গিনেস বুকে স্থান পাবে পদ্মা সেতুর অনেক রেকর্ড

স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বহুল প্রতীক্ষিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আগামীকাল শনিবার। পদ্মা সেতু অসংখ্য রেকর্ড স্থান করে নিতে পারে ‘গিনেস বুকে’। এটা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের। গিনেস বুকে পদ্মা সেতুর অসংখ্য রেকর্ড স্থান করে নেয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামটিও। পদ্মা সেতুর শুরু থেকে যখনই কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে তখনই একেকটা বিশ্বরেকর্ড হয়েছে পদ্মা সেতুতে। এত সংখ্যক রেকর্ড হয়েছে, তার তালিকা এত দীর্ঘ যে তা এখন পর্যন্ত তালিকা করে শেষ করা যায়নি। এরমধ্যে কয়েকটি ‘গিনেস বুক অব ওর্য়াল্ড’ রেকর্ডসে এ স্থান করে নেবার পথে বলে নির্মাণ সংশ্লিষ্টদের দাবি।

নির্মাণ সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, নির্মাণযজ্ঞের শুরুতে নানা কারণে দেশে-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল পদ্মা সেতু। এরইমধ্যে এই সেতুটি অনেকগুলো বিশ্ব রেকর্ড করে ফেলেছে। এই যেমন খড়¯্রােতা পদ্মায় গভীরতম পাইলিং করা হয়েছে যা রেকর্ড স্থাপন করেছে। শুরুতে পাইলিং জটিলতায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকে সেতুর নির্মাণযজ্ঞ। তবে, ১শ’ ২০ থেকে ১শ’ ২৭ মিটার গভীর পাইলিং করে এরইমধ্যে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে পদ্মা সেতু। পদ্মায় গভীরতম পাইলিং এর ব্যবহার করা হয়েছে ১০ হাজার টনের বেশি ওজনের বিয়ারিং। নদী শাসনের সবচেয়ে বড় চুক্তি করা হয়েছে। নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে সবচেয়ে বড় ক্রেন। পদ্মা সেতুর ইতিহাসের সঙ্গে এই বিশ্বরেকর্ডগুলো দীর্ঘদিন মানুষের আলোচনার খোড়াক যোগাবে।

পদ্ম সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকরা বলেছেন, যখন পদ্মা সেতুটির নির্মাণ শুরু হয় তখন অনাস্থা, অবিশ্বাস, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের কোন ঘাটতি ছিল না। এখন, মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে গর্বের জাতীয় স্থাপনাটি। দেশ-বিদেশ সবার মুখে এখন প্রশংসায় পঞ্চমুখ পদ্মা সেতু।

পদ্মা সেতুর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, এত বড় নদীতে কখনই ব্রিজ হয়নি। এত খড়¯্রােতা, যে নদীতে ১ লাখ ৪০ হাজার কিউবিক মিটার প্রতি সেকেন্ডে পানি যায় এ রকম নদীতে ব্রিজই করা হয় না। ৬২ মিটার পাইল কোন লোড নিতে পারবে না, যেটা অন্য কোন ব্রিজে চিন্তাই করা যায় না। ৪ হাজার টনের জাহাজ ধাক্কা দিলে কিছু হবে না। পাইল বসাতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ১ হাজার ৯শ’ থেকে সাড়ে তিন হাজার কিলোজুল ক্ষমতার হাইড্রোলিক হ্যামার ব্যবহৃত হয়েছে। নদীর তলদেশে শক্তি বাড়াতে ও দৃঢ় করতে গ্রাউন্ডিং ইনজেক্ট স্কিন ফিকশন প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে পদ্মায়। এমন পাইলের সংখ্যা ২২টি।

পদ্মা সেতু নির্মাণের সঙ্গে প্রকৌশলীরা বলেছেন, পদ্মা সেতু থেকে যা শিখেছি পরবর্তীতে অন্যান্য সেতুতে তা ব্যবহার করতে পারব। ১২০ থেকে ১৩০ মিটারের বেশি পদ্মা নদীর বালি স্তরে পাইল ড্রাইভ করা সম্ভব না পৃথিবীর শক্তিশালী হ্যামার দিয়েও। পরের রেকর্ডটি হয়েছে নদী শাসনে। মাওয়া-জাজিরা মিলিয়ে মোট ১৪ কিলোমিটার নদীকে শাসন করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর এই তিন জেলায় এই নদী শাসনে ৯ হাজার ৪শ’ কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়েছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পও অনায়াশেই সহ্য করার ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’ ব্যবহার হয়েছে পদ্মায়। এর সক্ষমতা ৯৮ হাজার ৭শ’ ২৫ কিলোনিউটন। আবার, স্প্যান ও পিলারের মধ্যে বিয়ারিং ব্যবহার হয়েছে। এর একেকটির ক্ষমতা সাড়ে দশ হাজার মেট্রিকটন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রেনের ব্যবহার হয়েছে স্প্যানগুলো বসাতে। দ্বি-তল পদ্মা সেতুর ওপরের সড়ক কংক্রিটের ঢালাই। নিচের স্প্যান হলো স্টিল মেগা স্ট্র্যাকচার। এক সেতুতে কংক্রিট ও স্টিল-দুইয়ের ব্যবহার সাধারণত একসঙ্গে দেখা যায় না।

পদ্মা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য নদী শাসন, দেশীয় বালুর ব্যবহারের পরিমাণ কত, মোট কত পরিমাণ রড ব্যবহৃত হয়েছে, কত টন দেশীয় সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে তার হিসাব দিয়েছে নির্মাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

নদী শাসন ॥ পদ্মা সেতুর নদী শাসনে প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ জিও ব্যাগ ব্যবহার হয়েছে। এর কোন কোনটির ওজন ৮০০ কেজি। কিছু আবার ১২৫ কেজির। এসব জিও ব্যাগে বালু ভরে নদীর তলদেশে ফেলা হয়েছে। নদীতে পাথর ফেলা হয়েছে প্রায় সোয়া ১০ লাখ ঘনমিটার। এই পরিমাণ পাথরকে ১৩ হাজার বর্গফুট জুড়ে স্তুপ করে রাখলে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কেওক্রার্ডংয়ের থেকেও উঁচু দেখাবে।

দেশীয় বালুর ব্যবহার ॥ পদ্মায় মূল সেতু, নদী শাসন ও সংযোগ সড়কের নির্মাণ কাজে মোট বালু ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ ঘনমিটার, যা দিয়ে ১৯ কোটি ১২ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের ভবন তৈরি করা যাবে। এই আয়তন প্রায় ৫৭টি বুর্জ খলিফার সমান। বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার সব তলা মিলিয়ে আয়তন ৩৩ লাখ ৩১ হাজার বর্গফুট। পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত বালুর সবই দেশীয়।

মোট রডের পরিমাণ ॥ মূল সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণে রডের ব্যবহার হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার টন। এসব রডের সবই দেশীয়। এক টন করে এই রড যদি লম্বালম্বি রাখা হয়, তাহলে পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত রডের মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ১ হাজার ২৯৬ কিলোমিটার। দেশের সর্ব উত্তরের স্থান তেঁতুলিয়া থেকে দক্ষিণের আরেক প্রান্ত টেকনাফের দূরত্ব ৯৩১ কিলোমিটার। অর্থাৎ পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত রডের দৈর্ঘ্য টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্বের চেয়েও বেশি।

দেশীয় সিমেন্ট ॥ মূল সেতু নদী শাসন ও সংযোগ সড়ক নির্মাণে সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় সাত লাখ টন। এর সবই দেশে উৎপাদিত। এই সিমেন্ট প্রয়োজনমতো নানা সময় পদ্মার পাড়ে এসেছে। ব্যবহার করা হয়েছে দীর্ঘ সময় নিয়ে। কিন্তু একবার ভাবুন তো, সব সিমেন্ট যদি একসঙ্গে পরিবহন করতে হতো তাহলে কত ট্রাকের প্রয়োজন ? সংখ্যাটা আসলেই অনেক বড় ! সব সিমেন্ট একসঙ্গে ৫ টন ক্ষমতার ট্রাক দিয়ে পরিবহন করা হলে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ট্রাকের প্রয়োজন হতো।

পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিচালক সফিকুল ইসলাম বলেছেন, অনেক কিছুই এখানে আছে যা বলতেও ভুলে যাচ্ছি, হয়ত আরও সময় লাগবে। কি কি রেকর্ড করেছে যা বলা হয়েছে, আরও জিনিস আছে। এখন যেটা জানাচ্ছি সেটা হয়ত আংশিক যা পরিপূর্ণ নয়।