বাড়ছে আন্তর্জাতিকমানের জাহাজ নির্মাণ

জাহাজ নির্মাণ শিল্প বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শিল্প খাত। এই শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীণ আর্থিক সাশ্রয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বার উন্মোচন হচ্ছে। নদীমাতৃক এই দেশের অধিকাংশ আমদানি-রফতানি হয় নৌপথে। আর বাণিজ্য সম্প্রসারণে দরকার অনেক জাহাজ। বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দশ হাজার জাহাজ অভ্যন্তরীণ ও সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন কাজে নিয়োজিত রয়েছে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিনিয়োগ করছে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। এসব শিল্পগ্রুপ তৈরি করছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাহাজ।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মতে, ‘দেশে প্রায় শতাধিক জাহাজ নির্মাণ কোম্পানি রয়েছে যেগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও খুলনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এছাড়া ১২০টিরও বেশি নিবন্ধিত শিপইয়ার্ড রয়েছে।’ সম্প্রতি যে খবরটি এই শিল্পে ব্যাপক আশা সঞ্চার করেছে তা হলো, যুক্তরাজ্যের এনজিয়ান শিপিং কোম্পানি লিমিটেডের কাছে ৬১০০ ডিডব্লিউটির একটি জাহাজ রফতানি করেছে আনন্দ শিপইয়ার্ড এ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেড। দেশ থেকে রফতানিকৃত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জাহাজ এটিই। ৩৬৪ ফুট দীর্ঘ, ৫৪ ফুট চওড়া এবং ২৭ ফুট গভীর জাহাজটিতে একটি ৪,১৩০ হর্স পাওয়ার ইঞ্জিন রয়েছে এবং যা ঘণ্টায় ১২ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত গতিতে পৌঁছাতে পারে। টানা এক দশক মন্দা কাটিয়ে আনন্দ শিপইয়ার্ডের দ্বিতীয় রফতানি এটি।

আনন্দ শিপইয়ার্ডের অগ্রযাত্রার নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও এ্যাসোসিয়েশন অব এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড শিপবিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রি অব বাংলাদেশের সভাপতি ড. আব্দুল্লাহ হেল বারী। তিনি বুয়েট থেকে পড়ালেখা শেষ করে ইংল্যান্ডে শিপ বিল্ডিংয়ের ওপর পিএইচডি করেছেন। মাতৃভূমির টানে আবার দেশে চলে আসেন। বুয়েটে শিক্ষকতাও করেছেন। এরই মধ্যে তার স্ত্রী আফরোজা বারী বিদেশ থেকে ডিপ্লোমা করে নিজের এক ইঞ্জিনিয়ার ভাইকে নিয়ে জাহাজ নির্মাণের কারাখানা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এরপরে তিনিও সেখানে যোগ দেন। জাহাজ নির্মাণে বিশদ জ্ঞান থাকার কারণে নানা রকম অজ্ঞতা তার চোখ এড়াতে পারেনি। তখন থেকেই লেগে যান কিভাবে এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা যায়। ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে সোনারগাঁওয়ের মেঘনা ঘাটে আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ নির্মাণ করছে আনন্দ শিপইয়ার্ড। ইয়ার্ডের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার টন।

ড. আব্দুল্লাহ হেল বারী আরও বলেছেন, অত্যাধুনিক কন্টেনার জাহাজ ‘স্টেলা মেরিস’ ডেনমার্কে রফতানির মাধ্যমে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথম জাহাজ রফতানি শুরু করি আমরা। পরের দুই বছরে বিভিন্ন দেশে আরও ১১ টি জাহাজ রফতানি হয়। বর্তমানে রফতানির অপেক্ষায় রয়েছে আরও তিনটি জাহাজ। বাংলাদেশের সরকার শ্রমঘন খাতের প্রবৃদ্ধি সহজতর করতে এবং রফতানি আয় বাড়াতে জাহাজ নির্মাণ শিল্প উন্নয়ন নীতি ২০২১ অনুমোদন করেছে। যা এই শিল্পের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করছে। এই খাত প্রতি বছর দেশকে ১৫ হাজার কোটি টাকা যোগান দেয়। যা ২০৪১ সালে ১০০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে। ড. বারীর মতে, প্রতিবছর আমরা বিদেশ থেকে পণ্য আনা-নেয়া বাবদ প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করি পরিবহন খাতে। অথচ জাহাজ শিল্পে উন্নতি করতে পারলে এই সমপরিমাণ টাকা আমাদের দেশজ আয়ে যোগ করা সম্ভব।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী জাহাজ নির্মাণ শিল্পে পাঁচ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ১৩ ধাপ এগিয়ে ১৪ নম্বরে উন্নীত হয়েছে। পেছনে ফেলে দিয়েছে পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশের ওপরে থাকা যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সিঙ্গাপুর, স্পেন ও রোমানিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশকে। ২০২০ সালে বৈশ্বিক মান সনদধারী জাহাজ নির্মাণের তথ্য ব্যবহার করে এই হিসাব করেছে সংস্থাটি।

গত এক দশকে জাহাজ শিল্প ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি, ৭০ শতাংশ কার্গো এবং ৩৫ শতাংশ যাত্রী নৌপথে বহন করা হয়, এতে জাহাজ শিল্পের জন্য একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রো-রো ভেসেল, মাল্টিপারপাস কনটেনার ভেসেল, টাগ বোট, ল্যান্ডিং ক্র্যাফট, বাল্ক ক্যারিয়ার, টহল জাহাজ, ক্যাটামারান ওয়াটার ট্যাক্সি, ফেরি এবং যাত্রীবাহী জাহাজ রফতানি করেছে। এই খাতের উদ্যোক্তারা বলেছেন, দেশে ছোট-বড় প্রায় তিন শতাধিক শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড রয়েছে। বর্তমানে এই শিল্পে প্রায় ৩ লাখ লোক জড়িয়ে আছে। দেশে আনুমানিক ১০ হাজার টন ক্ষমতার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাহাজ তৈরি করার মতো প্রায় ১০টি স্থানীয় শিপইয়ার্ড রয়েছে। জাহাজ শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজার বাড়ছে ১০-১৫ শতাংশ হারে এবং রফতানি বাজার বাড়ছে ৫-৬ শতাংশ হারে।

সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় চলাচলের জন্য দেশে তৈরি জাহাজের উপযুক্ত কারিগরি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দেশে এসব জাহাজ নির্মাণের অনুমতি ও নিবন্ধন দেয় চট্টগ্রামের নৌবাণিজ্য কার্যালয়। নৌবাণিজ্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী গত তিন বছরে দেশে পণ্য পরিবহনের আন্তর্জাতিকমান সনদপ্রাপ্ত জাহাজের সংখ্যা বেড়েছে। এ সময়ে এলপিজি, জ্বালানি ও ভোজ্যতেল, সাধারণপণ্য ও কনটেনার পরিবহনের জন্য ৭০টিরও বেশি জাহাজ নির্মিত হয়েছে। নির্মাণাধীন আছে আরও ৩৫টি জাহাজ। যা পাঁচ বছর আগেও আমদানি করা হতো। এই শিল্পের রফতানিকারকদের নগদ সহায়তা ও করছাড়সহ নানা প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। জাহাজ শিল্প নীতিমালায় এ খাতের উন্নয়ন, পরিচালনা ও বিকাশের লক্ষ্যে দুই হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ স্কিমের সুদহার হবে সাড়ে ৪ শতাংশ। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১২ বছর মেয়াদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। তবে ঋণের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। বাংলাদেশ বিশাল সমুদ্রসীমা জয় করলেও এর সম্পদ আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। জাহাজ শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে এই সম্পদ কাজে লাগানো সহজ হবে। সেই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী, মোংলা, পায়রাসহ সব বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো নদীর তীরে অবস্থিত। নদীর উপকূলে বড় জাহাজ বানানো সম্ভব নয়। এ জন্য সাগর উপকূলে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যান্য দেশের তুলনায় এদেশে রয়েছে সস্তা শ্রম। শুধু স্বল্প শ্রম ব্যয়ে বেশিদূর এগোনো সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশে জাহাজ নির্মাণের জন্য প্রায় ৫০ শতাংশ কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ বিদেশীদের সহযোগিতা এবং যৌথ উদ্যোগে উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে পারলে এ খাত উন্নত হবে ও নির্মাণ খরচ কমবে। এছাড়া এই শিল্প সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যক। যথোপযুক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে আগাতে পারলে এ শিল্পটি তৈরি পোশাক শিল্পের মতোই রফতানি আয় অর্জন করতে পারবে বলে আশা করা যায়।