বাড়ছে রপ্তানি আয়, দুর্যোগ মোকাবিলায় জোগাবে সাহস

বৈশ্বিক মন্দা ও সংকটের কারণে সরকার যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করছে তখন বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে শঙ্কা থাকলেও দেশের রপ্তানি আয়ে বইছে সুবাতাস। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে যেখানে রপ্তানি আয়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল, আগস্টে সেই প্রবৃদ্ধি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়ে ৩৬ শতাংশ হয়েছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে রপ্তানি আয় প্রায় ৪৬০ কোটি মার্কিন ডলার। গত বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল ৩৩৮ কোটি মার্কিন ডলার। গত বছরের তুলনায় এ বছরের আগস্টে প্রায় ১২২ কোটি মার্কিন ডলার বেশি আয় এসেছে। রপ্তানি আয়ের যে টার্গেট নির্ধারণ করেছিল সরকার, আগস্টের আয় সেই প্রত্যাশিত টার্গেট ছাড়িয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাসের জন্য ৪৩০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের টার্গেট ছিল। এরচেয়ে প্রায় ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি রপ্তানি আয় অর্জিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ১৯ ধরনের পণ্যে রপ্তানি বাড়লেও অন্তত ১৮ ধরনের পণ্যে রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়েছিল। আগস্টে ২৬ ধরনের পণ্যে রপ্তানি আয় বেড়েছে। আর কমেছে ১১ ধরনের পণ্যে রপ্তানি। এর মধ্যে জুলাইয়ে কমলেও আগস্টে বেড়েছে এমন পণ্যের মধ্যে রয়েছে শুকনো খাবার, চা, বাইসাইকেল, টেরি টাওয়েল ও সিরামিক পণ্য। আর রপ্তানি কমেছে শাকসবজি, ওষুধ, ফলমূল, হ্যান্ডিক্রাফট, ফার্নিচার, চিংড়ি, কার্পেট ও রাবার পণ্যের। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। জ্বালানি সংকট ও অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশগুলোর মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্য ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ পোশাকের মতো পণ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছে। তার পরও রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশ কম দামের পোশাক রপ্তানি করে বিধায়। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি বৈশ্বিক মন্দা ও দুর্যোগ দুর্বিপাকের ঝুঁকি মোকাবিলায় শক্তি জোগাবে এমনটিই আশা করা যায়।

রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, জুলাইতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি আয় হয়েছে। আগের অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ৪৯০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করে দেশ, যা ছিল একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ। আগের বছরের একই মাসের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৭ শতাংশ। এ বছর জুলাই মাসের মোট রপ্তানির মধ্যে শুধু পোশাক খাত থেকে এসেছে ২৮৮ কোটি ডলার; এ খাতের ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

ইপিবির তথ্যে বলছে, দীর্ঘদিন ধরে নিট পোশাকে প্রবৃদ্ধি বেশি থাকলেও এবার বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ওভেন পোশাকে। এ খাতে রপ্তানি বেড়েছে ২৩ শতাংশ। আর নিট খাতে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

বৈশ্বিক মহামারিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পোশাক খাত। এরপর সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে প্রচুর ক্রয়াদেশ আসতে শুরু করে। ফলে পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করে। কিন্তু গত ফেব্রম্নয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি প্রচুর বেড়ে যায়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো। সেখানে বিক্রি কমলে তার প্রভাবও এ দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের ওপর পড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ, কন্টেইনার ভাড়া, ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে গত ৫ বছরে পোশাক খাতের সামগ্রিক উৎপাদন খরচ ৪০ শতাংশ বেড়েছে। আগামী কয়েকটি বছর দেশের পোশাকশিল্পের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের প্রয়োজনে অত্যন্ত দ্রম্নত পরিবর্তনশীল ভোক্তা চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের বহুমুখীকরণ বা বৈচিত্র্যসাধন, কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হলে পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। সেই প্রস্তুত্মতি এখন থেকে নিতে হবে। অনেক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে গত কয়েক দশকের পথপরিক্রমায় দেশের তৈরি পোশাকশিল্প আজকের এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। অনেক প্রতিকূলতা এবং দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এগিয়ে যাচ্ছে অগ্রগতির পথে। দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে পোশাকশিল্পের কোনো বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশ থেকে যে রেমিট্যান্স আসছে তার অন্যতম খাত হলো গার্মেন্টশিল্প। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক অর্থ আয় করছে। যে কোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে সে দেশের শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ব পোশাক বাজার এখন ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশ এর মাত্র ৫ শতাংশ সরবরাহ করে। এ হার ৮ শতাংশে উন্নীত করতে পারলেই ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব। এই টার্গেট পূরণে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আন্তরিক ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন।

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

পরিচালক, এফবিসিসিআই, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেড