পোশাক রফতানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, আশা জাগাচ্ছে অর্থনীতিতে

সঙ্কটকালীন সময়েও দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে যে দু-একটি খাত প্রধান ভূমিকা রাখছে তার মধ্যে শীর্ষে তৈরি পোশাক শিল্প। রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে যে খাত থেকে সে খাতের রফতানিতে ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিতে নতুন করে আশা জাগাচ্ছে।

বিশেষ করে রিজার্ভে যখন ভাটার টান, তখন পোশাক রফতানির বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বাড়াতেও অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পোশাক রফতানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য সুখের খবর; কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে সামনের কয়েক মাসে হয়তো পোশাক রফতানির এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি নাও থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগে থেকেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তাহলে হয়তো পোশাক রফতানি বাধাগ্রস্ত হবে না।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও ইপিবি সূত্রে জানা যায়, গত এক বছর ধরেই পোশাক রফতানিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। গত বছরের জুলাই মাসে যেখানে পোশাক রফতানিতে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল সেখানে এ বছরের জুলাইয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। আর চলতি বছরের প্রথম মাস থেকে পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধিতে আরও বেশি উল্লম্ফন ঘটেছে।

ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পোশাক রফতানি হয় ৪ হাজার ৮৪ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন ডলারের। আর গত বছরের জানুয়ারিতে হয়েছিল ২ হাজার ৬২৫ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ জানুয়ারিতে পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয় ৪২ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পোশাক রফতানি হয়, ৩ হাজার ৫১১ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ডলারের। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে হয়েছিল ২ হাজার ৬২৫ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

পরের মাস মার্চে এসে পোশাক রফতানি আরও বেড়ে যায়। এ বছরের মার্চে পোশাক রফতানি হয় ৩ হাজার ৯৩১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলারের। গত বছর যা ছিল ২ হাজার ৪৫৪ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার। প্রবৃদ্ধি হয় ৬০ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ বছরের এপ্রিলে পোশাক রফতানি হয় ৩ হাজার ৯৩৪ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলারের। গত বছরের এপ্রিলে রফতানি হয় ২ হাজার ৫১৬ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ডলারের। এ মাসে প্রবৃদ্ধি হয় ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ।

চলতি বছরের মে মাসে পোশাক রফতানি হয় ৩ হাজার ১৫৮ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন ডলারের। গত বছরের মে মাসে হয় ২ হাজার ৫৫৬ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলারের। এ মাসে প্রবৃদ্ধি হয় ২৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। চলতি বছরের জুন মাসে পোশাক রফতানি হয় ৪ হাজার ৯২ মিলিয়ন ডলারের। গত বছরের জুন মাসে হয় ২ হাজার ৮৯৪ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারের। এ মাসে প্রবৃদ্ধি হয় ৪১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। জুলাই মাসে পোশাক রফতানি হয় ৩ হাজার ৩৬৬ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার। গত বছরের জুলাইয়ে রফতানি হয় ২ হাজার ৮৮৭ দশমিক ২২ মিলিয়ন ডলারের। প্রবৃদ্ধি হয় ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। সর্বশেষ এ বছরের আগস্ট মাসে পোশাক রফতানি হয় ৩ হাজার ৭৪৫ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ডলারের। গত বছরের আগস্টে রফতানি হয় ২ হাজার ৭৫৩ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলারের। অর্থাৎ আগস্টে পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয় ৩৬ দশমিক ০৪ শতাংশ।

পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধির বিষয়ে শিল্প মালিকরা বলেন, গত কয়েক মাস পোশাক রফতানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর পেছনে কারণ ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের অর্ডার এগুলো। এ জন্য গত কয়েক মাস প্রবৃদ্ধি ভালো। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক অস্থিরতা ও আর্থিক সঙ্কটের কারণে এখন পশ্চিমা বিশ্ব থেকে পোশাকের রফতানি আদেশ কম আসছে।

এসব বিষয় উল্লেখ করে বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সর্বশেষ আগস্ট মাসের রফতানির যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে আগস্টে বাংলাদেশ ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রফতানি করেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছরে রফতানি ৩৬.০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং এর ফলে সৃষ্ট অস্থির অর্থনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যেই রপ্তানিকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে পশ্চিমের বাজারে ভোক্তা চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে এবং এটি রফতানি দৃশ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

২০২২ সালের আগস্টে মোট রফতানি হয়েছে ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে এটি ২০২২ সালের জুনে প্রায় ৪.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল। জুন থেকে শুরু করে, আরএমজি রফতানি বৃদ্ধি হ্রাস পেতে শুরু করেছে এবং জুলাই ও আগস্ট ২০২২ উভয় ক্ষেত্রেই এটি জুনের রফতানির চেয়ে কম ছিল। অতিরিক্ত ওভারস্টকের কারণে কিছু প্রধান ব্র্যান্ড সম্প্রতি তাদের অর্ডার ধরে রাখছে বলে আসন্ন মাসগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। তাই আমরা আত্মতুষ্টির চেয়ে বেশি সতর্ক ও সজাগ হচ্ছি।

আর অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশে চলমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে যে দুটি খাত ভালো করছে তার মধ্যে রয়েছে রেমিট্যান্স ও রফতানি বাণিজ্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রফতানিতে ধারাবাহিকভাবে যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তাতে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করছে। পোশাক রফতানির এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। তবে সামনে হয়তো খারাপ সময় আসতে পারে। সে জন্য পোশাক রফতানি যাতে কোনোরকম বাধাগ্রস্ত না হয় তার জন্য সব রকম ব্যবস্থা করা দরকার। শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নির্বিঘ্ন করা দরকার। কোনোভাবে উৎপাদন ব্যাহত হতে দেওয়া ঠিক হবে না।