন্দর উপজেলাকে সংযুক্ত করা তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম নাসিম ওসমান নামকরণে শীতলক্ষ্যা সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। সেতুটি নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু : নারায়ণগঞ্জ জেলাকে বলা হয়ে হয়ে থাকে শিল্পাঞ্চলের জেলা। অথচ এই জেলার বড় অংশ শীতলক্ষ নদী দিয়ে বিভক্ত ছিল। কাচপুর ও ডেমরা দুটি সেতু থাকলেও বন্দর এলাকায় অনেক এলাকা যোগাযোগের বাহন ছিল ফেরি। ফলে ওই এলাকা ছিল বিচ্ছিন্ন। তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে প্রধান সমুদ্র বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বাইপাস সংযোগ স্থাপন করলো। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহসড়কের মধ্যে সংযোগ স্থাপনসহ বাংলাদেশের প্রধান ও ব্যস্ততম দুই বন্দরের অন্তর্বর্তীকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থার দূরত্ব ঘুচিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হবে বলে মনে করছেন সেতু সংশ্লিষ্টরা।

শীতলক্ষ্যা নদী বন্দর উপজেলা ও সোনারগাঁ উপজেলাকে জেলা সদর থেকে পৃথক করেছে। এ দুটি উপজেলা সরাসরি সড়কপথে জেলা সদরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না। নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে সড়কপথে যাতায়াতে একমাত্র পথ ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে প্রথম শীতলক্ষ্যা সেতু (কাঁচপুর সেতু) হয়ে ঘুরে আসতে হতো। এতে ৩০ কিলোমিটার বেশি পথ ঘরে আসতে হতো। এছাড়াও সেতুটির সুফল পাবে বন্দরবাসী।

এই সেতুর ফলে নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে। ৬০৮.৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১.২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু ব্যবহার করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলগামী যানবাহন এবং একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যানবাহন যানজট এড়িয়ে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হবে।

এছাড়া এই সেতুর ফলে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি, বিসিক শিল্প এলাকা, চাষাঢ়া, সাইনবোর্ড এলাকার যানজট লাঘবে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড, আদমজী সড়কসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রথম শীতলক্ষ্যা কাঁচপুর সেতুর যানবাহনের চাপ কমিয়ে ওই সড়কে চলাচল করা যানবাহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলবে।

প্রকল্পটি ২০১০ সালে একনেকে অনুমোদন পায়। এরপর ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি নির্মাণকাজ শুরু হয়। সেতু নির্মাণে ৬০৮ দশমিক ৫৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। এর মধ্যে ২৬৩ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার এবং ৩৪৫ দশমিক ২০ কোটি টাকা সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) অর্থায়ন করে। ওয়াকওয়েসহ সেতুটিতে মোট ৩৮টি স্প্যান বসানো হয়। এর মধ্যে পাঁচটি নদীতে এবং ৩৩টি পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে স্থাপন করা হয়। ফুটপাতসহ সেতুটির প্রস্থ ২২ দশমিক ১৫ মিটার। এছাড়া ছয়লেনের টোল প্লাজা এবং দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাপ্রোচ রোডও নির্মাণ করা হচ্ছে।

মধুমতি সেতু : মধুমতি সেতু উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় কার্যত বিপ্লবের আরেকটি মাইলফলক উন্মোচিত হলো। মধুমতি সেতু যশোর-নড়াইলের পাশাপাশি বাংলাদেশকে সাব-রিজিওনাল কানেক্টিভিটির মাধ্যমে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে যুক্ত করবে। ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে উন্মোচিত হবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। যশোর-ভাঙ্গা-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের কালনা পয়েন্টে মধুমতি নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের।

নড়াইলের সাধারণ জনগণ বলছেন, এই সেতু তাদের দীর্ঘদিনের ফেরি পারাপার ও অপেক্ষার ভোগান্তি লাঘব করবে। রাজধানী ঢাকা ও প্রতিবেশী দেশের কলকাতার সঙ্গে যাতায়াত সহজ করবে। এখানকার ব্যবসা বাণিজ্য প্রসারেও ভূমিকা পালন করবে। স্থানীয়ভাবে কালনা সেতু নামে পরিচিত। নড়াইলের লোহাগড়ার কালনা পয়েন্টে দেশের প্রথম ৬ লেনের দৃষ্টিনন্দন কালনা সেতু নড়াইল, গোপালগঞ্জ, খুলনা, মাগুরা, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর এবং ঝিনাইদহ জেলাকে সংযুক্ত করেছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে ৯৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে মধুমতি নদীর ওপর ৬৯০ মিটার দীর্ঘ মধুমতি সেতু নির্মিত হয়েছে। এই সেতুর সরাসরি সুফল পাবে খুলনা বিভাগের ১০টিসহ আরো কয়েকটি জেলার লাখ লাখ মানুষ। সেতুটির কারণে ঢাকা থেকে নড়াইলের দূরত্ব কমে আসবে ১১৫ কিলোমিটার। একই দূরত্ব কমবে কলকাতার ক্ষেত্রেও। আশপাশের অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রে দূরত্ব কমবে ৯০ থেকে ৯৮ কিলোমিটার। এই সেতু দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচাবে। এ ছাড়া দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্বও কমবে, সাশ্রয় হবে সময়। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রতিবেশী দেশে ভ্রমণ ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।

জানা যায়, নড়াইলে নির্মিত দেশের প্রথম ৬ লেন বিশিষ্ট মধুমতি সেতু শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই বদলে দেবে না, ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এর সুফল পাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ পুরো দেশের মানুষ। দেশের অভ্যন্তরীণ এবং ভারতীয় পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই সেতু। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি উপজেলা এবং নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মধ্যে মধুমতি সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেতুটি চালু হওয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ দ্রুত সড়ক যোগাযোগ সুবিধা পাবে। সেতুটি কালনাঘাট থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব কমিয়ে দেবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১০টি জেলার মানুষ কম সময়ে বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতে পারবে। এটি দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল, যশোর থেকে ঢাকা পর্যন্ত ভ্রমণের সময়ও কমিয়ে দেবে, এতে ঢাকা থেকে দূরত্ব হবে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার। এতদিন পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি ঘাট হয়ে যশোর থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে ১০০ কিলোমিটার বেশি ভ্রমণ করতে হতো। সেতুটি এশিয়ান হাইওয়ের একটি অংশ যা রাজধানীকে দেশের বৃহত্তম বেনাপোল স্থলবন্দরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। ২৭ দশমিক ১ মিটার চওড়া সেতুটিতে চারটি উচ্চগতির লেন ৪ দশমিক ৩০ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড এবং দুটি সার্ভিস লেনসহ ছয়টি লেন রয়েছে।

এ সেতু দিয়ে নড়াইল, যশোর, বেনাপোল স্থলবন্দর ও খুলনা থেকে ঢাকায় যাতায়াতকারী পরিবহন মাগুরা-ফরিদপুর হয়ে যাতায়াতের পরিবর্তে কালনা হয়ে যাতায়াত করতে পারবে। এতে বেনাপোল ও যশোর থেকে ঢাকার দূরত্ব ১১৩ কিলোমিটার, খুলনা-ঢাকার দূরত্ব ১২১ কিলোমিটার এবং নড়াইল-ঢাকার দূরত্ব ১৮১ কিলোমিটার কমবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, নড়াইল-যশোরসহ এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় শীতকালীন শাক-সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এসব পণ্য মূলত মাগুরা হয়ে এবং কালমা ফেরি হয়ে ট্রাকযোগে পরিবহন করা হয় হতো। এখন পণ্য পরিবহনের বেশিরভাগই হবে মধুমতি সেতু দিয়ে পরিবহন করা হবে। এতে সময় বাঁচবে এবং ভোগান্তিও কমবে।

আমদানিকারকরা বলেন, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচসহ নানা ধরনের পণ্য ভারত থেকে আমদানি করা হয় এ পথে। বেনাপোল দিয়ে এসব পণ্যের একটি বড় অংশ আনা হয়। যার অনেকাংশ মাগুরা হয়ে ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে যায়। এখন ওই রুটের বদলে মধুমতি সেতু দিয়ে যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটি একটি পরিবর্তন আনবে। এ ছাড়াও সেতুর কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসায় স্থানীয়ক্ষুদ্র ও কুঁটির শিল্প বেগবান হবে। ছোট-বড় উদ্যোক্তার সংখ্যাও বাড়বে। সরকপথে যাতায়াত বাড়বে। নতুন নতুন গণপরিবহন নামবে। সব মিলিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে হাওয়া লাগবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

লোহাগড়ার এক শিক্ষার্থী বলেন, মধুমতি সেতুর ফলে ঢাকা যাওয়া-আসায় ফেরি পারাপারের দুর্ভোগ লাঘব হবে। সময় ও অর্থ বাঁচবে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। ঢাকায় খুব সহজে যাতায়াত করতে পারবো। মধুমতি সেতুর ফলে পদ্মাসেতুর পুরো সুফল ভোগ করবে পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ।