ট্রানজিটের এক চালানে আয় দুই লাখ টাকা

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিটের একটি চালান গত সপ্তাহে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর নেমে সড়কপথে সিলেটের শেওলা হয়ে ভারতের আসাম পৌঁছেছে। এক কনটেইনারের এই চালানে ছিল ২৫ টন স্টিল বার। পরীক্ষামূলক এ চালানে বাংলাদেশ মোট দুই লাখ ১২ হাজার টাকার বেশি আয় করেছে। এ আয়ের মধ্যে তিনটি সরকারি সংস্থা—চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, জাহাজভাড়া এবং ট্রেইলার ভাড়া যুক্ত আছে।

সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে কথা বলে এই খরচের চিত্র পাওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য পরিবহনে বন্দর ব্যবহারের জন্য বিশ্বের কোথাও শুল্ক-কর আদায়ের নিয়ম নেই। তবে সেই দেশের অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ফি বা মাসুল নেওয়া হয়। সে হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের ট্রানজিট পণ্য পরীক্ষামূলক পরিবহনের জন্য একটি ফি-মাসুল নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এরই মধ্যে। পরীক্ষামূলক চালান শেষে ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশ বসেই চূড়ান্ত ফি-মাসুল নির্ধারণ করবে।

জানা গেছে, কনটেইনারে আসা পণ্যের চালানটি কলকাতা শ্যামাপ্রসাদ বন্দর থেকে বাংলাদেশি জাহাজ ‘ট্রান্স সামুদেরা’য় করে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। জাহাজে ১২৪ একক কনটেইনারে পণ্যভর্তি ছিল। এর মধ্যে শুধু একটি কনটেইনারে ট্রানজিট পণ্য ছিল। কলকাতা বন্দর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাবদ বাংলাদেশি জাহাজ মালিক আয় করেছেন ৬৫০ মার্কিন ডলার। বিনিময়মূল্য প্রতি ডলার ১০০ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি টাকায় ৬৫ হাজার টাকা আয় করেছে, যার পুরোটাই বৈদেশিক খাত থেকে এসেছে।

জাহাজ মালিক মেরিন ট্রাস্ট লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন শেখ সাহিকুল ইসলাম বলেন, ‘দেখুন কলকাতা বন্দর থেকে রওনা দিয়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের একেবারে জেটিতে পৌঁছেছে। ফলে বিশাল সময় সাশ্রয় হয়েছে, বিশেষত ট্রানজিট চালানের জন্য। এই জাহাজে অন্য কনটেইনারের ক্ষেত্রে যে ভাড়া, ট্রানজিট চালানের ক্ষেত্রে একই ভাড়া আদায় হয়েছে। বাড়তি কোনো মাসুল নেওয়া হয়নি। ’

তিনি বলেন, ‘ট্রানজিট কনটেইনারে ২৫ টন পণ্য থাকায় ৬৫০ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। আর এ কাজে বাংলাদেশি জাহাজ, দেশি ক্রু, দেশি শিপিং লাইন, দেশি ট্রেইলার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ অনেক কর্মী জড়িত ছিলেন। আমি মনে করি, নিয়মিতভাবে যদি ট্রানজিট কনটেইনার আসে, তাহলে সরকারি খাত তো অবশ্যই, বেসরকারি খাত সবচেয়ে লাভবান হবে। আর প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য সরকার যে প্রচণ্ড চেষ্টা করছেন সে ক্ষেত্রেও এটি বড় একটি সুযোগ। ’

জানা গেছে, ট্রান্স সামুদেরা জাহাজটি বহির্নোঙরে পৌঁছার পরদিনই চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভেড়ে। আর পণ্য নামিয়ে রাতেই চট্টগ্রাম বন্দরের ফি পরিশোধ করে বন্দর ছেড়েছে। জাহাজটিকে বহির্নোঙর থেকে জেটি পর্যন্ত বন্দর পাইলট দিয়ে চালিয়ে আনা হয়েছে একটি চার্জ দিয়ে। কনটেইনার জাহাজ থেকে নামানো, আবার ট্রেইলারে রাখা, বন্দর জলসীমা ব্যবহারের ভাড়াসহ চট্টগ্রাম বন্দর আয় করেছে ৪৩ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় চার হাজার ৩০০ টাকা। ট্রানজিট চালানটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড় নেওয়ার আগে কাস্টমসের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়েছে। কাস্টমস কত ফি পাবে, তা আগেই নির্ধারণ করে দিয়েছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। স্ক্যানিং চার্জসহ ছয় ধরনের ফি বাবদ চট্টগ্রাম কাস্টমস পেয়েছে সাত হাজার ৭৩ টাকা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের উপকমিশনার এইচ এম কবীর বলেন, যেহেতু চালানটির পণ্য বাংলাদেশে ব্যবহৃত হবে না তাই তার ওপর শুল্ক কর নেই। তবে স্ক্যানিং চার্জসহ বিভিন্ন ফি হিসাবে কাস্টমস রাজস্ব পেয়েছে সাত হাজার ৭৩ টাকা। এর বাইরে সড়কপথ ব্যবহারের জন্য সরকার নির্ধারিত মাসুল ১৫ হাজার ৭৭২ টাকাও আমরা আদায় করেছি। কিন্তু সেই টাকা জমা হয়েছে সড়ক বিভাগের অ্যাকাউন্টে।

তিনি বলেন, ‘ট্রানজিট কনটেইনারটি বন্দর থেকে বের হওয়ার আগে আমরা স্ক্যান করে নিশ্চিত হয়েছি। এরপর আমাদের টিম কনটেইনারসহ ট্রেইলারটি পাহারা দিয়ে সিলেট সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। কিভাবে এই পণ্য পরিবহন হবে, তা আগেই নির্ধারণ করা ছিল। ’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সড়কপথে সিলেটের শেওলা স্থলবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লেগেছে ১৯ ঘণ্টা। এই পথ পাড়ি দিতে ট্রেইলার ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাদেশের। আর ট্রেইলার বাবদ আয় হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার টাকা। শিপিং এজেন্ট ম্যাঙ্গো লাইন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইয়াকুব সুজন ভূঁইয়া বলেন, ৭ সেপ্টেম্বর ভোরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রওনা দিয়ে ট্রানজিট কনটেইনারটি ৮ সেপ্টেম্বর রাত ১টায় সিলেটের শেওলা বন্দরে পৌঁছে। সেই স্থলবন্দর এবং কাস্টমসের অনুমোদনপ্রক্রিয়া শেষ করে দুপুর সাড়ে ১২টায় ভারতে প্রবেশ করে চালানটি। এই পথ পাড়ি দিতে ট্রেইলার ভাড়া, সিঅ্যান্ডএফ কমিশন এবং শিপিং লাইন ফি বাবদ মোট এক লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়েছে।

ভারত থেকে আসা ট্রানজিটের চারটি পরীক্ষামূলক চালান এরই মধ্যে সফলভাবে শেষ হয়েছে। ২০২০ সালের ২১ জুলাইয়ে ট্রান্সশিপমেন্টের প্রথম চালানটি কলকাতা বন্দর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছিল। সেটি তখন চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা গিয়েছিল। বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের চুক্তির আওতায় ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য পরিবহনে এটি চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য দ্বিতীয় চালান।