বাংলাদেশের মেয়েদের ‘হিমালয়’ জয়

সাফ ফুটবলে প্রথম শিরোপা বাংলাদেশ ৩ * নেপাল ১

শেষ বাঁশি বাজতেই আকাশের ঠিকানায় দুই হাত তুলে বৃষ্টিস্নাত মাঠে বসে পড়লেন রিতুপর্ণা চাকমা। সতীর্থদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণের জন্যই যে অধীর অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। অবশেষে ধরা দিল বহু আরাধ্য শিরোপা। সাবিনাদের হাত ধরে আরেকটি ইতিহাস রচিত হলো। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের আসনে এখন বাংলাদেশ। মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো সেরার তকমা পেল লাল-সবুজের দেশটি। সেই সঙ্গে মেয়েদের সাফ পেল নতুন চ্যাম্পিয়ন। সোমবার কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালায় অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে স্বপ্নের সাফ শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশ।

সাবিত্রা ভান্ডারিদের এমন হার মেনে নিতে পারছিল না নেপালের দর্শকরা। ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠায় তারা ধরে নিয়েছিল এবার হয়তো অপেক্ষার প্রহর ফুরাবে। তাই তুমুল বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রায় ২০ হাজার দর্শক মাঠে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গের হতাশায় ম্যাচ শেষে গ্যালারি থেকে বোতল ছুড়ে মারতে থাকে তারা।
স্বপ্ন পূরণ করে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন সাবিনা খাতুনও। মেয়েদের সাফের আগের পাঁচটি আসরেই খেলেছেন সাবিনা। ২০১৬ সালে শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ সাফের ফাইনালে খেললেও শিরোপা জিততে পারেননি। এবার খেললেন, জয় করলেন। টুর্নামেন্টের একমাত্র ফুটবলার সাবিনা, যিনি দুটি হ্যাটট্রিক করেছেন। আট গোল করে জিতেছেন সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও। মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ারের পুরস্কারও পেয়েছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

আগের ম্যাচে পায়ে ব্যথা পাওয়া সত্ত্বেও ফাইনালে মাঠে নেমেছিলেন সিরাত জাহান। কিন্তু বেশিক্ষণ মাঠে থাকতে পারেননি তিনি। ১০ মিনিটে সিরাতের বদলে মাঠে নামেন শামসুন নাহার জুনিয়র। মাঠজুড়ে খেলায় জুড়ি নেই তার। কখনো উপরে উঠে আক্রমণে যাচ্ছেন, আবার কখনো নিচে নেমে রক্ষণে সহায়তা করছিলেন শামসুন নাহার জুনিয়র। দুর্দমনীয় এই ফুটবলার গোলের গেড়ো খুলেন ম্যাচের ১৩ মিনিটে। দারুণ এক শটে গোল করে এগিয়ে দেন বাংলাদেশকে (১-০)। গোলের পর হঠাৎ করেই ডিফেন্সিভ খেলতে থাকে বাংলাদেশ। এতে ঝুঁকি বাড়তে থাকে। নেপালের মুহুর্মুহু আক্রমণ রুখতেই ব্যতিব্যস্ত থাকতে দেখা যায় রক্ষণভাগকে। কিছুক্ষণ পর সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসেন সাবিনারা। ফের আক্রমণে যান তারা। যার ফল পেয়ে যান ম্যাচের ৪৩ মিনিটে। বাঁ প্রান্ত দিয়ে অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের বাড়নো বল বক্সে ঠেলে দেন সহঅধিনায়ক মারিয়া মান্দা। প্লেসিং শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন কৃষ্ণা রানী সরকার (২-০)। আনন্দে উদ্বেল যখন কৃষ্ণা রানীরা, তখন পিনপতন নীরবতা স্বাগতিক শিবিরে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ‘সাম্বা’ ‘সাম্বা’ চিৎকারে উল্লাস শুরু করে স্বাগতিক দর্শকরা। অনিতা জেসির বদলে মাঠে নামেন নেপালের সেরা ফরোয়ার্ড সাবিত্রা ভান্ডারি। যাকে নেপালের সবাই ‘সাম্বা’ নামেই ভাবে। সাবিত্রা মাঠে নামার পর আক্রমণে গতি পায় স্বাগতিকরা। ৭০ মিনিটে আনিসা বাসনেত গোল করলে ঘুরে দাঁড়ায় নেপাল (১-২)। কিন্তু মিনিটসাতেক পর গোল করে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে দেন সেই কৃষ্ণা রানী (৩-১)। শেষে সাবিত্রা-ভীতিতে না পড়ে ৩-১ গোলের জয়ে সাফের শিরোপা নিয়ে উৎসব করে লাল-সবুজের দল।