স‌লেমানের সোলার পাম্পে চিন্তামুক্ত হাজা‌রো কৃষ‌ক

আমন চাষাবাদের এ মৌসুমে বৃষ্টি সেভাবে হচ্ছে না। পাম্পের সাহায্যে খানখেতে সেচ দেওয়া যায়, কিন্তু সেখানেও সংকট। বিদ্যুতে যাঁদের পাম্প চলে, তাঁরা ভুগছেন লোডশেডিংয়ে; আর যাঁরা পাম্প চালান ডিজেলে, তাঁদের চিন্তা জ্বালানির বাড়তি দাম। এই যখন অবস্থা, তখন কয়েক হাজার কৃষকের চিন্তা কিছুটা লাঘব করেছেন কৃষক সলেমান আলী।

কারও খেত ফেটে চৌচির হচ্ছে তো ডাক পড়লেই পাম্প নিয়ে হাজির সলেমান। সৌরশক্তিতে পাম্প চলায় খরচও কম। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোলানী এলাকার কৃষক সলেমান এভাবে আমন মৌসুমে কৃষকদের চিন্তামুক্ত করেছেন। খরা মৌসুমেও সেচের পানি নিয়ে ভাবনা নেই তাঁদের।

জানা যায়, সদর উপজেলার মোলানী ও ভেলাজান গ্রামের অনেক কৃষক আগে সেচের অভাবে জমি ফেলে রাখতেন। সেচের সমস্যা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে থাকেন কৃষকেরা। পরে এ সমস্যা সমাধানের জন্য ওই গ্রামের কৃষক সলেমান আলী ১৯৯৮ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কাছ থেকে সৌরবিদ্যুতের ৭৫ ওয়াটের একটি প্যানেল ও ব্যাটারি কিনে কাজ শুরু করেন। কয়েক বছরের চেষ্টায় ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৩০০ ওয়াটের একটি সোলার প্যানেল বোর্ড তৈরি করে ফেলেন। এই বোর্ড সরাসরি সূর্য থেকে তাপ শোষণ করে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এ বিদ্যুৎ দিয়ে পাম্পের মাধ্যমে পানি তুলে সেচ দেওয়া হয়। সৌরবিদ্যুতের এই প্যানেলে কোনো ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়নি। এই প্যানেলের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সেচ দেওয়া যায়। সূর্যের তাপ যত প্রখর হবে, পানিও তত বেশি উত্তোলন হবে। বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সূর্য যেদিকে থাকে, সেই দিকে প্যানেলটি ঘুরতে থাকে।

সলেমান আলী জানান, তাঁর এই সোলার পাম্প দিয়ে মিনিটে ৭০০ থেকে ৮০০ লিটার পর্যন্ত পানি তোলা যায়। এ ছাড়া এই প্যানেলটি একটি ফ্রেমের সঙ্গে যুক্ত করে তার সঙ্গে চাকা লাগিয়ে টেনে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ফলে এক জায়গা থেকে সহজে অন্য জায়গায় নেওয়া যায়। এ জন্য খেতে পানি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাক পড়ে তাঁর। সেসব এলাকায় গিয়ে ভ্রাম্যমাণ সোলার পাওয়ারের মাধ্যমে জমিতে সেচ দিয়ে থাকেন তিনি। এ রকম ১৫টি পাম্প তৈরি করেছেন তিনি। এসব পাম্প দিয়ে এবার ১০০ একর আমনখেতে সেচ দিচ্ছেন তিনি। আর নিজের বাড়িতে সোলার বিদ্যুৎ দিয়ে পানি সরবরাহ করছেন মাছের পোনা উৎপাদনে।

মোলানী এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সলেমানের প্যানেলে বিদ্যুৎ আর ডিজেলের ঝামেলা নেই। সূর্যের আলো হলেই চলে। ৫ বিঘা জমিতে এ পাম্পের মাধ্যমে পানি দিচ্ছি।’

একই এলাকার কৃষক সাইদুল হক বলেন, এক একর ধানের জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বা ডিজেলে খরচ লাগে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। সে তুলনায় সলেমানের এই সেচযন্ত্র দিয়ে পানি দিতে খরচ লাগছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। এতে সেচ খরচ বেশ সাশ্রয় হচ্ছে।

ভেলাজান এলাকার কৃষক নেলভেলু বলেন, ‘সলেমানের উদ্ভাবিত যন্ত্রে সেচ খরচ অর্ধেকে নেমে আসছে। এখন এমন সুযোগ পাওয়ায় পানির জন্য আর কোনো বাড়তি চিন্তা নেই।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল আজিজ আজকের পত্রিকাকে বলেন, জ্বালানি তেলের চেয়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অনেক কম হয়। যার কারণে কৃষক সলেমানের সেচযন্ত্রটি অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শুধু অর্থ সাশ্রয় নয়, এটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি। এ জন্য সলেমানকে উৎসাহিত করা হবে।