পরচুলা শিল্পে নারীর ভাগ্য

চীন, জাপান, ভারত, দুবাই, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে পরচুলার (চুলের ক্যাপ) ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে। এসব দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে চুলের ক্যাপের বাজার। লাভজনক হওয়ায় নারী উদ্যোক্তারা ঝুঁকছেন পরচুলা তৈরির দিকে। এরই ধারাবাহিকতায় উত্তরের নীলফামারী জেলার গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে পরচুলা তৈরির কারখানা। মান সম্পন্ন কাজ, উৎপাদন খরচ কম এবং কম মূল্যে আমদানি করতে পারায় চীন ও জাপানসহ ১০টি দেশের ব্যবসায়ীরা। ফলে নীলফামারী থেকে চুলের ক্যাপ রফতানি হচ্ছে। এসব কারখানায় ৫ হাজার নারী শ্রমিক কাজ করছেন। উদ্যোক্তারা বলছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে গ্রামে গ্রামে কারখানা আরও বাড়বে পাশাপাশি এই কারখানাগুলোতে অন্তত ১০ হাজার নারীর কর্মসংস্থান হবে।

সূত্র মতে প্রতি বছরে সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন কোটি পরচুলা (উইগ) রফতানি হয়ে থাকে নীলফামারীর এভারগ্রিন নামে হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সেখানে ১৫ হাজার নারী কাজ করে। কিন্তু বিশ্বে পরচুলার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই চাহিদা পূরণে নীলফামারী জেলা সদরের কচুকাটা, টুপির মোড়, গোড়গ্রাম, পলাশবাড়ি, ডোমার ও সৈয়দপুরের গ্রামে গ্রামে পরচুলা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। এলাকার নারীরা এভারগ্রিনের মাধ্যমে সাব কন্ট্রাক নিয়ে বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়েছে। গ্রাম এলাকায় এসব নারীরা বাড়ির পাশের কারখানায় কাজ করে নিজেদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলছেন।

সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর, কামারপুকুর ও নেজামের চৌপথী এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট্ট পরিসরে কয়েকটি পরচুলা তৈরির কারখানা। সংসারের কাজ করেও গৃহিণীরা কারখানাগুলোতে পরচুলা তৈরি করছেন। বুলবুলি বেগম (৫৫)। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। ছেলের সংসারে থাকেন। রয়েছে অভাব-অনটন। নিজের হাতখরচ জোগাতে দলবদ্ধ হয়ে তিনিও পরচুলা কারখানায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, ছেলের সংসারে খেয়ে দিন চলে। নিজের অনেক প্রয়োজনীয় খরচ রয়েছে। প্রতিবেশীর বাড়িতে চুলের কাজ হচ্ছে ছয় মাস থেকে। সেখানে ঢুকে কাজ করছি।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সদর ইউনিয়নের জেলেপাড়া এলাকার পরচুলা কারখানায দেখা যায় সেখানেও কাজ করছে প্রচুর নারী। রুমানা হক জানান এখানকার নারী শ্রমিকদের দুজন সুপারভাইজারের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজ শেখানো হয়। তারা ৭দিনেই সব শিখে যায়। এখন এই সকল গ্রামের নারীরা সহজেই পরচুলা তৈরি করতে পারছেন। নারী উদ্যোক্তা রত্না জানান, এখানে চুলের ছোটক্যাপ তৈরি করলে একজন শ্রমিক পাচ্ছেন ৩শ’ টাকা করে। আর বড় ক্যাপে ১ হাজার টাকা। একজন নারী শ্রমিক দিনে গড়ে দুটি করে চুলের ক্যাপ তৈরি করতে পারেন। এলাকার হতদরিদ্র নারীরা এতে নিজেদের আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছে।

জানা যায় গ্রামের কারখানাগুলোতে কাজ করছে প্রায় ৫ হাজার নারী শ্রমিক। একেকজন ৮ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন মাসে। কাজ পেয়েছেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরাও। চীনারা আমাদের এই অঞ্চল থেকে ব্যাপক পরচুলা ক্রয় করছে। এটি একটি সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হয়েছে। বেসরকারীভাবে উদ্যোক্তারা পরচুলা তৈরিতে বিচ্ছিন্নভাবে ভূমিকা রাখছে। পিছিয়ে পড়া সুবিধাবঞ্চিত নারীরা এখানে কাজ করছে। এটা নিঃসন্দেহে একটি ভাল দিক। তারা স্বাবলম্বী হচ্ছে। কিন্তু এটাকে সরকারী নজরদারিতে এনে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার দরকার বলে মনে করেন জেলা পরিষদের নারী সদস্য ইসরাত জাহান পল্লবী।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)-এর উপ-মহাব্যবস্থাপক হুসনে আরা বেগম বলেন, কেউ আর এখন শুধু গৃহিণী থাকতে চান না। গ্রামে ঘুরলে দেখা যাবে নারীদের ক্ষুদ্র নানা কাজে অংশগ্রহণের চিত্র। নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ফলে অর্থনীতির চাকা মজবুত হচ্ছে এই অঞ্চলের। ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন নারীরা। নারীদের মধ্য থেকে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, তারা কর্মক্ষেত্র তৈরি করছেন। এর ফলে নারীরা যেমন সমৃদ্ধ হচ্ছেন তেমনি সংসারে সক্ষমতা বাড়ছে। নীলফামারীতে গ্রামে, গ্রামে পরচুলা তৈরির ফ্যাক্টরি হওয়ায় এলাকায় একটা পরিবর্তন এসেছে। এখানে কাজ করে অনেক নারী সংসারের অভাব ঘুচিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ব্যস্ততা বেড়েছে। যারা কাজ করেন তারা সবাই নারী। তাদের সংসারে উন্নতির পরিবর্তন এসেছে। গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বিকাশে বিসিক নানাভাবে পাশে রয়েছে এবং সহযোগিতা করছে।